রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৮ কার্তিক ১৪২৮, ১৬ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

জননেত্রী শেখ হাসিনা

আর কে চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:০২ এএম

বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-অর্জনের পেছনে যে মানুষটি নিরলস শ্রম দিয়ে চলেছেন তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর দীক্ষা কল্যাণমন্ত্রে, যে কারণে উন্নয়নের ব্রত সাধনায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সর্বক্ষণ। দেশের মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। আর তারই স্বীকৃতিস্বরূপ পেলেন ‘এসডিজি প্রগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি এই অ্যাওয়ার্ড। টেকসই উন্নয়নবিষয়ক নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ক্রাউন জুয়েল’ বা ‘মুকুট মণি’ আখ্যায়িত করেছে আর্থ ইনস্টিটিউট, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লোবাল মাস্টার্স অব ডেভেলপমেন্টস প্র্যাকটিস এবং ইউএন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক।

করোনা মহামারির সময় বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক দেশেই সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমন একটি সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসডিজি উন্নয়ন পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য অর্জন। এটা যেমন শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের স্বীকৃতি, তেমনি দেশের জন্য এক বিরল সম্মান।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে সব সংকট মোকাবেলা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তার নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি আজ চাঙ্গা হয়েছে। তলাবিহীন ঝুঁড়ি হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত বাংলাদেশ আজ মধ্য আয়ের দেশ। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে আজ মডেল ইকোনমিক কান্ট্রি।

গ্রেনেড হামলাসহ নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। নানা সঙ্কটময় পরিস্থিতি ও বিরোধী দলের উত্তাল আন্দোলনের মাঝেও দক্ষ হাতে সরকার পরিচালনা করছেন। শেখ হাসিনা নিজেকে শুধু দক্ষ রাজনৈতিক হিসেবেই গড়ে তোলেননি, আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনাতেও অনুকরণীয় বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।

কেবল একুশে আগস্টই নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের মাটি থেকে মুছে ফেলতে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৯ বার হামলা হয়েছে। খুনিচক্র রাজধানীর ধানমন্ডি, রাসেল স্কয়ার, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, টুঙ্গিপাড়া, নাটোর, ঈশ্বরদীসহ সব মিলিয়ে ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চেষ্টা চালিয়েছিল।

শেখ হাসিনাকে প্রথম হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। এরশাদ শাসনামলে ওইদিন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আটদলীয় জোটের সমাবেশে যোগ দিতে মিছিল সহকারে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পুলিশ-বিডিআর গুলি চালায়। সেই সঙ্গে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জও হয়। এতে ৭ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হন। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট রাত ১২টায় ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে। শেখ হাসিনা তখন ওই ভবনটিতে ছিলেন। হামলাকারীরা ৭-৮ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু ভবন লক্ষ করে গুলি চালায় ও একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা

১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গ্রিন রোডে শাসক দলের সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গুলি ও বোমাবর্ষণ করে। ওইদিন গ্রিন রোডে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গেলে তার ওপর এ হামলা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী ও নাটোর রেলস্টেশনে প্রবেশের মুখে শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্যে গুলিবর্ষণ করা হয়। পরের বছর ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর রাসেল স্কয়ারের কাছে সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়।

১৯৯৬-এর ৭ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের সমাবেশে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর অকস্মাৎ একটি মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। নিক্ষেপ করা হয় বোমা। ২০ জন নেতাকর্মী আহত হলেও প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলেমেয়েসহ ৩১ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ই-মেইল পাঠানো হয়। শেখ হাসিনা হত্যাপ্রচেষ্টার আরেকটি বড় ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল ২০০০ সালের ২০ জুলাই। ওইদিন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য জনসভাস্থলের কাছে ও হেলিপ্যাডের কাছে পুঁতে রাখা হয় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা। সৌভাগ্যবশত এই বোমা গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে।

২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য জঙ্গি সংগঠন হুজি অনুষ্ঠানস্থলে একটি বোমা পুঁতে রেখেছিল, যা গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন স্থানে বোমা পুঁতে রাখে হুজি। একদিন আগেই বোমাটি বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়। ২০০২-এর ৪ মার্চ নওগাঁয় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়িতে হামলা চালায় শাসক দলের ক্যাডাররা। একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালায়। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতেও শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ করে শাসক দলের সমর্থকরা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশস্থলে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে পরপর ১৩টি গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। তবে দলীয় নেতারা মানববর্ম রচনা করে শেখ হাসিনাকে প্রাণে রক্ষা করেন। ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে সাব-জেলে বন্দি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার খাবারে দেওয়া হয়েছিল স্লো পয়জন। ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। স্লো পয়জনিংয়ের কারণে শেখ হাসিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ২০০৮ সালের ১১ জুন ১১ মাস কারাভোগের পর শেখ হাসিনা প্যারোলে মুক্তি পান।

২০১৪ সালের শেষদিকে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গিদের মাধ্যমে মানব বোমায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে প্রশিক্ষণরত অবস্থায়ই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে ওই ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং-৭৭৭ ফ্লাইটটি বুদাপেস্ট যাওয়ার পথে মানব সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে কাছের বিমানবন্দর হিসেবে ডাইভার্ট হয়ে তা তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে শেষ রক্ষা হয়। এভাবেই বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হলেও তিনি বেঁচে আছেন। আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে আল্লাহ তাকে আরো বহু বছর বাঁচিয়ে রাখবেন।

জ্বালাও-পোড়াও, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, বাধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ এগিয়ে চলছে। বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এমন কোনো খাত নেই যে খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, মাতৃত্ব এবং শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যা দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও।

পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস, বিশ্বের পাঁচজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকারপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও কাজের অবদানের জন্য তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সবসময় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট’ বা ‘পূর্বের নতুন তারকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

শুধু দেশেই নয় আন্তজার্তিক অঙ্গনেও তাঁর কাজের স্বীকৃতি মিলেছে। বাংলাদেশের সফলতা ও নেতৃত্বগুণের জন্য তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন ও নানাবিধ সম্মানে ভূষিত হয়ে বাংলাদেশের নাম বিশ্বব্যাপী উজ্জ্বল করেছেন। বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এখন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বিশ্ব গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা এখন বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত নেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর শেখ হাসিনা ছাড়া এমন গুণাবলি সম্পন্ন আর কোনো নেতা বাংলাদেশের মানুষ পায়নি। এ কারণে তাঁর সাথে অন্য কোনো নেতার তুলনা চলে না, শেখ হাসিনা নিজেই নিজের তুলনা। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দেশরত্ন শেখ হাসিনার জন্মদিন। জন্মদিনে তার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও নগরবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সদস্য এফবিসিসিআই এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন