শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮, ০৮ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে অপরাধীরা

বাড়ছে ছিনতাই : আতঙ্কে রাজধানীবাসী

খলিলুর রহমান | প্রকাশের সময় : ১৫ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৫ এএম

পেশাদার অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারে তৎপর পুলিশ

জীবন-জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিনই ঢাকামুখী হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রায় দুই কোটি মানুষের এ ঢাকা শহরের যেমন রয়েছে নানা সৌন্দর্য আর গল্প তেমনি এর উল্টো পিঠও দেখছেন অনেকে। কিন্তু ব্যস্ততম এ শহরে পদে পদে ফাঁদ পেতে রেখেছেন সংঘবদ্ধ অপরাধীরা। গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে এসব অপরাধী চক্রের ফাঁদে প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন কেউ কেউ। চলতি পথে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, পকেটমার, ছিনতাইকারী, থুথু পার্টি, ধাক্কা পার্টি, সালাম পার্টি, টানা পার্টিসহ বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন স্টাইলে ওঁৎ পেতে আছে অপরাধীরা। অনেক সময় ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও।

সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর রাতে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে ব্যাংক এশিয়ার সামনে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন কেশব চন্দ্র রায় পাপন নামের এক যুবক। নিহতের বাড়ি রংপুর জেলার তারাগঞ্জ থানার উত্তর হাজীপুর গ্রামে। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে লেখাপড়া করতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি একটি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করতেন। সেই সুবাধে তেজগাঁও থানার মুনিপুরীপাড়ার ৩ নম্বর গেটের ৯৩ নম্বর বাসার মেসে থাকত পাপন। হত্যা করে তার মোবাইল ও সাইকেল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

এ ছাড়া গত ১০ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর মগবাজার লেভেল ক্রসিংয়ে মডেল নায়লা নাঈমের ওপর আক্রমণ চালায় একদল ছিনতাইকারী। এ সময় স্কুটিতে ছিলেন নায়লা নাঈম। ছিনতাইকারীর হাত থেকে বাঁচত গিয়ে স্কুটি থেকে পড়ে গিয়ে আহতও হন তিনি। পরে পুরো ঘটনা তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ওইদিন দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মগবাজার রেল ক্রসিংয়ে সিগনালে ছিলেন তিনি। তবে ট্রেন চলে যাবার পর রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় দুজন কালো মতন ছেলে দৌঁড়ে এসে তার গায়ে জড়ানো সামনের দিকের মোবাইল এবং ব্যাগ টানা-হ্যাঁচড়া শুরু করে। এ সময় রেল ক্রসিং পার হওয়াতে তার স্কুটির পিকআপ কমানো ছিলো। এমতাঅবস্থায় ওদের টানাটানির তিনি স্কুটি নিয়ে বামে পড়ে যান। এসময় একজনের হাতে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র থাকায় আশপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি আরো লেখেন, দিনের আলোতে সবার সামনে, এতো মানুষের সামনে এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটে গেল। বামে দ্রæতগামী পিকআপের নিচে আমি পড়ে যেতে পারতাম যদি পিকআপটা টান দিতো তাহলে! কনুইতে আঁচড় লেগেছে। হয়তো অল্পের ওপর দিয়ে বেঁচে গিয়েছি। কিন্তু, এগুলোর সমাধান আসলে কোথায়? এই বিষাক্ত শহরে আমি আর থাকতে চাই না!’

এর আগে গত ৯ অক্টোবর রাতে রাজধানীর রায়েরবাজারে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে শাহিন নামের এক রিকশাচালক আহত হন। আহতের স্বজনরা জানান, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শাহিনের শরীরে ছুরিকাঘাত করে কয়েকজন ছিনতাইকারী। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গত ৮ অক্টোবর ভোর রাতে মোহাম্মদপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ঢালে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মো. রনি মিয়া নামে এক যুবক আহত হন। আহত রনির বাসা হাজারীবাগ থানার রায়েরবাজার পানির পাম্পের পাশে। তিনি রায়েরবাজার একটি মুরগির দোকানে কাজ করেন। ওই দিন ভোর রাতে বাসায় ফেরার সময় বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ঢালে ৪-৫ জন ছিনতাইকারী তার গতিরোধ করে। পরে তার কাছে থাকা ৫ হাজার টাকা নিয়ে যায় এবং মোবাইল নেয়ার জন্য ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে পেটে ও হাতে ছুরিকাঘাত করে।

গত ৭ অক্টোবর রাতে ডেমরার চিটাগাং রোডে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে জয়নাল নামে ট্রাক চালক আহত হন। আহতের সহকর্মী আরেক ট্রাক চালক শাফি ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য জয়নাল নিয়ে রওনা হয়। চিটাগাং রোডে যানজটে আটকা পড়লে এক ছিনতাইকারী তার কাছে যা আছে সব দিয়ে দিতে বলে। না দেয়ায় তার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। পরে তার পকেটে থাকা ৩ হাজার টাকা নিয়ে ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। তার শরীর থেকে অনেক রক্ত বের হয়। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়।

এদিকে, একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করতে না পারায় বন্ধ হচ্ছে না এসব ঘটনা। তাই আতঙ্কে জীবন-যাপন করছেন রাজধানীবাসী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, গত শনিবার বিকালে তিনি ধানমন্ডি থেকে বাসে করে আজিমপুর যাচ্ছিলেন। তবে বাসটি নীলক্ষেত আসার পর এক নারী ওই বাসে উঠেন। এ সময় ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী দুই যুবকও ওই বাসে অবস্থান করেন। এছাড়াও রাস্তায় আরো কয়েকজন যুবক ছিলেন। ওই নারীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, যুবকরা ওই নারীকে টার্গেট করে বাসে উঠে। বিষয়টি ওই নারী বুঝতে পারেন। পরে বিষয়টি অন্য যাত্রী ও বাস চালককে বললে বাস দ্রæত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এতে ছিনতাইকারীদের কবল থেকে বেঁচে যান ওই নারী। ঢাবির ওই ছাত্রী আরো বলেন, প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এতে বাসা থেকে বের হতে ভয় লাগে। তারপরও লেখাপড়ার জন্য বাধ্য হয়েই বাসা থেকে বের হই।

শুধু রাজধানীতে নয়, ঢাকার বাইরেও ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের নিচে ছিনতাইকারীর গুলিতে মো. নূরনবী নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। আহত নূরনবীর বাসা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আর্টি অব্দি কলোনিতে। তিনি মো. আলমগীর হোসেনের ছেলে। নূরনবী ওই দিন রাতে বাসা থেকে বের হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের নিচে আসেন। সেখানে ছিনতাইকারীরা মোবাইল ও টাকাÐপয়সা ছিনিয়ে নিতে গেলে তিনি বাধা দেয়। এ সময় তার ডান পায়ে গুলি করে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

এদিকে, ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি অজ্ঞানপার্টির সদস্যরাও বেপরোয় হয়ে উঠেছেন। তাদের খপ্পরে পড়ছেন স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। জানা যায়, গত ৫ অক্টোবর রাজধানীতে চলন্ত বাসে পারভেজ মল্লিক নামে পুলিশের এক এএসআই অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। পরে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভুক্তভোগী পারভেজ মল্লিক টঙ্গী পূর্ব থানায় সহকারী উপ-পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। তার বাড়ি চাঁদপুর মতলব উত্তর থানা এলাকায়। এএসআই পারভেজের প্যান্টের পকেটে আইডি কার্ড ও মোবাইলফোন ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। এএসআইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া একই বাসের যাত্রী মো. সাইদুর রহমান জানান, গত ৫ অক্টোবর দুপুরে বলাকা পরিবহনের বাসটি গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সায়েদাবাদের দিকে যাচ্ছিল। বাসে করে বনানী পর্যন্ত আসার পর তিনি দেখেন, তার পেছনের একটি সিটে অচেতন হয়ে পড়েছেন পারভেজ নামে ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তখন তিনি তাকে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়া যাচ্ছিলেন না। পরে তিনি নিজেই বাস থেকে তাকে নামিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। তিনি বলেন, বাসের ভেতর এক বই বিক্রেতা হকার উঠেছিলেন। ওই হকার তার ওপর কোনোভাবে চেতনানাশক প্রয়োগ করতে পারেন বলে ধারণা তার। ভুক্তভোগী পারভেজ জানান, গত ৫ অক্টোবর থানা থেকে বের হয়ে বলাকা বাসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উদ্দেশে বাসে উঠি। বাসটি খিলক্ষেত আসার পরে পাশের সিটে বসা অপরিচিত লোকের দেওয়া পানি পান করি। এরপরই অচেতন হয়ে পড়ি।

গতকাল ডিএমপির পাবলিক রিলেশন্স ও মিডিয়া বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ফারুক হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, মাদকাসক্তরা রাস্তার পাশে ঘুমায়। যখন মাদক ক্রয় করতে পারে না; তখন তারা ছিনতাই করে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এছাড়া পেশাদার অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার ডিএমপির আটটি বিভাগে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাবও তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন