শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৬ কার্তিক ১৪২৮, ১৪ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ঝুঁকির মুখে জ্বালানি নিরাপত্তা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ৭ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

চাপে বিদেশি কোম্পানি সান্তোসকে ১২৯ কোটি টাকা দিয়েছে বাপেক্স
জ্বালানি খাতে লুটেরাদের দাপট অনেক বেশি হচ্ছে : অধ্যাপক এম শামসুল আলম
এলএনজি আমদানি নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে : অধ্যাপক ম. তামিম
সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি ৭ বছর আগে হলেও সমুদ্রের সম্পদ আহরণে এখনো সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। সমুদ্র জয়ের পর তেল-গ্যাসসহ সাগরের খনিজসম্পদ সম্পর্কে ধারণা পেতে জরিপ চালাতে আন্তর্জাতিক দরপত্র কয়েকবার বাতিল হয় প্রভাবশালীদের চাপে। এখনো বঙ্গোপসাগরে জরিপ কাজ শুরু করতে পারেনি। অথচ ভারত ও মিয়ানমার তাদের সীমানায় গ্যাস আবিষ্কার করেছে। দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম হু-হু করে বাড়ছে। এই খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে থাকছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখতে ২০১৪ সালে সাতটি ওয়েলহেড ক¤েপ্রসর বসানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (বিজিএফসিএল)। এই প্রকল্প দ্রæত বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ৭ বছরেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি খাতে লুটেরাদের দাপট অনেক বেশি। এখানে ব্যক্তি বিশেষের প্রভাবে প্রকল্প বাতিল হয়, কোনোটা স্থবির হয়ে থাকে। সরকার শক্তভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আসবে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র মিলছে না। সমুদ্রই এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ভরসা। কিন্তু সেখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও শুরুই হয়নি। সরকার মূলত তাকিয়ে আছে আমদানির দিকে। এখন বিশ্ববাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বাড়ছে হু-হু করে। তাই আমদানি নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর পুরো নির্ভরশীল হওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে তেল-গ্যাস সম্পদের অনুসন্ধান বাড়াতেই হবে।

এদিকে মগনামা-২ ক‚পে গ্যাস না পেলেও উচ্চ মহলের চাপে সান্তোসকে ১২৯ কোটি টাকা দিয়েছে বাপেক্স। এছাড়া ১০১ কোটি টাকা পেতে বিভিন্নভাবে তদবির করছেন প্রতিষ্ঠানটি। জ্বালানি সঙ্কট আগামীতে আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কারণে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দুয়ার খোলার সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না পেট্রোবাংলা।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে চলায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী থাকলেও তার পেট্রোবাংলা এই সুযোগটি নিতে পারেনি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের একাধিক উদ্যোগ বারবার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আটকে গেছে। কয়েকটি প্রকল্প ঝুলে আছে এক দশক ধরে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। ঘাটতি মেটাতে ব্যয়বহুল এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করেও সঙ্কট মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। যদিও জ্বালানি বিভাগ দাবি করছে, সাগরের সম্পদ আহরণে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বছরের পর বছর জ্বালানি খাত উন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী মহল। পছন্দের কোম্পানি কাজ না পাওয়ায় বারবার দরপত্র বাতিল হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশ এগিয়ে গেলেও তেল-গ্যাস আবিষ্কারে পিছিয়ে পড়েছে জ্বালানি খাত বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতি ভয়ানক পর্যায়ে ছিল অনেক আগে। বিদ্যুতের লোডশেডিং আর গ্যাসের স্বল্পতায় বাসাবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা সবকিছু জেরবার অবস্থায় পৌঁছেছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নতির জন্য বেশকিছু নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিছু সমালোচনা সত্তে¡ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য আসে। কিন্তু সার্বিক জ্বালানি খাতে বলার মতো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সংশ্নিষ্টরা মনে করেন।

এবিষয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি খাত এগোতে পারেনি, এটা সত্য। আগের টিম (জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা) যথাযথভাবে জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে পারেননি। এখন ভালো টিম হয়েছে। অনেক কাজ হচ্ছে। আগের ঘাটতি পুষিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আগামীতে সুফল মিলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গ্যাস পাবে না জেনেও বিনিয়োগ, শতকোটি টাকা গচ্চা : অগভীর সাগরের ১৬ নম্বর বøকে কাজ করত অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি সান্তোস। তারা মগনামায় একটি ক‚প খনন করে গ্যাস পায়নি। এই ক‚প থেকে দুই হাজার ২০০ মিটার উত্তর-পশ্চিমে আরেকটি ক‚প খনন করতে চায়। এই ক‚প খননে ২০১৬ সালে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সকে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় সান্তোস। বাপেক্সের ব্যয় ধরা হয় ২৩০ কোটি টাকা। এই ক‚পে এক হাজার ৬০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস রয়েছে। উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে ৭৩৬ বিসিএফ।

তাদের প্রস্তাব মূল্যায়নে সাত সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে বাপেক্স। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, সান্তোস মগনামা-২ গ্যাসের মজুতের ভুল হিসাব দিয়েছে। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই। মগনামা ক‚পে গ্যাস পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে মাত্র ২২শ’ মিটার দূরে আরেকটি ক‚পে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখানে ক‚প খনন করতে গেলে সব মিলিয়ে বাপেক্সকে সুদসহ ২৬২ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে।

কারিগরি কমিটির রিপোর্টের পরও ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ বোর্ড সভায় বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদ সান্তোসের সঙ্গে যৌথভাবে মগনামা-২ ক‚প খননের প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। ক‚প খননের ১৩ দিনের মাথায় সান্তোস জানায়, এখানে গ্যাস নেই। গ্যাস না পেলেও উচ্চ মহলের চাপে সান্তোসকে ১২৯ কোটি টাকা দিয়েছে বাপেক্স। আরও ১০১ কোটি টাকা পেতে দীর্ঘদিন ধরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

পছন্দ মতো কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতেই কালক্ষেপণ করা হয়। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় সাতটি কম্প্রেসর বসানোর দরপত্র ডাকা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৯১০ কোটি টাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দৈনিক ছয় কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি করা। দরপত্রে সাতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হয় যুক্তরাষ্ট্রের টেকনো স্ট্রিম এনার্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত হয়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ঠিকানা ভুয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি দরপত্র জামানতও জালিয়াতি করেছে। সেই দরপত্র বাতিল করে আবার গত বছরের নভেম্বরে অয়েলহেড আবার দরপত্র আহবান করে। কম্প্রেসর না বসানোয় দিন দিন উৎপাদন কমছে তিতাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

দেশের জ্বালানি তেল পুরোটাই আমদানিনির্ভর। চাহিদার বড় অংশ পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। অপরিশোধিত তেল আনা হয় কম। কারণ, দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির শোধন সক্ষমতা বার্ষিক ১৫ লাখ টন। পরিশোধিত তেল বেশি আনায় ব্যয় বেশি হয়। তাই সরকার ১৯৬৮ সালে স্থাপিত ইআরএলের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। ৩০ লাখ টন তেল পরিশোধন ক্ষমতার ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট নামের একটি প্রকল্প ২০১০ সালে গ্রহণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রথম ইউনিট স্থাপন করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি টেকনিপ। দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে তাদের।
গত ১১ বছরও এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়নি। উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) এখনও চ‚ড়ান্ত হয়নি। এরই মধ্যে সংশোধন করা হয়েছে ১০ বার। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও সংশোধিত ডিপিপিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।

দেশের একাধিক বেসরকারি কোম্পানি বড় আকারের তেল শোধনাগার বসাতে চায়। তাদের সুযোগ দিতেই এই প্রকল্প নানা অজুহাতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল বারবার প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্নিষ্টদের তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার জন্য কারও চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে বিপিসি চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ বলেন, তিনি নতুন এসেছেন। তবে কোনো চাপ আছে বলে শোনেননি। দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন