বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২, ০৬ মাঘ ১৪২৮, ১৬ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

মাদক আইনের অপপ্রয়োগ

ইয়াবা-আইস-এলএসডি-ডিওবি মূল কারবারিরা ছাড় পাচ্ছে ফাঁসানো হচ্ছে নিরীহদের

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ২ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:০১ এএম

কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদকের বিস্তার। নেশার তালিকায় নিত্য-নতুন মাদকদ্রব্য যুক্ত হচ্ছে। সেই মাদককে সংযুক্ত করে আইন হচ্ছে। কঠিন সব ধারা যুক্ত করা হচ্ছে আইনে। বিচারিক জটিলতা দেখা দিলে আইনে সংশোধনীও আনা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই রোধ হচ্ছে না মাদক। কেন এই ব্যর্থতা? সমস্যাই বা কোথায়?
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন যতই ‘হালনাগাদ’ করা হোক না কেন- এতে ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। থেকে যাচ্ছে আইন অপপ্রয়োগের পুরনো পরম্পরা। বিদ্যমান আইনে শুধু মাদক সেবনকারী, খুচরা বিক্রেতা ও বহনকারী ধরা পড়ছে। মাদকের ‘গডফাদার’ পাচ্ছেন আনুকূল্য। মূল মাদককারবারিকে ধরা না গেলেও নিরীহ মানুষকে বিদ্যমান আইনে ফাঁসিয়ে দেয়া যাচ্ছে অনায়াসেই।

নবাগত ইয়াবা-আইস-এলএসডি-ডিওবি : মিয়ানমারের শান প্রদেশের বিপজ্জনক ঢালু বেয়ে কোনো গাড়ি উঠতে চাইত না। অশ্বারোহীরা সুস্থ সবল ঘোড়াগুলোকে ‘পাগলা ঘোড়া’ বানাতে বিশেষ ধরনের বটিকা সেবন করাতো। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই বটিকাই হচ্ছে ‘ইয়াবা’। থাইল্যান্ডে এটিকে বলে ‘ম্যাড ড্রাগ’। ভারতে এটি ‘ভুলভুলাইয়া’। বাংলাদেশের স্থানীয় নাম ‘ইয়াবা’ কিংবা ‘বাবা’। এছাড়াও এটির ‘নাজি’, ‘হিটলার্স ড্রাগ’, ‘চকোলি’র মতো চটকদার নাম রয়েছে। বার্মিজ এই বটিকা এক সময় কঠোর পরিশ্রম করার লক্ষ্যে শ্রমজীবীদের সেবন করানো হতো। পরে এটি থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের যৌনকর্মীরা গ্রহণ করতে শুরু করে।
মিয়ানমার এটির প্রধান উৎপাদনকারী দেশ। তবে তারা এটি রফতানি করে। কিন্তু সেবন করে না। কারণ তারা জানে জিনিসটি কী এবং কেমন করে প্রাণীর শরীরে কাজ করে। ‘ইয়াবা’র রাসায়নিক বিশ্লেষণে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এটির প্রধান উপকরণ ‘মেথামফেটামিন’ ও ‘ক্যাফেইন’। ‘মেথামফেটামিন’ দিয়ে তৈরি বটিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকদের নির্ঘুম রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো।

১৯৫০ সালে জাপানে মেথামফেটামিন ব্যাপক ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশে সহজলভ্য ‘ইয়াবা ট্যাবলেট’ এ মেথামফেটামিনের সঙ্গে মেশানো হয় হাইড্রোক্লোরিক এসিড, এসিটোন, রেড ফসফরাস, ব্যাটারির লিথিয়াম ও সালফিউরিক এসিড। এসিটোন মূলত নেইল পলিশ রিমুভার। ‘মেথামফেটামিন’ এবং ‘ক্যাফেইন’ দু’টি প্রাণীর মস্তিষ্কের জন্য উত্তেজনক পদার্থ। তাই ইয়াবা সেবনকারীকে আচরণে বেপরোয়া করে দেয়। মনোজগতেও আনে বিরাট পরিবর্তন। হাড় ঝিরঝিরে মানুষও নিজেকে পরাক্রমশালী ভাবতে থাকে। যেকোনো অপরাধ সংঘটনে তার বিবেকে বাধে না।

কোনো মানুষ দু-একটা ইয়াবা সেবন করলেই মস্তিষ্কের ছোট রক্তনালীগুলো নষ্ট হয়ে যায়। নিয়মিত করলে অল্প বয়সে ব্রেইন স্ট্রোক, প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৯৫ ভাগ। ওজন কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হ্যালুসিনেশন, উন্মাদের মতো আচরণ, গোয়ার্তুমি, পুরুষত্ব হারানো ও নারীদের বন্ধ্যত্ব হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল। মানুষ সাময়িক উত্তেজনার জন্য ইয়াবা-বটিকা সেবন করলেও এটির ক্ষতি-ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি। এটি সেবনের নেশা মানুষকে পেয়ে বসে। মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে আসা ‘ইয়াবা’ দেশে এখন সহজলভ্য। হতাশাগ্রস্ত লাখো তরুণকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে রেখেছে প্রাণঘাতী ইয়াবা।

অতি সম্প্রতি ইয়াবার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্রিস্টাল আইস’ বা ‘এলএসডি’। ইয়াবা অ্যামফিটামিনের সঙ্গে আরো কিছু কেমিক্যাল সংমিশ্রণে তৈরি হয়। নতুন এই মাদকের পূর্ণ নাম ‘মিথাইল অ্যামফিটামিন’। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইয়াবা হচ্ছে এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ। ইয়াবায় এমফিটামিন থাকে পাঁচ ভাগ। আর ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের পুরোটাই অ্যামফিটামিনে তৈরি। এ কারণে ইয়াবার চেয়ে ৫০ গুণ শক্তিশালী অ্যামফিটামিন।

ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের তুলনায় এটি মানবদেহের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। ১০০/২০০ গুণ বেশি উত্তেজনা তৈরি করে। মাত্র ১০ থেকে ১২ বার সেবনেই একজন মানুষের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এতে যে কোনো ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মকান্ডসহ আত্মহত্যাও করতে পারে। এর প্রভাবে মানুষের সুস্থ চিন্তা-ভাবনা লোপ পায়। অন্যান্য মাদকের তুলনায় ‘ক্রিস্টাল আইস’র অর্থমূল্য বেশি। উচ্চবিত্তরাই আইসের প্রধান ক্রেতা।
দেশীয় নেশার জগতে নতুন অতিথি ‘এলএসডি’। বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মতো অসুস্থতার চিকিৎসায় বিভিন্ন দেশে ‘এলএসডি’ ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এটির বহুমাত্রিক প্রয়োগের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোচিকিৎসক ও রসায়নবিদরা। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদকবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী ডি-লাইসার্জিক এসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ।

এটি রাই এবং বিভিন্ন ধরনের শস্যের গায়ে জন্মানো ছত্রাকের লাইসার্জিক এসিড থেকে তৈরি করা হয়। এটি স্বচ্ছ, ঘ্রাণহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। এলএসডিকে ‘সাইকাডেলিক’ মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে। কখনও কখনও ‘হ্যালুসিনেট’ বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষ করে থাকে।

১৯৩৮ সালে প্রথম এলএসডি সংশ্লেষণ করা হয়। পরে ১৯৫০ ও ১৯৬০ সালে নানা ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসায় এলএসডি ব্যবহারের জন্য প্রচারণা চালান গবেষকরা। কিন্তু ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এলএসডিসহ সব ধরনের সাইকাডেলিক ড্রাগ নিষিদ্ধ করে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসা কাজে এলএসডি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে এ বিষয়ে গবেষণা স্থবির হয়ে যায়। তবে এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা এবং গবেষণার কাজে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় মানুষকে এলএসডি সেবন করানো হয়। সেটিও সেবন করানো হয় মাদক হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ভাষ্য অনুযায়ী এটি মানুষের মস্তিষ্কেও সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করে। এলএসডি নেয়ার পর সাধারণত মানুষ ‘হ্যালুসিনেট’ করে বা এমন দৃশ্য দেখে যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। যারা অনলাইনে এলএসডি (লাইসার্জিক এসিড ডায়েথিলামাইড) বিক্রি করত।

বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা : চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বলেই বিভিন্ন দেশ থেকে মাদক আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে আইসের ১৪টি চালান ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ৮টি চালান ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। ঢাকায় ধরা পড়ে ৫টি চালান। এর বাইরে পিরোজপুরে একটি চালান ধরা পড়ে। এসব চালানের মধ্যে ৩টি চালান এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। মালয়েশিয়া থেকে আকাশপথে বা কুরিয়ারে এসব চালান আসে বলে জানা গেছে।
কুরিয়ারের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে দেশে এসেছে আরেক ভয়াবহ এক মাদক ডিওবি (ডাইমেথ অক্সি ব্রোমোঅ্যামফেটামাইন)। গত ২৩ নভেম্বর মাকদদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এ তথ্য জানায়। ‘ডিওবি’ কিছুটা এলএসডির মতো দেখতে এই মাদকের চালান আটক করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে এ ধরনের মাদক এই প্রথমবার আটক করা হয়েছে।

আমদানির পথ নির্বিঘ্ন হওয়ার কারণে দেশে মাদকদ্রব্য আরো সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এ কারণে দিনকে দিন বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। ২০১৮ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, দেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর অধিকাংশই ইয়াবা আসক্ত। উপমহাদেশের মাদকাসক্তির ইতিহাসবেত্তা ও গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হকের মতে, এ সংখ্যা ফিলিপাইনের চেয়ে বেশি। ৫ বছর আগে ফিলিপাইনে মাদকাসক্তের সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ। এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ বলে জানান তিনি। ২০১৮ সালে সরকার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। পুলিশের হিসাবে প্রথম ১৭ দিনে ২৭ জন মাদকব্যবসায়ী ও পাচারকারী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। তবে পুরো অভিযানে সারাদেশে নিহতের সংখ্যা ৩ শতাধিক। বিশেষত ইয়াবা বিক্রি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত এরা। অভিযানকালে গ্রেফতার করা হয় ৯ হাজার ২০ জন মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে। তবে খুচরা বিক্রেতা কিংবা সরবরাহকারীদের ধরা হলেও নেপথ্য ‘গডফাদার’রা রয়ে গেছেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। মাদক অপরাধের সঙ্গে ছোট-বড় যারাই সংশ্লিষ্ট তারা এক ধরনের ‘দায়মুক্তি’ ভোগ করছেন আইনি জটিলতা এবং পুরনো স্টাইলে বিচার প্রক্রিয়ার কারণে।

২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৬৪ জেলায় এক লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পরবর্তী ৩ বছরে আরো ৮ হাজার ৫৯৮টি মামলা যুক্ত হয়েছে। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ এতে মাদক মামলার বিচারে জেলায় জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ায় দীর্ঘদিন মাদক মামলার বিচার বন্ধ ছিল। ২০২০ সালে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০২০ করে বিশেষ আদালতে মামলার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। তবে অধ্যাদেশের পর করোনার প্রকোপে বিচার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত পৌনে ২ বছর। এখন অবশ্য আবার বিচার শুরু হয়েছে।

শক্ত আইনে অপপ্রয়োগের দুর্বলতা : ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর দুর্বল প্রয়োগে অনেকটা দায়মুক্তি পাচ্ছেন মাদকসেবী, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, কারো কাছে সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম পরিমাণ হেরোইন, কোকেন এবং কোকা উদ্ভূত মাদকদ্রব্য পাওয়া গেলে তিনি অন্যূন ২ বছর এবং অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন। তবে ২৫ গ্রামের বেশি হলে মৃত্যুদন্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড। প্যাথিডিন, মরফিন ও টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ১০ গ্রাম হলে কমপক্ষে ২ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড আর ১০ গ্রামের বেশি হলে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। অপিয়াম, ক্যানাবিস রেসিন বা অপিয়াম উদ্ভূত (হেরোইন ও মরফিন ব্যতীত) মাদকদ্রব্যের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ২ কেজি হলে ২ বছর থেকে ১০ বছর কারাদন্ড, ২ কেজির বেশি হলে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড, মেথাডনের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ৫০ গ্রাম হলে ২ বছর থেকে ১০ বছর কারাদন্ড। পরিমাণ ৫০ গ্রামের বেশি হলে মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড। গাঁজা বা যেকোনো ভেষজ ক্যানাবিসের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ৫ কেজি হলে অন্যূন ৬ মাস এবং অনূর্ধ্ব ৩ বছর কারাদন্ড। ৫ কেজির বেশি হলে ৩ বছর থেকে ১৫ বছর কারাদন্ড প্রদানের বিধান আছে।

তবে উল্লিখিত কোনো অপরাধের জন্য দন্ড ভোগ করার পর যদি কেউ আবারও এই ধারার উল্লিখিত কোনো অপরাধ করেন, তাহলে ওই অপরাধে তার মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড না হলে, তিনি সর্বোচ্চ যে দন্ড রয়েছে, তার দ্বিগুণ দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আইনের ধারাগুলো অত্যন্ত শক্ত। অথচ অপপ্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে ব্যাপক। ২০২০ সালে সংশোধিত আইনের ধারা ২১-এ বলা হয়েছে, আসামিকে প্রকাশ্য স্থান থেকে আটক বা গ্রেফতার করা যাবে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মধ্যে এই ‘বিশ্বাস’ জন্মে যে জায়গায় মাদকদ্রব্যজনিত অপরাধ ঘটছে বা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। আইনটির ধারা ২৩-এ বলা হয়েছে, ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি এবং গ্রেফতারের বিষয়টি। এখানে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সন্দেহ করেন, তাহলে সন্দেহের বশেই তল্লাশি বা গ্রেফতার করা যাবে।

ধারা ৫৫-এ উল্লেখ রয়েছে, মাদকদ্রব্য অপরাধ সংঘটনে আইনানুগ অনুমানের (প্রিজাম্পশন) কথা। উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তির নিকট অথবা তাহার দখলকৃত বা নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো স্থানে কোনো মাদকদ্রব্য সেবন, অন্য কোনোভাবে মাদকদ্রব্য ব্যবহার বা প্রয়োগ অথবা মাদকদ্রব্য প্রস্তুতে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি অথবা মাদকদ্রব্য প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু বা উপাদান পাওয়া যায়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি, ভিন্নতর প্রমাণ করিতে ব্যর্থ হইলে, এই আইন লঙ্ঘন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’

এসব থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০২০’র প্রধান ভিত্তিই হচ্ছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ‘অনুমান’, ‘বিশ্বাস’ এবং ‘সন্দেহ’। এর ভিত্তিতেই একজন মানুষকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করা সম্ভব। আইনজ্ঞদের মতে, এটি এ আইনের প্রধান দুর্বল দিক। এর ফলে আইনটির বহুল অপপ্রয়োগ হচ্ছে।

ঢাকা বারের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের মতে, আইনটি প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ বেশি হচ্ছে। বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে ব্যক্তি বিশেষকে সামাজিক অপদস্ত করা কিংবা মানুষকে ‘অপরাধী’ হিসেবে সাব্যস্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তা মাদক আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গ্রেফতারের ঘটনায় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনকে ব্যবহার করা হয়েছে।

ফৌজদারি আইনে অভিজ্ঞ এই আইনজীবী বলেন, ইদানিং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তার প্রবণতা। সেটি হচ্ছে, কারও বাসায় অভিযান চালালেই তার বাসা থেকে ক্রিস্টাল আইস কিংবা এলএসডি উদ্ধার হয়েছে- মর্মে দাবি করা। অথচ উচ্চ মূল্যের এই মাদক যত্রতত্র এবং যার তার কাছে থাকার কথা নয়। এমনও দেখা গেছে, যাদের কাছ থেকে মাদক ‘উদ্ধার’ দেখানো হচ্ছে- তাদের এই মাদক কেনার সামর্থও নেই। এখানে দামী মাদকদ্রব্যের ভয়াবহতার চেয়ে অর্থ মূল্যই যেন মুখ্য। এ ছাড়া নিত্য-নতুন মাদকের শনাক্ত এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের প্রযুক্তি আমাদের নেই। অথচ উদ্ধারকৃত বস্তুগুলো আদৌ মাদক কিনা সেটি শনাক্ত হওয়ার আগেই মানুষ দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। মাদক আইনের অপপ্রয়োগের এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানমাত্রই গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির বাসা থেকে আইস, ইয়াবা, এলএসডির মতো মাদক ‘উদ্ধার’ দেখানো হয়েছে। মাদক আইনের অপরাধগুলো আমলযোগ্য। জামিন পাওয়াও কঠিন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৪৪ এবং ৪৫ ধারা দু’টি ছিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন ও বিচারকেন্দ্রিক ধারা। ২০২০-এ সংশোধন করে, ৪৫ নং ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়। ‘ম্যাজিস্ট্রেট আদালত’ এবং ‘ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে’ ‘এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত’ শব্দটি স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের ধারণাটি বাতিল করা হয়। এই আইনের ৫০ নম্বর ধারা আরেকটি দুর্বলতা। যাকে তাকে মাদক মামলায় আটক করে অন্য মামলার বিচারও করা সম্ভব।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন