শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পাবে

নতুন বছরে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএসইসি চেয়ারম্যানের প্রত্যাশা

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ৩ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০০ এএম

নতুন বছর পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। ইনকিলাবের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ। দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি। নতুন বছরেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা আগের চেয়েও অগ্রাধিকার পাবে। তবে ২০২২ সালেও পুঁজিবাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে নতুন বছরে শেয়ারবাজারকে আইটি খাতে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইনকিলাবের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোড শো’র আয়োজন করা হচ্ছে। এতে প্রবাসীসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ডিং ইমেজ’ বদলে যেতে শুরু করেছে। নেতিবাচক ধারণা পাল্টে বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। যা আমাদের দেশে বিনিয়োগের সড়ককে অনেক প্রশস্ত করছে। তিনি বলেন, দেশে যতো বিনিয়োগ আসবে পুঁজিবাজার ততো লাভবান হবে। আমাদের দরকার পুঁজিবাজারকে উজ্জীবিত করার জন্য আরো বিনিয়োগ আনা।

প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, নতুন বছরে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ ও বাধা রয়েছে। তবে, প্রধানমন্ত্রী সবসময় আমাদের সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে বাজারকে এই পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আমরা শেয়ারবাজারের উন্নয়নে যেসব কর্মকান্ড করছি, সেসব বিষয়ে তার সম্পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। এই জন্য অনেক বিষয় আমরা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি। আর পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার প্রদানে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভবিষ্যতে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা টানেলের মতো মেগাপ্রকল্প পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের বড় উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে তৈরি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে আইসিটি পণ্য সেবাকে ২০২২ সালের জন্য বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে শেয়ারবাজারকে আইটি খাতে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুঁজিবাজার নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, শিল্পায়ন, অবকাঠামোসহ সব উন্নয়নে প্রধান ভ‚মিকায় থাকবে পুঁজিবাজার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড খুব জনপ্রিয়। অবশ্য এখন গ্রিনবন্ড, বু-বন্ড এগুলোও চলে এসেছে। ব্যাংকের মূলধন শক্ত করতে রয়েছে পারপেচুয়াল ও সাব অর্ডিনেটেড বন্ড। এছাড়া ইক্যুইটির মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা স¤প্রসারণ করতে সাহায্য করা হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে আমরা শুধু ইক্যুইটি বেস নিয়ে কাজ করেছিলাম। কিন্তু সেখানেও আমরা বড় ধরনের শিল্পায়নে সহায়তা করতে পারিনি। আমরা এখন ইক্যুইটির মাধ্যমে চেষ্টা করছি ভালো ভালো কোম্পানিকে সহায়তা করার। পাশাপশি ব্যাংকগুলোর মূলধন বিভিন্ন বন্ড দিয়ে শক্তিশালী করা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বিভিন্ন বন্ড নিয়ে আসা। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য ডেরিভেটিভের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সাহায্য করা। এজন্য আমরা কমিউনিটি এক্সচেঞ্জ ও ডেরিভেটিভ মার্কেটগুলোর হিউম্যান ক্যাপিটাল উন্নয়ন করছি।

নতুন বছরে শেয়ারবাজারে বন্ডের বিকাশ কেমন হতে পারে জানতে চাইলে প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, স¤প্রতি সুকুক বন্ড সফলভাবে চালু করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান কমিশন নেয়ার পরপরই বলেছিলাম, সুকুক বন্ড চালু করব। সফলভাবে চালু করতে সক্ষমও হয়েছি। ৪ হাজার কোটি সুকক বন্ডের বিপরীতে ১৫ হাজার কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে, যা প্রায় চারগুণ। বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ইনফ্রাস্ট্রাকচার পরিবর্তন করে দেয়া সম্ভব হবে শুধু সুকুক বন্ড দিয়ে।

মিউচুয়াল ফান্ড বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে বলা হয় বাজারকে স্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। ভারতে যেমন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ রয়েছে, বাংলাদেশেও ঠিক সেভাবেই মিউচ্যুয়াল ফান্ডের প্রতি সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যার ফলে তৈরি হয়েছে গোল্ডেন জুবিলি ফান্ড। এই ফান্ডকে পরিচালনার জন্য এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা কখনোই কমবে না। এটা দিনে দিনে বাড়বে। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত এই ফান্ডে বিনিয়োগ করে ভালো রিটার্ন নেয়া। এই ফান্ড থেকে বিনিয়োগকারীরা ডাবল গেইন পাবে বলে জানান তিনি। এই ফান্ড অনেক ভালো করবে। কারণ এই ফান্ডের পরিচালনায় যারা রয়েছেন, তারা সকলে খুবই দক্ষ ও অভিজ্ঞ।

ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড প্রসঙ্গে প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমেই অভিযোগ আসে বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ড পায় না। তাহলে ডিভিডেন্ড কোথায় যায়, এটা জানতে সব কোম্পানিকে চিঠি দেয়া হয়। কোম্পানিগুলো বলে ডিভিডেন্ড নেয়ার জন্য লোক ও সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায় না। কিন্তু জানা যায় ডিভিডেন্ডগুলো কোম্পানিগুলোর কাছে রয়ে গেছে। যার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানিগুলোর কাছে পড়ে থাকা এই ডিভিডেন্ডের টাকা দিয়ে আইসিবি’র কাস্টোডি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ফান্ড গঠন করা হয়। যার নাম ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড। এখন পর্যন্ত এই ফান্ডে ৫০০ কোটি টাকার মতো জমা পড়েছে। এই টাকাটা সরকারের একটি সংস্থার কাছে রেখে যদি ব্যবহার করা যায়, তাহলে পুঁজিবাজারের তারল্য সঙ্কট কিছুটা দূর হবে।

শেয়ারবাজারে উৎপাদন বন্ধ বা দুর্বল কোম্পানিগুলোকে সচল করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছি কি-না জানতে চাইলে বিএসইসি’র চেয়ারম্যান বলেন, রিং সাইন টেক্সটাইল উৎপাদনে চলে গেছে। সেখানে ৩ শিফটে এক-দেড় হাজার শ্রমিক কাজ শুরু করেছে। এমারেল্ড অয়েলে এক বিদেশি বিনিয়োগকারী এগিয়ে এসেছেন। শিগগিরই কাজ শুরু হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফাস ফাইন্যান্স ও ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডসের পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, কিছু কিছু জায়গায় কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রি-ব্রান্ডিং করতে হবে, সেগুলোও শুরু হচ্ছে। সব মিলে সেসব দুর্বল কোম্পানিকে আমরা বিভিন্ন সাহায্য করা চেষ্টা করছি, যাতে বিনিয়োগকারীদের কোনো ক্ষতি না হয়। বহুজাতিক ও সরকারি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু কোম্পানি আসবে। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। আমরা তাদেরকে বোঝাচ্ছি।

উল্লেখ্য, প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ২০২০ সালের ১৭ মে করোনার মধ্যে বিএসইসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের আস্থা সঙ্কটসহ করোনার আঘাত সামলে শেয়ার বাজারকে ইতিবাচক রাখা বিএসইসি’র নতুন কমিশনের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জিরো টলারেন্স নীতিতে শেয়ারবাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। দিন যত যাচ্ছে দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদান তত বাড়ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও এখন তালিকাভুক্ত হচ্ছে এখানে। দেশের সাধারণ মানুষও উন্নয়নের মালিকানায় অংশীদার হচ্ছেন। ২০২১ সালে ডিএসইএক্স অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ে। গত ১০ অক্টোবর সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ হাজার ৩৬৭ পয়েন্টে। একই চিত্র ছিল বাজার মূলধন এবং লেনদেনেও। গত ৯ সেপ্টেম্বর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অতীতে কোনো সময় বাজার মূলধন এই পরিমাণ বাড়েনি। একই সঙ্গে লেনদেনে রেকর্ড গড়ে পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন