রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৫ মুহাররম ১৪৪৪

জাতীয় সংবাদ

ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যবস্থা

দুই বিমানবন্দর বরিশাল-সৈয়দপুর

নাছিম-উল-আলম ও নজির হোসেন নজু | প্রকাশের সময় : ৬ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:০৮ এএম

কক্সবাজার বিমানবন্দরে সম্প্রতি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় গরুর সাথে ধাক্কা লাগার ঘটনায় বেরিয়ে আসে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের নিরাপত্তার আসল চিত্র। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য একাধিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে গরু-ছাগলসহ বন্যপ্রাণিও অবাধে চলাফেরা করছে। ফলে তৈরি হচ্ছে নানা নিরাপত্তা ঝুঁকি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই বিমানবন্দর বরিশাল ও সৈয়দপুরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথেষ্ট ঢিলেঢালা।
বরিশাল বিমানবন্দর দেশের অন্যতম প্রাচীন হলেও এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি নিরাপত্তা ঝুঁকি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশে রানওয়ের সীমানা প্রাচীর ভেঙে স্থানীয় জনসাধারণের জন্য চলাচলের রাস্তায় অবাধে প্রবেশ করছে গরু-ছাগলও। আর সীমানা প্রচীরের মধ্যে রানওয়ের পাশের বিশাল চারণভ‚মিতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে গরু ছাগল। তবে গত শনিবার সকাল থেকে সীমানা প্রাচীরের ভাঙা অংশগুলো মেরামত শুরু করেছেন কর্তৃপক্ষ। মোবাইলে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ভাঙা প্রচীরের মেরামত কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রায় দেড়শ’ একর জমি নিয়ে বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন, ফায়ার স্টেশন ও রানওয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে তিন শিফটে মাত্র ৩০ জনের মত আনসার ছাড়াও সিভিল এভিয়েশনের কিছু নিরাপত্তা কর্মী রয়েছে। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে বিশাল এলাকার নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

বর্তমানে প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি ৫ ফ্লাইট পরিচালনা করা হলেও যাত্রীর চাপ কিছুটা বেড়ে গেলে বসার পর্যন্ত জায়গা থাকছে না। ফলে নারী ও শিশু যাত্রীরাও বিড়ম্বনায় পড়ছে। এমনকি মূল টার্মিনালের কনকর্স হলেই এখন ভিআইপিদের জন্য বড় একটি অংশ বরাদ্ধ থাকায় সমস্যা আরো বেড়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বরিশাল বিমানবন্দরের ভ‚মি অধিগ্রহণ শুরু হয় ১৯৬৫-৬৬ সালে। সময়ের প্রয়োজনে রানওয়ে ৬ হাজার ফুটে সম্প্রসারণ ছাড়াও দু প্রান্তে ৫শ’ ফুট করে আরো ১ হাজার ফুট ওভার রান নির্মাণ করা হয়। ফলে ‘এফÑ২৮’ মানের জেট এয়ারক্রাফট পরিচালনও সম্ভব হয়েছে ইতোপূর্বে। এমনকি ২০০৬ সালে ঘূণিঝড় ‘সিডর’ দেশের দক্ষিণ উপক‚লে আঘাত হানার পরে পুরো ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হয় এ বিমানবন্দরের মাধ্যমে।

রানওয়েসহ পুরো বিমানবন্দরটিকে সীমানা প্রাচীরে মুড়ে ফেলা হয়েছে গত কয়েক বছরে। পাশাপাশি রাতের বেলা ফ্লাইট অপারেশন সচল রাখতে রানওয়ে লাইটিংসহ নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুরো এলাকা আলোকিত করা হয়েছে। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। এনিয়ে অনেকেই দায়ী করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কতৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতাকে। তবে এ বিষয়ে বরিশাল বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপক আবদুর রহিম তালুকদারের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, ‘কিছু সমস্যা থাকলেও আমরা চেষ্টা করছি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এখানের সার্বিক বিষয় প্রতিনিয়ত সদর দফতরকেও অবহিত করা হয়’। ‘আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত’ করা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথেষ্ট ঝুঁকিতে। বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিকে উন্নীত করার কাজও চলছে। কিন্তু নানা কারণে এটির রানওয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মনে করছেন খোদ নিরাপত্তাকর্মীরা। তারা জানান, সীমানা প্রাচীরের নিচের মাটি সরে গিয়ে ফাঁকা হয়ে গেছে। দিনের বেলা কুকুর আর রাতে আশপাশের জঙ্গল থেকে শিয়ালসহ বিভিন্ন জীবজন্তু রানওয়েতে উঠে পড়ে। অনেকে ভেতরে ঢুকে ঘাসও কাটেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। যে কোনো সময় কক্সবাজারের মতো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সৈয়দপুর বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। সাত বছর না যেতেই প্রাচীরের ১০০ ফুট ধসে পড়ে। বিভিন্ন অংশে ফাটলও দেখা দেয়। পরবর্তীতে সংস্কার করা হলেও সীমানা প্রাচীরের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমপাশে নিচে এখনো ফাঁকা রয়ে গেছে। এ ছাড়া রয়েছে নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্কট। বিমানবন্দরটির নিরাপত্তায় বর্তমানে ১২৪ জন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত আছেন। তাদের মধ্যে আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) ৫৮ জন, আনসার ৪৭ জন ও সিভিল অ্যাভিয়েশন ১৯ জন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমানা প্রাচীরের বেশ কিছু জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া নেই। ফলে স্থানীয়রা সহজেই মই বেয়ে বা খড়ের গাদার ওপর দিয়ে দেয়াল টপকে বিমানবন্দরে ঢুকতে পারে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-৪-এর অধিনায়ক জয়নুল আবেদীনের পক্ষ থেকে এ বিমানবন্দরের বিষয়ে গত ২৬ অক্টোবর একটি চিঠি দেয়া হয়। পুলিশ সদর দফতর ও সিভিল অ্যাভিয়েশন অব বাংলাদেশে (সিএএবি) পাঠানো ওই চিঠিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

জয়নুল আবেদীন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীরের নিচের মাটি সরে যাওয়া এবং ড্রেন উন্মুক্ত থাকার কারণে প্রতিদিন বাইরের লোকজন ভেতরে প্রবেশ করে ঘাস কাটে। যে কোনো দুষ্কৃতকারী রানওয়েতে ঢুকে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই সীমানা প্রাচীর সংস্কার করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দর এলাকার চারদিকে ও রানওয়েতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। সীমানা প্রাচীরের নিচে ফাঁকা ও চারপাশে জঙ্গল থাকায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় শিয়াল বা যে কোনো বন্যপ্রাণী দ্বারা উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ‘সেন্ট্রি পোস্ট’ ও ‘ওয়াচ টাওয়ার’ নির্মাণ করতে হবে। উড়োজাহাজ উড্ডয়ন-অবতরণের সময় যাত্রীদের লাগেজসহ মালামাল আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাড়াতে হবে পার্কিং এলাকায় টহল ও ভিআইপি গেটসহ প্রবেশমুখের নিরাপত্তা। সিভিল অ্যাভিয়েশনের সিসি ক্যামেরা ভাগাভাগিসহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা ও সমন্বয়ও জরুরি।

নিরাপত্তা প্রাচীরের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরির হওয়ার কথা স্বীকার করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সুপ্লব কুমার ঘোষ ইনকিলাবকে বলেন, স্থানীয়রা এটা করেছে। তারা ভোরে সুড়ঙ্গ দিয়ে ঘাস কাটার জন্য ভেতরে ঢোকে। নিরাপত্তার জন্য এখানে জনবল কম। আরও ৩৬ জন আনসার সদস্যের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। সীমানা প্রাচীরের ওপর কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে গেছে। ফলে সহজেই মই বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন স্থানীয়রা। শিগগিরই প্রাচীরের সুড়ঙ্গ বন্ধসহ নিরাপত্তা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন