বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

সুস্থ মা মানেই সুস্থ জাতি

কাজী শাম্মীনাজ আলম | প্রকাশের সময় : ১৬ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০৬ এএম

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি জাতির স্বাস্থ্যমানের ওপর নির্ভর করে তার উন্নয়নের গতি প্রকৃতি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর স্বাস্থ্যমানকে পিছিয়ে রেখে সার্বিক স্বাস্থ্যসূচকে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করা সম্ভব নয়। সরকারও এ খাতটিকে গুরুত্ব দিয়ে নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নের সকল কার্যক্রমকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্যহারে কমে এসেছে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯০ সালে দেশে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৫৭৪ জন, যা এখন ১৬৫ তে নেমে এসেছে । পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ছিলো হাজারে ৯০.৬ জন, এখন তা ২১। এ অগ্রগতির স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জিত হয়েছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক সম্মাননা। স্বাস্থ্যখাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের নারী ও শিশুদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে অসাধারণ সাফল্যের জন্য এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০ অর্জন করেছেন। এছাড়াও নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে ইউনেস্কো’র ‘ট্রি অভ পিস’ পুরস্কার অর্জন করেছেন।

তারপরও নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে যে বাধাগুলো নজরে আসে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের মাতৃত্বকালীন নিরাপত্তার অভাব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে ৬৩ জন এবং শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ১২ তে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরমধ্যে ‘দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি’ ও ‘কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল’ কর্মসূচি অন্যতম। সরকার মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শিশুর সঠিক পুষ্টি নিয়ে বেড়ে ওঠাকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দুটি’র আওতায় গত একযুগ ধরে প্রান্তিক নারীদেরও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকেই শিশুর বিকাশ শুরু হয়। তাই মায়ের যত্ন শুরু হওয়া উচিত তখন থেকে বা তার আগে থেকেই। এ সময় দরকার তার বাড়তি যত্ন। খাদ্য তালিকায় কিছু বিশেষ খাবার থাকলে গর্ভস্থ শিশুটির মস্তিষ্কের বিকাশ সঠিকভাবে হয়। গর্ভবতী মায়ের পুষ্টির ঘাটতির ফলে জন্ম নিতে পারে অপরিণত শিশু। সরকারের জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রচারকার্যক্রম ও তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমান যুগে প্রায় সব পরিবারেই মায়েদের সেবার বিষয়ে সচেতন। কিন্তু শহরের তুলনায় গ্রামে শিক্ষার হার কম, পাশাপাশি আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও অসচেতনতার কারণে প্রান্তিক অনেক নারীই গর্ভকালীন সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার জন্য ২০০৭-০৮ অর্থবছর সবচেয়ে ‘দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি’ গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচি প্রান্তিক নারীদের গর্ভধারণকালীন ও প্রসবপরবর্তী সময়ে সেবাপ্রদানের জন্য বর্তমান সরকারের একটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচির আওতায় একজন মা প্রথম অথবা দ্বিতীয় যেকোনো এক সন্তানের জন্য ৩৬ মাস ৮০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছে। এছাড়াও ভাতাভোগী মহিলারা শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানোসহ উন্নত পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, শিশুর মনোসামাজিক বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য নির্বাচিত এনজিও ও সিবিও’র মাধ্যমে বছরে পাঁচদিন জীবন দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করার জন্য ভাতাভোগীদের যাতায়াত ভাতাও দেওয়া হয়। সদর কার্যালয় থেকে অর্থ বছরের শুরুতে বরাদ্দ প্রাপ্তির ভিত্তিতে ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে ভাতাভোগী নির্বাচন করা হয় এবং তিন মাস অন্তর অন্তর ভাতা প্রদান করা হয়। বর্তমানে ৪২৬টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চলমান। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতাপ্রদান কর্মসূচির আওতায় ৪৫ হাজার ভাতাভোগীর মধ্যে ৩০০ টাকা হারে ১৬ কোটি ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাসিক ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮০০ টাকায় উন্নীত হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই কর্মসূচিতে ৭৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের বরাদ্দ হতে চলতি অর্থবছরে গড় বৃদ্ধির হার ৩৪ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে ভাতাগ্রহীতার সংখ্যা ৭ লক্ষ ৭০ হাজার।

শহরাঞ্চলে নিম্নআয়ের গর্ভবতী ও দুগ্ধদায়ী মা’দের কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচির অধীনে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এ কর্মসূচিতেও শিশুর সঠিক পরিচর্যায় মা›দের ভূমিকা, শিশুস্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টিমান ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর পোশাক কারখানাসহ দেশের সকল সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ ছিলো ৩০ কোটি টাকা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা ছিলো ৬৭ হাজার ৫০০ জন। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমান ২৭৪ কোটি টাকা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লক্ষ ৭৫ হাজার। একজন মা প্রতিমাসে ৮০০ টাকা হারে একাধারে তিনবছর ভাতা ও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ সুবিধা পাবে।

প্রথম অথবা দ্বিতীয় যেকোনো একজন সন্তানের জন্য ভাতাপ্রাপ্তি এবং শহর ও গ্রাম এলাকায় একই ধরণের দুটি কর্মসূচি থাকায় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানের উদেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি ও কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল কর্মসূচিকে একীভূত করে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ চালু করা হয়, যা পূর্বতন কর্মসূচি দুটির উন্নত সংস্করণ। বর্তমানে ৮টি বিভাগের ৭টি উপজেলা ও ৬টি বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র গার্মেন্টস কারখানায় এটি চালু আছে। মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে প্রথম ও দ্বিতীয় (দুইটি) সন্তানের জন্য ভাতা পেয়ে থাকে। এ কর্মসূচিতে গর্ভবতী মা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার তথ্য আপার মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে যেয়ে অথবা বাড়িতে বসে সেলফ এনরোলমেন্ট করতে পারে। কর্মসূচির আওতায় ৩৬ মাস ৮০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছে ভাতাভোগীরা। প্রতিমাসে ভাতাভোগীরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক উঠান বৈঠকে অংশগ্রহণ করছে। সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে ০ থেকে ৪ বছরের মোট শিশুর অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশকে এই কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার আওতায় আসবে সম্ভাব্য ৬৫ লক্ষ শিশু।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছাড়াও সরকার গত দশ বছরে ১৬ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে গ্রামীণ, দুস্থ ও অসহায় নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। জেলা পর্যায়ে নারীবান্ধব হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। সারাদেশে ১৩ হাজার মাতৃস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য, সেবা ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। শিশুর ‘সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশন’ প্রতিরোধের জন্য বিশেষ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। সারাদেশে এখন ২০০ ‘সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশন’ ইউনিট কাজ করছে। দেশে টিকাদান কর্মসূচির পরিসর বাড়িয়ে ১১টি প্রতিষেধক দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি জাতিসংঘ কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বৃদ্ধি, গর্ভকালীন জটিলতার ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ডিমান্ড সাইড ফাইন্যান্সিং মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম’ করেছে। এই স্কিম থেকে সন্তানসম্ভবা নারীরা গর্ভকালীন ৩ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, প্রসব পরবর্তী একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারছে এবং এর জন্য যাতায়াত ভাতা পাচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২ লক্ষ নারী এই স্কিম থেকে সেবা ও আর্থিক সহায়তা নিয়েছে।

একথা অনস্বীকার্য যে, সুস্থ মা মানেই সুস্থ জাতি। আর সুস্থ জাতির নিরবচ্ছিন্ন পথ চলা নির্ভর করে একটি সুস্থ, সবল ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর প্রজন্মের ওপর। আজকের শিশুরা আগামীর দিন বদলের কারিগর। সুস্থ আর শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ একজন নারী পারে একটি শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যপূর্ণ সন্তান জন্ম দিতে।
লেখক: তথ্য অফিসার, পিআইডি, ঢাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন