বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১২ কার্তিক ১৪২৮, ২০ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

যানজটে সীমাহীন দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনা

| প্রকাশের সময় : ২৩ আগস্ট, ২০২১, ১২:০২ এএম

রাজধানীর বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় গত শনিবার সকালে ছয়তলা একটি ভবনের তিন তলায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে, যার জের ধরে মহাখালি থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা কয়েক ঘণ্টা অবধি অব্যাহত থাকে। এর প্রভাবে সারা শহরেই দেখা দেয় যানজট। প্রচন্ড গরমে দীর্ঘ যানজটে মানুষের কষ্ট, দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু তার সূত্র ধরে গোটা শহরে যানজটে অচলাবস্থা নেমে আসবে, সেটা মেনে নেয়া যায় না। সড়কের স্বল্পতা, বিকল্প সড়কের অভাব এবং সর্বোপরি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে এজন্য দায়ী করা যায়। রাজধানী দেশের প্রধান শহর হলেও অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে এটি গড়ে উঠেছে। রাস্তাঘাট প্রয়োজন মতো হয়নি। যা হয়েছে তাতেও রয়েছে অপরিকল্পনার ছাপ। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই শহরের স্বল্প ও অপিরসর সড়কে মাত্রাতিরিক্ত গাড়ির চাপে যানজট নিত্য ও অবধারিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই যানজটের তীব্রতা ও স্থায়ীত্ব অনেক সময় ধারণা-কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। গত শনিবার একটি অগ্নিদুর্ঘটনা যানজটের কারণ বলে চিহ্নিত হলেও একথা বলতে হবে, এ ধরনের যানজট মোটেই নতুন নয়। নানা কারণে যানজটের সূত্রপাত ঘটে এবং তা প্রলম্বিত হয়ে জনদুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। নির্দিষ্ট সময়ে কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে যানজটের কারণে। কয়েক কিলোমিটার যেতে যানবাহনের কয়েক ঘণ্টা চলে যায়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের তথ্য মতে, প্রতিদিন যানজটে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়। এক কর্মঘণ্টায় ক্ষতি হয় গড়ে ৭০ টাকা। এই হিসাবে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। অন্যান্য ক্ষতি এর সঙ্গে যুক্ত করলে সাকূল্যে ক্ষতি কত দাঁড়ায়, সেটা সম্পর্কে ভিন্ন মত আছে। তবে কথিত প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রতি বছর ক্ষতি হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বলার অপেক্ষা রাখে না, যানজটমুক্ত মসৃণ যাতায়াত নিশ্চিত হলে এ বিশাল ক্ষতি থেকে দেশ রেহাই পেতো।

শহর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এবং যথেষ্ট পরিসর রাস্তাঘাট না তৈরি হওয়া যানজটের অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বছরজুড়ে নির্মাণ কাজ, রাস্তা কাটাকাটি এবং বিবিধ উন্নয়ন কর্মকান্ডের প্রতিবন্ধকতা। উড়াল সড়ক, মেট্রোরেলসহ নানা উন্নয়ন কাজ বছরের পর বছর ধরে চলছে। এসব উন্নয়ন কাজ কবে শেষ হবে, বিভিন্ন সংস্থার নির্মাণ ও সংস্কার কাজ কবে নাগাদ সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে সম্পাদিত হবে, কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এক সময় বলা হয়েছিল, ফ্লাইওভার হলে যানজট থাকবে না। ইতোমধ্যে অনেক ফ্লাইওভার হয়েছে, কিন্তু যানজট এতটুকু কমেনি। উড়াল সড়ক, মেট্রোরেল যানজট কতটা নিরসন করতে পারবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। যানজটের একটা বড় কারণ রিকশা, ভ্যান ও ব্যাটারিচালিত ত্রিচক্রযানের অবাধ চলাচল। এসব ক্ষুদ্র, ধীরগতির যান এবং বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ত্রিচক্রযানের চলাচল বড় রাস্তায় নিষিদ্ধ হলেও সুযোগ মতো এগুলোকে বড় রাস্তাতেও চলাচল করতে দেখা যায়। অলিগলিতে প্রায়শই যানজট লেগে থাকে। এ কারণে কখনো কখনো বড় রাস্তাতেও যানজট প্রসারিত হয়ে যায়। রাস্তা থেকে রিকশা তুলে দেয়ার কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হলেও রিকশার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। লাইসেন্স দেয়া বন্ধ থাকলেও কীভাবে রিকশার সংখ্যা বাড়ছে, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান ও ত্রিচক্রযান অনেক আগে নিষিদ্ধ করার পরও তার সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নির্বাধ চলাচল কীভাবে বাড়ছে, তারও কোনো জবাব নেই। পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের কিছু লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য এইসব ক্ষুদ্র ও নিষিদ্ধ ঘোষিত যানের সঙ্গে যুক্ত; কেউ মালিকানা সূত্রে, কেউবা চাঁদার সূত্রে। ফলে এগুলো বন্ধ হচ্ছে না বা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

যে সব যানের কারণে যানজট দেখা দেয় কিংবা বাড়ে, তাদের চলাচল অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে। যারা এসব যানের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সব সময় রাস্তা সচল ও উন্মুক্ত রাখতে হলে রাস্তার পরিসর ও সক্ষমতা অনুযায়ী যান চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে গণপরিবহনের ওপর জোর দিতে হবে। চলমান সকল উন্নয়ন কাজ দ্রæত শেষ করে রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা কাটাকাটি বন্ধ করে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এই কাজটি করতে হবে। এইসঙ্গে একটি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতে যে ধরনের ট্রাফিক সিস্টেম কার্যকর আছে, সেই ধরনের ট্রাফিক সিস্টেম প্রবর্তন করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের উপযুক্ত পেশাগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সততানিষ্ঠ দায়িত্বশীলতার শিক্ষাও দিতে হবে। জনসাধারণসহ যানবাহন চালকদের ট্রাফিকবিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে তুলতে হবে। যানজট ও দুর্ঘটনা ইত্যাদি সম্পর্কিত বিভিন্ন সংগঠন আছে, নানা নামে কমিটি আছে, পরামর্শক আছে। তারা তাদের মতো কাজ করছে, রিপোর্ট দিচ্ছে, পরামর্শ দিচ্ছে, কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এ ব্যাপারে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে এবং সে মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে হবে। দুনিয়ার তাবৎ রাজধানী শহরের তুলনায় আমাদের রাজধানী শহরের মান নানা দিক দিয়ে অবনত। বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে এর অবস্থান আমাদের লজ্জা দেয়। এই লজ্জার অন্যতম কারণ যানজট। অতএব, তা দূর করতে হবে। মানুষের যাতায়াত সহজ, সাবলিল ও বাধামুক্ত করতে হবে যেকোনো মূল্যে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (2)
MALAYSIAN PASSION 17 ২৩ আগস্ট, ২০২১, ২:৩০ পিএম says : 0
When corrupt traffic police busy with collecting bribe from fully loaded road wit traffic and traffic system run by police hand signal then how public can hope to reduce traffic jam ?
Total Reply(0)
Dadhack ২৫ আগস্ট, ২০২১, ১:১৯ পিএম says : 0
আল্লাহর আইন দিয়ে দেশ চালালে তখন আল্লাহর রহমত নাযিল হয় মানুষ হয় সভ্য এবং সুশৃংখল আমাদের দেশ চলে আল্লাহর ওহী আইন দিয়ে সেই জন্য আজকে আমাদের দেশ জাহান্নামে পরিণত হয়েছে ট্রাফিক জাম মানুষের কত হাজার কোটি টাকা নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে মানুষের মানসিক প্রচন্ড ভাবে চাপ পরছে এতে মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন