শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৭ নভেম্বর, ২০২১, ১২:১৩ এএম

গত বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার সুপারিশ অনুমোদন করেছে। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেল বাংলাদেশ, যদিও এর পরিপূর্ণতা ঘটবে ২০২৬ সালে। এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এই সুপারিশ করেছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সিডিপি’র মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতার মান, এই তিন সূচকে নির্দিষ্ট মান অর্জন করে। এর তিন বছর পর এ বছর এই তিন সূচকে আবারও মান অর্জন করে। এ প্রেক্ষিতে, এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের নাম চূড়ান্ত করে সিডিপি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তার ভিত্তিতেই সুপারিশ অনুমোদন দিয়েছে। এই সুপারিশ নিঃসন্দেহে দেশের ভাবমর্যাদার জন্য গৌরবের। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার তিন শর্ত বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও দক্ষ নেতৃত্বের কারণে। আমরা এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া যেমন গৌরবের, তেমনি তা চ্যালেঞ্জেরও বটে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বেজুড়ে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পর এ সুবিধা আর পাবে না। তখন রফতানি পণ্যের ওপর দেশগুলো বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে। এতে রফতানি ১৫ শতাংশের বেশি কমতে পারে। শুধু পোশাক রফতানি কমতে পারে ৫০০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে প্রতি বছর ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার রফতানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হবে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া বাঞ্চনীয়। এক. আক্ষরিক ও বাস্তব অর্থে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া। দুই. কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পাওয়া। আমাদের দেশের কথা বিবেচনা করলে তা অনেকটা দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে। আমরা কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পেয়েছি বটে, তবে বাস্তবের সঙ্গে তা কতটা যায়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সাধারণ দৃষ্টিতে, দেশের উন্নয়নের প্রধানমতম সূচক অর্থনৈতিক সংকট মুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। বলা হচ্ছে, আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২৫৫৪ ডলার হয়েছে। এ আয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, একজন বেকারের আয় বলতে কিছু নেই। আর পরিবারের সবাই আয়ও করে না। বরং করোনা কোটি কোটি মানুষকে যেমন দরিদ্র করেছে, আয় কমিয়েছে, তেমনি বেকারও করেছে। দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, দেশের জনসংখ্যার ৬ কোটির বেশি মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। দারিদ্র্যসীমা ৪০ শতাংশের উপরে। সরকার দরিদ্র হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়া, আয় কমে যাওয়াÑএসব বিষয় কখনোই স্বীকার করতে চায় না। অথচ সবাই বিষয়গুলো দেখছে, বুঝছে এবং জানছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে অর্ধেক জিনিসপত্র কিনে কোনোরকমে জীবনযাপন করছে। পত্র-পত্রিকায় সাধারণ মানুষের এসব দুর্দশার চিত্র প্রতিনিয়ত তুলে ধরা হচ্ছে। সরকার সবসময়ই মনে করে জনগণ সুখে আছে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার বিষয়টি সরকারের অনুকূলে এবং তার জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। তবে এ খবরে সাধারণ মানুষ খুশি কিনা, সেটাই প্রশ্ন। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশ উন্নত হলো, নাকি উন্নয়নশীল হলো, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না। তাদের কাছে তাদের জীবনযাত্রা কতটা মসৃণ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ হলো, সেটাই বিবেচ্য। এই নিরিখে, তাদের আনন্দ প্রকাশ বা উল্লসিত হওয়ার সুযোগ নেই। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়া নিয়ে সরকার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে, তা স্বাভাবিক। তবে আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত এই উচ্ছ্বাস থাকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। সরকারকে তিনটি সূচক ধারাবাহিকভাবে যেমন ধরে রাখতে হবে, তেমনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা প্রাপ্তি পিছিয়ে যেতে পারে। এর নজির বিশ্বে রয়েছে। ২০০৩ সালে মালদ্বীপকে উন্নয়নশীল দেশের সুপারিশ করেছিল সিডিপি। দেখো গেছে, সুনামির কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে দেশটি ৯ বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। ২০১৮ সালে নেপালের এই স্বীকৃতি পাওয়ার কথা থাকলেও তা তিন বছর পিছিয়ে এ বছর পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবে তা আমরা আশা করি না। তবে তার জন্য সরকারকে সূচকের ধারাবাহিকতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে হবে।

একটি দেশ কতটা উন্নত তা নির্ভর করে তার জনগণের লাইফ স্ট্যান্ডার্ড বা জীবনমানের ওপর। মানুষ স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারছে কিনা, এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান কোন অবস্থায় রয়েছে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই তা দেখা যায়। করোনায় বিধ্বস্থ হওয়া অর্থনীতি এবং বেকার, দরিদ্র, কর্মহারা ও আয় কমে যাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন আগামী পাঁচ বছরে সহনীয় পর্যায়ে বা উন্নত হয়ে যাবে, এমন আশা করা কঠিন। এ বিষয়টি সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন