রোববার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ০৯ মাঘ ১৪২৮, ১৯ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

করোনায় ছেদ পড়ছে এইডস কার্যক্রম

বিশ্ব এইডস দিবস আজ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:০২ এএম

দেশে গত দুই বছর ধরে চলা করোনা মহামারীর কারণে এইচআইভি বা এইডস রোগ কমানোর প্রচেষ্টায় ছেদ পড়ছে। ২০১৬ সালে ৫৭৮ জন রোগী শনাক্তের পর ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ৮৬৫ জনে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালে তা আরও বেড়ে ৮৬৯ এবং ২০১৯ সালে ৯১৯ জন হয়। কিন্তু গতবছর মার্চের শুরুতে দেশে করোনা মহামারী প্রতিরোধে লকডাউনসহ বিধিনিষেধের ফলে শনাক্ত প্রচেষ্টায় ছেদ পড়ে। ফলে আগের বছরের চেয়ে নতুন শনাক্ত কমে ৬৫৮ জনে নেমে আসে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হচ্ছে করোনাকালে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে এইচআইভি। ফলে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ওই রিপোর্ট মতে, ভাইরাসটি আক্রান্তদের চিকিৎসায় অ্যান্টি রেট্রোভাইরাল ওষুধ ব্যবহার হয়। কিন্তু এই ওষুধ এখন তেমন কাজ করছে না। এর ফলে গত এক বছরে নতুন করে ২০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে বিকল্প চিকিৎসা খুঁজে বের করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এদিকে টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নির্মূল করার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমন পরিস্থিতি দেশে এইচআইভি শনাক্ত কমলে নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ছেদ পড়ছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার দেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব এইডস দিবস-২০২১। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘এন্ডস ইন ইকুয়ালিটিস, এন্ডস এইডস, এন্ডস প্যানডেমিক অর্থাৎ সমতার বাংলাদেশ এইডস ও অতিমারী হবে শেষ।’ দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আজ সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস্ এন্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী চলতি বছরের এইডস পরিস্থিতি তুলে ধরবেন। পাশপাশি আসিডিডিআর’বি, ব্র্যাক, সেভ দ্যা চিলড্রেনসহ বেসরকারি সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

সেভ দ্যা চিলড্রেনের এইচআইভি এইডস প্রোগ্রামের দেয়া তথ্য অনুযায়ী- ২০২০ সালে করোনা দেখা দেয়ার পর এপ্রিল মে মাসে লকডাউন দেয়া হয়। ওই সময় এইচআইভি পরীক্ষার পরিমাণ খুব কম ছিল। সারাদেশে লকডাউন ঘোষনার পর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রা স্থিবির হয়ে পড়ে। তাদের মুখোমুখি হতে হয় চরম প্রতিক‚লতার। যৌন কর্মীদের খদ্দের কমে যায়। মাদক দূষ্পাপ্য হয়ে পড়ে এবং দাম বেড়ে যায়। আইন শৃংখলা বাহিনী লকডাউন নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকায় এইচআইভি শনাক্তে ড্রপ ইন সেন্টার (ডিআইসি) কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি সুইয়ের মাধ্যমে মাদকগ্রহণকারীদের ২১টি ডিআইসির মধ্যে ৫টি এবং যৌন কর্মীদের ২৯টি ডিআইসর মধ্যে ২৬টি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে রোগটির সেবা সমূহ যেমন- এইডস পরীক্ষা, মেথাডন এবং এন্ট্রিরেট্রাভাইরাল (এআরভি) প্রদান, ভাইরাসটি প্রতিরোধমূলক একক ও দলীয় শিক্ষা, যৌন রোগ থেকে শুরু করে অন্যান্য চিকিৎসা প্রদান বাধাগ্রস্থ হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, স্বয়ং ডবিøওএইচর তথ্য বলছে, করোনাকালে বিশ্বব্যাপী এইচআইভি বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে এসে নতুন রোগী কমে গেছে। মূলত করোনার সময় বিধিনিষেধ থাকায় এইচআইভি নিয়ে রিপোর্টিং ঠিক মত হয় নাই। এতে শনাক্ত কম দেখাচ্ছে। এখানে দুটি জিনিস ঘটছে যার প্রথমটি হলো- সেবাদাতাদের কাছে সময়মত রোগী আসেনি। আবার তারও যেতে পারেনি। আরেকটি হলো করোনায় কর্মহীন ও গৃহবন্দীর পরিবেশে বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে মানুষের মধ্যে সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটি বেড়েছে। এক্ষেত্রে নিরাপদ ও সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক যৌন সম্পর্ক কমেছে। মানুষের জš§নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবারহ ও ক্রয় ক্ষমতাও কমেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে করোনাকালে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বেড়েছে। ফলে রোগী শনাক্ত কমেছে।

বাংলাদেশে জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রাম সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে রোগটি প্রথম ধরা পরে। ধারণা করা হয় দেশে ১৪ হাজার এইডস আক্রান্ত রোগী রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৬০ হাজার ৪২৮ জন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠিকে পরীক্ষা আওতায় আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে ১৬ হাজার ৮৭ জনের কো-মরবিডিটি ছিল। সাধারণ মানুষ ছিল ৩২ হাজার ৮০০ জন। এছাড়া ৮১ হাজার ২৯৯ জন গর্ভবতী মা সহ মোট ৫ লাখ ২ হাজার ১৬৫ জনকে এইডস পরীক্ষা ও রক্তদানের সময় ৮ লাখ ৩০ হাজার জনকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এইডস রোগীর নিশ্চিত সংখ্যা ৮ হাজার ৩২ জন। এরমধ্যে চিকিৎসা আওতায় এসেছে ৫ হাজার ৮১ জন। মারা গেছেন ১ হাজার ৩৮৩ জন। গত বছর নতুন রোগী ধরা পড়েছে ৬৫৮ জন এবং ১৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালে শনাক্ত রোগীর মধ্যে পুরুষ ৪০, নারী ৮০ জন। এরমধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির মধ্যে এইআইভি পজেটিভ পাওয়া গেছে ১২৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র আরও জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অনুমিত জনগোষ্ঠির ৫৬ শতাংশ জানতে পেরেছে তাদের শরীরে এইডস রয়েছে। জানার পর ৭৬ শতাংশ চিকিৎসা আওতায় এসেছে। সেবা নেয়ার পর ৮৮ শতাংশ মানুুষের এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালে বিশ্বে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের আনুমানিক সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭৭ লাখ। গত বছর এইচআইভির কারণে ৬ লাখ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে এবং ১৫ লাখ মানুষ নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) পেয়েছে।

বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও প্রফেসর ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ভবঘুরে, পরিবহন শ্রমিক, ভাসমান যৌনকর্মী ও প্রবাসীদের মাধ্যমে এইডস বেশি পরিমাণে ছড়ায়। কিন্তু করোনাকালে অনেক ধরনের বিধিনিষেধ থাকায় এই শ্রেণির মানুষ এসব কাজের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ কম পেয়েছে। অন্যদিকে রোগটি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত হয়েছে ফলে রোগী শনাক্ত কমেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে এইডস নির্ম‚লের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা উচ্চভিলাসী চিন্তা। কারণ গত দুই বছর পরীক্ষা ও রোগী দুটোই কমছে। কাজেই এখন নতুন করে লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মপরিকল্পনা পূর্ণমূল্যায়ন করা উচিত।

জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোলের পরিচালক ডা. মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম মিঞা বলেন, এখন পর্যন্ত ১৬ কোটি জগোষ্ঠির মধ্যে ভাইরাসটি সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশের নিচে। যা স্বস্তির বিষয়। অন্যদিকে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমারে এই রোগীর সংখা অনেক বেশি। তবে এই মুহুর্তে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংক্রমণ হার কমানো।

তিনি বলেন, করোনার সময়ে রোগী শনাক্তে পরীক্ষা কিছুটা কম হলেও তেমন প্রভাব পড়েনি। সে সময় রোগীদের কাছে ওষুধ পৌছিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন পরীক্ষা কেন্দ্র বাড়িয়ে ২৮টি করা হয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রে সাতটি থেকে ১১টা করা হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ফোকাল পার্সনরা সহায়তা করছে। এখন ব্যাপক প্রচার করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে অনুমিত জনগোষ্ঠির মধ্যে ৯৫ শতাংশ কেস শনাক্ত করতে হবে। এজন্য প্রথমে সারা দেশে থেকে রোগী খুজে বের করতে হবে। এখন যতটুকু সময়ে আছে সেটার মধ্যে করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। ৬৪ জেলায় স্কিনিং সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে। এ জন্য বিভিন্ন এনজিও, নিরাপদ রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থাসহ নানাভাবে কাজ হচ্ছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন