বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯, ১২ মুহাররম ১৪৪৪

সম্পাদকীয়

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রতি পুলিশের এ আচরণ কেন?

| প্রকাশের সময় : ১৫ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০৪ এএম

বিভিন্ন সময় গুম হওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ, চাপ প্রয়োগ, ক্ষেত্রবিশেষে সাদা কাগজে সই নেয়া কিংবা সই দিতে চাপ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের মঞ্চ ‘মায়ের ডাক’ ও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বিবৃতি দিয়েছে। মায়ের ডাক-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে বারবার গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলছে এবং রাতে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গুমের শিকার ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন এবং পরিবার তথ্য গোপন করেছেÑ এমন বাক্য লেখা কাগজে সই দেয়ার জন্য পুলিশ স্বজনদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন আচরণ সম্পূর্ণ বেআইনী। নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা জোরদার করার পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের তৎপরতা অগ্রহণযোগ্য। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হয়ে পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, তিনি এ সম্পর্কে অবহিত নন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে জেরা বা সাদা কাগজে সই নেয়ার মতো ঘটনা ঘটার কথা নয়। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের বাসায় গিয়ে তাদের স্বজনদের সঙ্গে বর্ণিত আচরণ পুলিশ কীভাবে করছে? কে থানা-পুলিশকে ওই ধরনের কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন? কেনই বা এটা করা হচ্ছে? প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পাওয়া একান্তভাবেই জরুরি।

এমন একটা সময় পুলিশের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে, যখন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র এলিট ফোর্স র‌্যাব এবং র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এটা র‌্যাবের শুধু নয়, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা কর্তৃপক্ষের ওপরও একটা বড় ধরনের ধাক্কা এবং তাদের ভাবমর্যাদার মারাত্মক ক্ষতি। পর্যবেক্ষকদের অনেকের আশঙ্কা, এ ধরনের বা এর চেয়ে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা সামনে আরো আসতে পারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বিজিএমইএ-সহ বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এর নানামুখী বিস্তারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। আশঙ্কা প্রতিরোধে যেখানে জোর তৎপরতা চালানো আবশ্যক, সেখানে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের জেরা, থানায় তলব ইত্যাদি হয়রানিমূলক তৎপরতা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে আশঙ্কা বাড়তে পারে; কমার প্রশ্ন ওঠে না। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এ পর্যন্ত তথাকথিত বন্ধুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে কেউ মারা যায়নি, এটা অবশ্যই সন্তোষজনক একটা দিক। এমতাবস্থায়, পুলিশের আলোচ্য তৎপরতা কেন চলছে সেটা বোধগম্য নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, মত প্রকাশের অধিকার সংকোচন, বিভিন্ন নির্যাতনমূলক আইনের প্রয়োগ ইত্যাদির জন্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনেকদিন ধরেই সমালোচনা করে আসছে। তাদের রিপোর্ট বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে নিয়মিতই যাচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় যে এসব রিপোর্ট অনেকটাই প্রভাবক ভূমিকা পালন করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। এ যাবৎ কত মানুষ গুম হয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত তথ্যের একটা বড় উৎস থানা। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগ রয়েছে, গুম বা তুলে নেয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে থানা-পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ নিতে চায় না। ফলে সব তথ্য লিপিবদ্ধ হয় না। গুমের শিকার বিশেষভাবে হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। জাতিসংঘের গুম বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বন্দুকযুদ্ধের ক্ষেত্রে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব, গত ১৭ বছরে ৩২৪৬ জন নিহত হয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যাপারে চরম উপেক্ষা দেখানো হয়েছে ও হচ্ছে।

প্রভাবশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ মানবাধিকারের লংঘন বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে। তাতে কর্ণপাত খুব কমই করা হয়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে অবজ্ঞা-অবহেলা করা হয়েছে। অভিযোগ অস্বীকারের প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। এর ফলাফল ভালো হয়নি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যার প্রমাণ। কোনো কিছুতেই আমাদের হুঁশ আসেনি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের হয়রানি করার অভিযোগ তার সাক্ষ্য দেয়। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার ‘বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২২’-এ অভিযোগ অস্বীকার করার প্রবণতার উল্লেখ করে বলেছে, ক্ষমতাসীন সরকার নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও গুমের বিষয়ে ২০২১ সালে জাতিসংঘ, দাতাসংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থার উত্থাপিত উদ্বেগ খারিজ করে দিয়েছে। অতঃপর মন্তব্য করেছে, সরকার ২০২১ সালে এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে, এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এ মন্তব্য মোটেই বাংলাদেশের পক্ষে যায় না। বলা বাহুল্য, কোনো অভিযোগই ‘পত্রপাঠ’ অস্বীকার করা উচিৎ নয়। হতে পারে, কোনো অভিযোগ বানোয়াট বা অবাস্তব। কিন্তু সেটা তৎক্ষণাৎ না বলে তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির মাধ্যমে তার অসত্যতা প্রমাণ করে দেয়া যেতে পারে। এটাই প্রকৃষ্ট পথ। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করলেই তা সংঘটিত হয়নি বলে কেউ মানতে চাইবে না। তার চেয়ে প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করতে হবে, বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। এইসঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করতে হবে। এ পন্থা অনুসরণ করলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যেমন বন্ধ হবে, তেমনি এ নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ করারও কিছু থাকবে না। পরিশেষে, আমরা আশা করবো, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রতি পুলিশ যে আচরণ করছে তা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখবে, দায়ীদের শনাক্ত করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন