শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৮ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

পারমাণবিক শক্তির যুগে দেশ

| প্রকাশের সময় : ১২ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লি স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেছেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়ায় এ চুল্লি স্থাপন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। পরমাণুবিজ্ঞানীরা একে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘হৃদয়’ বলে অভিহিত করে থাকেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহুল প্রতিক্ষিত হৃদয় স্থাপনকাজের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করলো। বাংলাদেশের এই পারমাণবিক যুগে পদার্পণ বহুকালের স্বপ্ন ও সাধনার ফল। আজ থেকে ৬০ বছর আগে ১৯৬১ সালে তৎকালীন সরকার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৬৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, যথার্থতা যাচাই, প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, আবাসিক এলাকার জন্য জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, রেস্ট হাউজ, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ও কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ কাজ আংশিক সম্পন্ন হয়। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা কারণে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। সে সময় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী) পরিচালক নিয়োগ করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অনেক দূর এগিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ট্রাজেডি এই প্রচেষ্টায় সাময়িক ছেদ টানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ফের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করে। সত্যি বলতে কী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকে সম্ভবপর করে তুলেছে। এটিও তার পদ্মাসেতু, কর্ণফুলি টানেল প্রভৃতির মতো একটি সাহসী উদ্যোগ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সুখ্যাত। তার সঙ্গেই চুক্তি হয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের। চুক্তি প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টা ও ইচ্ছাতেই হয়েছে। পারমাণবিক শক্তির যুগে বাংলাদেশকে স্থান করে দেয়ার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে এই সুযোগে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিকভাবে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। সন্দেহ নেই, এটা বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রকল্প। এর যথাসময়ে বাস্তবায়ন একান্তভাবেই কাম্য। যতদূর জানা গেছে, করোনা মহামারির মধ্যেও এর কাজ স্বাভাবিক গতিতে চলেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম এই প্রকল্পের দুই ইউনিটের প্রথমটি ২০২৩ সালে ও দ্বিতীয়টি ২০২৪ চালু হবে। যে কোনো দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার বিকল্প নেই। ২০৪১ সালের আমাদের দেশে উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। গ্যাস-তেল ভিত্তিকবড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি দক্ষিণাঞ্চলে হবে বলে জানিয়েছেন। এসব উদ্যেগ ও প্রকল্পের লক্ষ্যই হলো বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা। স্মরণ করা যেতে পারে, বর্তমানে দেশের চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এই উৎপাদনসক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক কেন্দ্র বা ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ওদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মেয়াদ বাড়ানো হলেও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো কাজে আসছে না। উল্টো তাদের জন্য বিপুল অংকের অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, যখন দেশে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, উৎপাদনসক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তখন রেন্টাল-কুইক রেন্টালের আদৌ আর প্রয়োজন নেই। বলা বাহুল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার বাড়ানো বা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এখনো কিন্তু আমাদের দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ যায়নি। বিদ্যুৎপ্রাপ্তিও নিশ্চিত হয়নি। বিদ্যুতের ব্যবহার সর্বত্র সমান নয়। এদেশের মানুষের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বহু দেশের তুলনায় কম। বিদ্যুৎবিভ্রাট, লোডশেডিং লোভোল্টেজ ইত্যাদি এখনো সাধারণ ঘটনা।
আজকের দুনিয়ায় বিদ্যুৎ ছাড়া সব কিছুই অচল। জীবনযাপন, উৎপাদন, উন্নয়ন-কোনো কিছুই বিদ্যুৎ ছাড়া হয় না। বিদ্যুতের উৎস প্রধানত গ্যাস-তেল। এইসঙ্গে আছে কয়লা ও পানি। এগুলো ট্রাডিশনাল উৎস। কিন্তু দিনকে দিন তেল ও গ্যাসের যোগান কমছে। কয়লাও অফুরন্ত নয়। আর পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎশক্তি হিসেবে পারমাণুশক্তির ব্যবহারও রয়েছে। পরিবেশদূষক হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন করে আর নির্মিত হচ্ছে না। পুরানো কেন্দ্রগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। পরিবেশদূষণ ছাড়াও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এসবের বিকল্প হিসেবে গ্রিন এনার্জি, রিনিউয়েবল এনার্জির কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বায়ু ও সূর্যরশ্মিকে বিদ্যুতের উৎসশক্তি হিসেবে ব্যবহার করার কথা। এসব নিয়ে অনেক দেশেই কাজ হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপিত হচ্ছে। আমাদেরও এসব ব্যাপারে ভাবতে হবে। নিতে হবে যথাযথ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন