সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৬ মুহাররম ১৪৪৪

স্বাস্থ্য

সুস্থ ফুসফুস সর্বাধিক গুরুত্বের এখনই সময়

বিশ্ব সিওপিডি দিবস ২০২১

| প্রকাশের সময় : ২৬ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৪ এএম

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সতেরই নভেম্বর পালিত হল বিশ্ব সিওপিডি দিবস। অসংক্রমক ব্যধিগুলোর মধ্যে সিওপিডি একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রোগ। ২০২১ সালের মধ্যে পৃথিবীব্যাপি মৃত্যুর সকল কারনের মধ্যে এই সিওপিডি রোগটির অবস্থান হবে তৃতীয়। ভয়ংকর এই রোগটি সম্পর্কে তাই আমাদের ভালভাবে জানতে হবে এবং প্রতিরোধে সচেষ্ট হতে হবে।

সিওপিডি বা দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট জনিত রোগটি মূলত: শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ জনিত রোগ। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক উপাদান শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করার ফলে শ্বাসনালী ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং আক্রান্ত স্থানে প্রদাহ তৈরী হয়। আক্রান্ত ফুসফুসের ছোট ছোট বায়ু কুঠুরিগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় (এমফাইসিমা) অথবা শ্বাসনালীর অংশগুলোর আবরণের ধরণ পরিবর্তিত হয়ে বাড়তি মিউকাস নিঃস্বরণ করে এবং সিলিয়া বা প্রক্ষেপকযুক্ত আবরণীয় সংখ্যা কমে যায় (ব্রংকাইটিস)। ফলে দীর্ঘ মেয়াদী কাশি, কফ নিঃসরন ও শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বয়সের সাথে সাথে সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করে এবং একসময় এমন অবস্থায় এসে পৌছায় যে তখন রোগী নিজের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতেও শ্বাসকষ্টে ভোগেন। একই সাথে দানা বাঁধে সিওপিডি জনিত অন্যান্য জটিলতা যেমন- হৃদরোগ, মাংশপেশীর দূর্বলতা, ওজন হ্রাস, বিষণ্ন্নতা, ফুসফুসের ক্যান্সার ইত্যাদি নানান ধরণের বাড়তি সমস্যা।

ধূমপান, ধূমপান এবং ধূমপানই সিওপিডির প্রধানতম কারণ। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার পেট্রোলিয়াম জাতীয় ধোঁয়া, লাকড়ির চুলা নিঃসৃত ধোয়া এবং অন্যের সেবনকৃত সিগারেটের ধোঁয়া-ফুসফুসের একই ধরনের ক্ষতি করতে পারে। তবে সকল ধুমপায়ী হয়ত সমানভাবে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে ভোগেননা। এ ক্ষেত্রে জিনগত প্রবনতা এই রোগটির তীব্রতার গতি নির্ধারণ করে। কত দ্রুত একজন ধুমপায়ী রোগটির জটিল পর্যায়ে আর্বিভুত হবে সেটি নির্ধারিত করা না গেলেও নির্দ্বিধায় বলা যায় একজন ধুমপায়ী জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে শ্বাস কষ্টের এই জটিল সমস্যায় অবশ্যই উপনিত হবেন। যেমন, যারা প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট দশ বছর ধরে খেয়ে চলেছেন চল্লিশ উর্ধ্ব বয়সে তাঁদের মধ্যে প্রতি দুইজনের একজন সিওপিডিতে ভুগবেন। তাই ধুমপান ত্যাগ করা সিওপিডি থেকে মুক্ত থাকার প্রধানতম উপায়। এক্ষেত্রে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার তামাকমুক্ত বাংলাদেশ, ২০৪০ বাস্তবায়নে, তরুন প্রজন্মকে ধ্বংষের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে তামাক কোম্পানীর সকল ধরণের প্রচারণা বন্ধ করা, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত প্রোগ্রামগুলোতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তামাকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ও আশেপাশে অর্থাৎ ১০০ গজের মধ্যে তামাকের বিক্রয় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে সিওপিডি প্রতিরোধে পদক্ষেপ রাখবে-এটি আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

গত দুই বছর যাবৎ আমাদের সারা পৃথিবী কোভিড এর মত একটি ভয়াবহ শ্বাসতন্ত্রের রোগে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। কোভিডের কারণে আমাদের অনেকেরই ফুসফুস ইতিমধ্যে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। তাই এই দূর্বল ফুসফুসে সিওপিডি’র মত দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসের রোগ স্বাস্থ্য মানের জন্য আরও ঝুঁকিপূণ হয়ে উঠেছে। তাই বর্তমান সময়ে ফুসফুসের যত্ন নেয়া, ফুসফুসের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সর্বাধিক অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই ২০২১ সালে সিওপিডি দিবসের প্রতিপাদ্য “সুস্থ ফুসফুস সর্বাধিক গুরুত্বের এখনই সময়”।

আপনি যদি একজন সাধারন তরুন ধুমপায়ী হন তবে এখনই ধুমপান ত্যাগ করুন। যদি মধ্য বয়সি এমন কেউ হন, যিনি সারা বছরব্যাপি খুশখুশে কাশি আর হালকা শ্বাস কষ্টের কারনে কর্ম উদ্দীপনা হীনতায় ভুগছেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন। সহজ কিছু লাং ফাংশন পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত করুন আপনি সিওপিডি রোগটিতে ভুগছেন কিনা। যদি অবস্থা এমন হয়ে থাকে যে সারা বছর শ্বাসকষ্টে কফ কাশিতে ভুগছেন, পায়ে পানি চলে আসছে, সাথে রয়েছে হৃদরোগ সহ অন্যান্য জটিলতা তবে অবশ্যই সিওপিডির সঠিক চিকিৎসা গ্রহন করুন। বিশেষত বছরের যে বিশেষ কয়েকটি সময়ে শ্বাস কষ্ট মারাত্মক অবস্থা ধারণ করে (এক্সাজারবেশন) সেই সময়গুলোতে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিন। পুষ্টিকর খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, ভ্যাকসিন নিন, প্রয়োজনে দীর্ঘ মেয়াদি অক্সিজেন গ্রহণ করুন। তবে প্রত্যেকটি পর্যায়ে অবশ্যই ধুমপান বর্জন করুন। আর আপনি যদি হন কোন সমাজ ও স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক, তবে গড়ে তুলুন ধুমপান নিরোধক সংঘ। বন্ধুকে সিগারেট শলাকা এগিয়ে না দিয়ে- দিন স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপনের পরামর্শ। সহযোগিতা করুন সিওপিডির রোগীকে, ধুমপান থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প নেয়া পরিজনকে, সচেতন করুন বন্ধু-প্রতিবেশী-স্বজন ও সমাজকে। “সুস্থ ফুসফুস সর্বাধিক গুরুত্বের এখনই সময়” বিশ্ব সিওপিডি দিবস ২০২১ তে এই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়,
শাহবাগ, ঢাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন