সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮, ২০ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

ধর্ম দর্শন

কালিমা তায়্যিবাহ এর গুরুত্ব ও দাবি

মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান | প্রকাশের সময় : ৪ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

কালিমা তায়্যিবাহ হলো “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। এর অর্থ - আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নেই, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। এই পবিত্র বাক্যটিকে ইসলামের প্রবেশদ্বার বলা হয়। এটি পাঠ করা ছাড়া কেউ মুমিন দাবি করতে পারবেনা। এমনকি এটি স্বীকার করা ছাড়া যত আমলই করুক না কেন সেটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা। বাক্যটি পাঠ করার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা-চেতনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। কোনো ব্যক্তি সারাজীবন শিরক ও কুফরিতে লিপ্ত থেকে জীবনের শেষ সময়ে এসে যদি বাক্যটি মনেপ্রাণে পাঠ করে তা হলে সেও আল্লাহর কাছে মুক্তি ও সফলতা লাভের যোগ্য হয়ে যায়। কালিমা তায়্যিবাহ এর তাৎপর্য হলো-

১। কালিমা তায়্যিবাহ ঈমানের ভিত্তি ঃ মূলত কালিমা তায়্যিবা অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ ও মর্যাদাবান বাক্য। ঈমান হলো তিনটি বিষয়ের সমষ্টি। ১. মৌখিক স্বীকৃতি। ২. অন্তরে বিশ্বাস। ৩. তদনুসারে আমল করা। উক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে মৌখিক স্বীকৃতির বিষয়টি কালিমা তায়্যিবাতে পাওয়া যায়। এটি কয়েকটি অক্ষরের সমন্বয়ে হলেও মিজানের পাল্লায় অত্যন্ত ভারী হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দেন) ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আলে ইমরান-১৮)

২। তাকওয়ার বাণী ঃ আল্লাহ তায়ালা বলেন- অতঃপর আল্লাহ তার রাসূল ও মুমিনদের উপর স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাকওয়া বা খোদভীরুতার বাণী তাদের উপর অপরিহার্য করেছেন এবং তারা এরই অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত ছিলো এবং আল্লাহ সবকিছু জানেন। (সূরা ফাতাহ : ২৬)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ মুফাসসেরগণ বলেন, এখানে খোদাভীরুতার বাণী বলে- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” কেই বুঝানো হয়েছে। (বায়হাকী : পৃ-১৩১, কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাত)

৩। কালিমা তায়্যিবাহ গুপ্তধন আকারে সংরক্ষিতঃ আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা (আঃ) কে হযরত খিজির (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে বলেছিলেন। উভয়ের মাঝে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে সূরা কাহাফে দীর্ঘ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- বাকী রইল ঐ প্রাচীর, তা ছিল নগরের দু’জন এতিম বালকের এবং সেটার নীচে তাদের গুপ্ত ধন-ভান্ডার ছিল এবং তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ। (সূরা কাহাফ-৮২)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, সেটি ছিল স্বর্ণের একটি ফলক। সেখানে সাতটি বিষয় লেখা ছিল। তম্মধ্যে সাত নম্বর বাক্যটি ছিল- লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ। সুতরাং হযরত মুসা (আঃ) এর সাথে হযরত খিজির (আঃ) এর ঘটনাটি হয়েছিল প্রিয় নবি (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগমনের প্রায় কয়েক হাজার বছর পূর্বে আর তখনও এই কালিমাটি কে আল্লাহ তায়ালা গুপ্তধন আকারে রেখেছিলেন। (তাবরানী-১৬২৯, ইমাম সুয়ুতী- তাফসিরে দুররে মনসূর : ৯/৬০০)

৪। কবরে কালেমা তায়্যিবাহ এর উপর দৃঢ়তা ঃ কবর আখেরাতের প্রথম সোপান। প্রত্যেক মানুষকে কবরস্ত করার পর পুনরায় তার রূহ ফেরত দেওয়া হয়। সেখানে মুনকার নাকির নামক দু’জন ফেরেশতা প্রশ্ন করবেন। যিনি ফেরশতাদ্বয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন তিনি সফল হবেন। অন্যথায় কবরই তার জন্য শাস্তির স্থান হিসেবে নির্ধারিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদেরকে মজবুত বাক্য দ্বারা মজবুত রাখেন পার্থিব জীবনে এবং পরকালে। আল্লাহ জালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন। (সূরা ইবরাহীম-২৭)

হাদীসে পাকে রয়েছে, কবরে মুমিনকে প্রশ্ন করার জন্য ভয়ঙ্কর মুহূর্তে সে আল্লাহর সমর্থনের শক্তি নিয়ে এই কালেমার উপর অটল থাকবে এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ সাক্ষ্য দেবে। উল্লেখিত আল্লাহর বাণীটির উদ্দেশ্যও তাই। (তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে সাফওয়াতুত তাফাসির-২/৯৭, তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত তাফসীর ঃ পৃ:৭১৮)

৫। কালিমা তায়্যিবাহ নিরাপত্তার প্রতীক ঃ কোনো অবিশ্বাসী যতই পবিত্রতা অর্জন করুকনা কেন ঈমান না আনার কারণে তারা অপবিত্র। যেই মাত্র এই পবিত্র বাক্য একনিষ্ঠতার সাথে পাঠ করলো সাথে সাথে সে পবিত্র হয়ে যায়। সহীহ মুসলিম শরীফে একটি অধ্যায় রয়েছে- “লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ যতক্ষণ না তারা স্বীকার করে যে, (লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এবং নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং নবি করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে বিধান এনেছেন তার প্রতি ঈমান আনে। যে ব্যক্তি এসব করবে, সে তার জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে, তবে শরিআত সম্মত কারণ ব্যতীত। আর অন্তরের খবর আল্লাহর কাছে। যে ব্যক্তি যাকাত দিতে ও ইসলামের অন্যান্য বিধান পালন করতে অস্বীকার করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইমামের গুরুত্বরোপ করার নির্দেশ”। (সহীহ মুসলিম, অধ্যায় নং-৮)
রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছে- আমাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে, আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে যতক্ষন না তারা বলে: (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহ) আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহ রাসূল। যখন এটা তারা বাস্তবায়ন করবে, আমার থেকে তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ করে নিবে, তবে কালিমার হক ব্যতীত এবং তাদের হিসাব আল্লাহর উপর। (সহীহ বুখারী-২৫)

৬। প্রিয় নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুখনিসৃত বাণী ঃ হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু যর (রাঃ) বলেন, আমার চাচাত ভাই হযরত নুআইম আলগিফারী (রাঃ) ও আমি একসাথে বের হলাম রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সন্ধানে। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপনে ছিলেন। তখন আবু যর (রাঃ) তাকে বলেন, হে মুহাম্মদ! আমরা আপনার কাছে এসেছি আপনি কী বলেন তা শুনার জন্য। তখন নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন আমিতো এটাই বলি- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। সাথে সাথে আবু জর (রাঃ) ও তার সাথিরা ঈমান আনলেন। (আল ইসাবা ফি তামিজিস সাহাবা ঃ ৬/৩৬৫ নং- ৮৮০৯)

৭। বেহেশতের দরজায় কালিমা লেখা ঃ হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন (মেরাজ কালে) আমি বেহেশতে প্রবেশ করার সময় এর দু-পাশে স্বর্ণাক্ষরে তিনটি লাইন লেখা দেখেছি। এক- লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। দুই- আমরা যে ভালো কাজগুলো পাঠিয়েছিলাম তা পেয়েছি। যা খেয়েছি তা থেকে উপকৃত হয়েছি। যা ছেড়ে এসেছি তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। তিন- উম্মত হলো গুনাহগার, আর রব হলো ক্ষমাশীল। (ইমাম সুয়ুতী, জামেউস সগীর, নং- ৪১৮৬)

কালিমা তায়্যিবাহ এর গুরুত্ব ঃ আল্লাহর সর্বোত্তম সৃষ্টি মানুষের কর্মের পুরস্কার অথবা শাস্তির মানদন্ড হচ্ছে এই কালিমা। এটির প্রচারের জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবি-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এক কথায় মুসলিম জাতিসত্তার ভিত্তি হলো এই কালিমাটি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি আপনার পূর্বে যে রাসূলই পাঠিয়েছি তার প্রতি ওহি দিয়েছি যে, আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। কাজেই তোমরা আমারই বন্দেগী কর”। (সূরা আম্বিয়া-২৫)

হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহঃ) বলেন, মানুষের উপর আল্লাহ তায়ালার বড় নিয়ামত হলো তিনি তাদেরকে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। পৃথিবীতে পিপাসার কাতর ব্যক্তির জন্য ঠান্ডা পানি যেমন প্রয়োজন তেমনি জান্নাতবাসিদের জন্য এই কালিমা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি এই কালিমাকে স্বীকৃতি দান করলো সে তার সম্পদ এবং জীবনের নিরাপত্তা গ্রহণ করলো। আর যে তা অস্বীকার করলো সে তার জীবন ও সম্পদ নিরাপদ করলনা। (ইবনে রজব, কালিমাতুল ইখলাছ: ৫২-৫৩)

কালিমা তায়্যিবার ফলে ঈমানের সম্পদ অর্জিত হয়। তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয় এবং আল্লাহর প্রেরীত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভলোবাসা ও অনুগত্য প্রদর্শনের মনোভাব তৈরি হয়। সারা জীবন মুমিন বান্দা পবিত্র বাক্যের আলোকে জীবন পরিচালনা করে তাহলে এর ফসল কবরে-হাশরেও লাভ করবে।
কালিমা তায়্যিবাহর দাবি ঃ কালিমা তায়্যিবাতে বিশ্বাসীদের কিছু অত্যাবশ্যকীয় দাবি পূরণ করতে হয়। যেমন,
১। একমাত্র আল্লাহর সামনেই আত্মসমর্পন করা এবং অন্য কারো সামনে মাথা নত না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমরা তোমাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তন কর এবং তার কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করো। (সূরা জুমার-৫৪) অন্যত্র তিনি বলেছেন, অতএব তোমাদের ইলাহ তো একমাত্র ইলাহ সুতরাং তারই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। (সূরা হজ-৩৪)

২। শুধুমাত্র তারই ইবাদত করা। তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করা। আল্লাহ বলেন- এবং প্রত্যেক জাতির কাছে আমি রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন করো। (সূরা আন নাহল- ৩৬)

৩। আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা ঈমান এনেছেন আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসি, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। (সুরা বাকারা- ২৫৭)

৪। বিজয় অর্জনের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা। কেননা বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা অব্যাহতি পেয়ে যাবে, যে আমরা ঈমান এনেছি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (সূরা আনকাবুত-২)

লেখক : সহকারি শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা), চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
হাফিজুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ৩:১০ পিএম says : 0
মাশাআল্লাহ
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন