মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশন গঠন আইন : সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে করা উচিত

| প্রকাশের সময় : ১৯ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০২ এএম

সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে একটি আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও তা করা হয়নি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, বহুদিন ধরে সচেতন মহল ও রাজনৈতিক দলগুলো এ আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। এতদিন সরকার নিজ থেকেই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। গত দুইটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রেসিডেন্টের সাথে সংলাপের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করে। রকিব কমিশন ও বর্তমান হুদা কমিশন এ প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে। এই দুই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী ১৪ ফেব্রæয়ারি শেষ হচ্ছে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে গত ২০ ডিসেম্বর থেকে প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেন। বৃহৎ রাজনৈতিক বিরোধীদল বিএনপিসহ বাম ঘরানা ও অন্যান্য বিরোধীদল অংশগ্রহণ করেনি। গত ১৭ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে সংলাপের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের সংলাপ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এদিনই মন্ত্রীসভায় ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২২’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। এটি সংসদে পাশ হওয়ার পর চূড়ান্ত আইনে পরিনত হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন এ আইনে হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে একটি জাতীয় দৈনিককে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এ আইনেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে ৬ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ) গঠন করা হবে। এ কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। অন্য সদস্য হিসেবে থাকবেন, প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, পিএসসি চেয়ারম্যান মনোনীত একজন পিএসসি সদস্য, অডিটর অ্যান্ড কম্পটোলার জেনারেল মনোনীত একজন এবং প্রেসিডেন্ট মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিক। তাদের নিয়ে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন কমিশন গঠনের সুপারিশ করবে। আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশরনাদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৫০ বছর এবং সরকারি-আধাসরকারি, বেসরকারি বা বিচার বিভাগে কমপক্ষে ২০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সার্চ কমিটিকেই আইনের আওতায় এনে আইনে পরিণত করা হচ্ছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে সার্চ কমিটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আস্থার সংকট ও অভিযোগ রয়েছে, এ আইনের মাধ্যমে তা নিরসন করা যাবে না। বিতর্ক ও প্রশ্ন থেকেই যাবে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিৎ। এতে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। নতুন আইন প্রণয়ন নিয়ে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের বিশ্লেষণ প্রনিধানযোগ্য। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘সার্চ কমিটিতে পদাধিকারবলে পাঁচজনকে রাখার কথা বলা হয়েছে। এই পাঁচজনই সরকারের নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি। তাদের দিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করলে সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটবে। এর বাইরে প্রেসিডেন্ট আরও দু’জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করবেন বলে বলা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাহী বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী দু’জনের নামও প্রেসিডেন্টকে গ্রহণ করতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ প্রেসিডেন্টকে সংবিধান দেয়নি। প্রেসিডেন্ট নিজের ক্ষমতাবলে এই নাম দিতে পারেন না। তিনি বলেছেন, সব মিলিয়ে পুরো সার্চ কমিটি সরকারের পছন্দে গঠিত হচ্ছে। এই সার্চ কমিটি করে যা পাওয়া যাবে, তা সহজেই অনুমেয়।’ আইনজ্ঞরা বলছেন, সার্চ কমিটি কাদের সার্চ করছে, প্রেসিডেন্টের কাছে তারা কাদের সুপারিশ করছে, কেউই কিছু জানতে পারবে না। সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত তালিকা প্রেসিডেন্টের কাছে দেয়ার পাশাপাশি জনসমক্ষে প্রকাশ না করলে আইনের পুরো উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। এমন অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন গঠন করলে প্রথম দিন থেকেই আস্থার সংকট দেখা দেবে। ফলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এমন ভরসা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সুসাশনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আইনমন্ত্রী কয়েক মাস আগেও বলেছেন, নতুন আইন প্রণয়ন করার সময় নেই। এখন হঠাৎ ও তড়িঘড়ি করে আইনটি মন্ত্রীসভায় নীতিগত অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি অবশ্যই প্রশ্নের উদ্রেক করে। তিনি বলেছেন, বর্তমান কমিশন গঠন করা হয়েছিল সার্চ কমিটির মাধ্যমে। এর ফল যা হয়েছে, সবাই তা দেখেছে। আগের মতো আবারও সার্চ কমিটি গঠন করা হলে একই ফল আসবে। এদিকে, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের অনুমোদন প্রসঙ্গে বৃহৎ রাজনৈতিক বিরোধীদল বিএনপি প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, এটি সরকারের নতুন ষড়যন্ত্র। এতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটবে না। ইতিপূর্বে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে আসাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্ট যে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন, তাকে আইনী ভিত্তি দিতে সরকার এ আইন করতে যাচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার যে নতুন ষড়যন্ত্র করছে, এটি তারই অংশ। বাম নেতারা নির্বাচন কমিশন গঠনের অনুমোদিত আইনকে ‘সরকারের তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এতে সংকট আরও বাড়বে।

সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে আইনটি এমনভাবে করা উচিৎ, যাতে সকল রাজনৈতিক দলের মতামতের প্রতিফলন ঘটে। এমন আইন করা বাঞ্চনীয় নয়, যা নিয়ে বিতর্ক উঠে এবং গ্রহণযোগ্যতা হারায়। বর্তমান অসাংবিধানিক সার্চ কমিটি বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজ ও আইনজ্ঞদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এই সার্চ কমিটিই যদি আইনের মাধ্যমে সাংবিধানিক রূপ লাভ করে, তবে তা স্থায়ী বিতর্কে পরিণত হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আকাক্সক্ষা ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা থেকে যাবে। আবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত বিগত দুইটি নির্বাচন কমিশনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য নির্বাচন কমিশনাররা তাদের উপর অর্পিত সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার এ ধারাবাহিকতা কাম্য হতে পারে না। আমরা মনে করি, তড়িঘড়ি করে নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন করা উচিৎ হবে না, যা প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কের সৃষ্টি করবে। এখনও যেহেতু সময় আছে, সরকারের উচিৎ হবে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সাথে বসে সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে আইনটি প্রণয়ন করা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
মোহাম্মদ দলিলুর রহমান ১৯ জানুয়ারি, ২০২২, ৬:৫১ এএম says : 0
জনগণ বিরোধী নির্বাচন কমিশন আইন মানতে কি জনগণ ঘরে বসে থাকবেন না কি।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন