ঢাকা, রোববার, ০৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮, ২৬ রমজান ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

হিলারিকে জয়ী করতে মুসলিম আমেরিকানদের ঐক্য

ট্রাম্পের মতো জাতি ও ধর্ম বিদ্বেষীদের ধরাশায়ী করতে সবাই একমত

প্রকাশের সময় : ১ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

হুমা আবেদিনে বিপদ মিসেস ক্লিন্টনের : জরিপে পিছিয়ে ট্রাম্প
ইনকিলাব ডেস্ক : প্রেসিডেন্ট পদে হিলারি ক্লিনটনকে বিজয়ী করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের মুসলিম নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হিলারির বিকল্প নেই বলে তারা সেøাগান দিলেন। বিশ্ব শান্তির স্বার্থেই হিলারিকে প্রেসিডেন্ট চাই। গত রোববার দুপুরে নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ডাইভার্সিটি প্লাজায় ‘আমেরিকান মুসলিম পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’ তথা ‘অ্যামপেক’র ব্যানারে হিলারি ক্লিন্টনের সমর্থনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে নারীসহ নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের ঘটনাটি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। এ সমাবেশে বক্তব্যকালে নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের প্রসপেক্ট পার্ক সিটির মেয়র মোহাম্মদ তাহের খায়রুল্লাহ বলেন, মুসলিম আমেরিকানরা আজ ঐক্যবদ্ধ। ৩৩ লাখ ভোট রয়েছে আমাদের। এই ভোট ব্যাংক কাজে লাগিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত জাতি ও ধর্ম বিদ্বেষীদের ধরাশায়ী করতে হবে।
ডেমোক্রেটিক পার্টিতে এশিয়ান-আমেরিকান ককাসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার মোহাম্মদ আলম বলেন, আসন্ন নির্বাচন মুসলিম-আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ হবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নেই সকলকে ভোট দিতে হবে হিলারিকে। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাহী সংস্থার প্রতিনিধি তালাত খান বলেন, ট্রাম্প শুধু মুসলমানদেরই শত্রু নন, তিনি হিসপ্যানিক, আফ্রিকান এবং ইমিগ্র্যান্টদের শত্রু। নারীর প্রতিও তার বিদ্বেষ রয়েছে। তাই আসন্ন নির্বাচনে হিলারিকে বিজয়ী করে ট্রাম্পকে সমুচিত জবাব দিতে হবে। ফ্লোরিডার আমেরিকান মুসলিম ডেমোক্রেটিক ককাসের প্রেসিডেন্ট গাজালা সালাম বলেন, এখন সময় হচ্ছে নিজেদের ভোট ব্যাংককে সংহত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অংশ হবার। ব্যালট যুদ্ধে মুসলিম-আমেরিকানদের অস্তিত্বের জানান দিতে হবে। আইওয়া অঙ্গরাজ্য পার্লামেন্টের সদস্য আব্দুল সামাদ বলেন, আমরাও আমেরিকান এবং আমাদেরও ভোটিং পাওয়ার আছে, সেটি ট্রাম্পের মত উদ্ভট মস্তিষ্কের লোকজনকে জানিয়ে দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতি- গোষ্ঠির মানুষের নিরাপদ আস্থানা- এ সত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে হিলারিকে বিশাল বিজয় দিতে হবে। নেতৃবৃন্দের মধ্যে আরও ছিলেন মাফ মিসবাহ, নার্গিস আহমেদ, জাকারিয়া মাসুদ জিকো, রফিকুল ইসলাম ডালিম, মাজেদা উদ্দিন, আনিস আহমেদ, সোলায়মান আলী প্রমুখ। সকলের হাতে ছিল হিলারিকে ভোটদানের পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড।
মাত্র ৯ শতাংশ ভোট পাবেন ট্রাম্প!
আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে হয়েছে নানা জরিপ। জরিপের ফলাফলে কখনো এগিয়ে ছিলেন হিলারি, আবার কখনো বা ডোনাল্ড। তাই বলা যাচ্ছে না, কে হচ্ছেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে সম্প্রতি হওয়া জরিপগুলোর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলা হচ্ছে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে পারেন হিলারি ক্লিনটন। ট্রাম্পকেও ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না।
জরিপের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এমনটিই জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। নিউইয়র্ক টাইমসের ‘আপশট ইলেকশন মডেল’ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা হিলারির ৯১ শতাংশ এবং ট্রাম্পের ৯ শতাংশ।
অবশ্য মডেলের ইলেকটোরাল ভোটের হিসাব অনুযায়ী লড়াইয়ে হয়তো আরও কিছুটা এগিয়ে থাকবেন ট্রাম্প, তবে তিনি যে জিততে পারবেন না, তা নিশ্চিত।
মডেল মতে, ৫৬টি অঙ্গরাজ্যের মোট ‘ইলেকটোরাল ভোট’ ৫৩৮টি। এই ইলেকটোরাল ভোটের হিসাবে প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলো হলো- ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫ ভোট), নিউ ইয়র্ক (২৯ ভোট), মেরিল্যান্ড (১০ ভোট), ইলিনয় (২০ ভোট), নিউ জার্সি (১৪ ভোট), ওয়াশিংটন (১২ ভোট), ম্যাসাচুসেটস (১১ ভোট), ভার্জিনিয়া (১৩ ভোট), মিনেসোটা (১০ ভোট), মিশিগান (১৬ ভোট), উইসকনসিন (১০ ভোট), পেনসেলভানিয়া (২০ ভোট), নর্থ ক্যারোলিনা (১৫ ভোট), ফ্লোরিডা (২৯ ভোট), ওহাইও (১৮ ভোট), আরিজোনা (১১ ভোট), জর্জিয়া (১৬ ভোট), টেক্সাস (৩৮ ভোট), মিসৌরি (১০ ভোট), ইন্ডিয়ানা (১১ ভোট) ও টেনেসি (১১ ভোট)। এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে হিলারি পেতে পারেন ২৭২টি ‘ইলেকটোরাল ভোট’ এবং ট্রাম্প পেতে পারেন ১৪৮টি ‘ইলেকটোরাল ভোট’। তবে, দল অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্যের বাইরে তাদের মূল যুদ্ধ হবে মিশ্র ঘরানার ১১ অঙ্গরাজ্যে। সেখানে ‘ইলেকটোরাল ভোট’ রয়েছে ১১৮।
এই ১১টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে রয়েছে নর্থ ক্যালোরিনা, ফ্লোরিডা, নেভাদা, নেবারাস্কা, লওয়া, ওহাইও, আরিজোনা, মাইন, উতাহ, জর্জিয়া এবং সাউথ ক্যালোরিনা। আর এইসব অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে নর্থ ক্যালোরিনা, ফ্লোরিডা, ওহাইও, আরিজোনা, জর্জিয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ। জরিপ বলছে, সবগুলোতেই জয়ের পাল্লা ভারি হিলারির।
হুমাকে নিয়ে সঙ্কটে হিলারি!
সকল জরিপেই এগিয়ে থাকলেও ভোটের দিন ঘনিয়ে আসতেই সবচেয় ঘনিষ্ঠ, সবচেয়ে কাছের আর সবচেয়ে বিশ্বস্ত হুমা আবেদিনকে ঘিরে এমন এক ঘটনা ঘটে গেছে যাতে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে হিলারি ক্লিন্টনকে। সকল গোপনীয়তা, সকল পরিকল্পনা হুমা আবেদিনের জানা। আর সেই হুমার স্বামী অ্যান্থনি ওয়েনারের ল্যাপটপেই মিলেছে কিছু ই-মেইল। যেগুলো হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময়ের। এফবিআই’র পরিচালক জেমস কোমে তার রিপোর্টে একথা জানানোর পর তোলপাড় পড়ে গেছে। মূলত অ্যান্থনির সঙ্গে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া হুমার চলছে। ২০১৩ সালে নিউইয়র্কের মেয়র পদে এই অ্যান্থনির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাকে দিতে পারেনি। তার কারণ ছিলো অ্যান্থনির যৌন কেলেঙ্কারি। সেবার এক ১৫ বছরের কিশোরী মেয়েকে নোংরা টেক্সট পাঠিয়ে তোপের মুখে পড়েন অ্যান্থনি। নিজের গোপনাঙ্গের ছবি একটি বাচ্চা মেয়ের কাছে পাঠিয়ে পৌরুষ জাহির করতে গিয়ে তার মাশুল ভালো করেই গুণতে হয় তাকে। তারই ধারাবাহিকতায় হুমা আবেদিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলছে। আর সে অবস্থায় যখন এই ই-মেইল কেলেঙ্কারি ধরা পড়লো তখন হিলারি ক্যাম্পেইন হুমার পাশেই দাঁড়িয়েছে। তারা বলছে, হুমা কোথাও যাচ্ছেন না।
গত দু’দিন ধরে যখন ভাবা হচ্ছিলো, এবার বুঝি হিলারি-হুমা বিচ্ছেদ হতে চলেছে, তার সকল জল্পনা-কল্পনা বাতিল করে দিয়ে হিলারি ক্যাম্পেইনের এ ঘোষণা বিস্ময় জন্ম দিয়েছে বৈকি!
ক্লিনটন ক্যাম্পেইনের চেয়ারম্যান জন পোডেস্টা সাংবাদিকদের বলেছেন, পুরো তদন্ত কাজে হুমা আবেদিন সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন। তার কোনো কাজ নিয়েই আমাদের মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনি। আমরা পুরোপুরি তার পাশে রয়েছি। কিন্তু এখানে হুমা আবেদিনকে নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। পররাষ্ট্র দফতরের ই-মেইল তিনি বাড়ির কম্পিউটারে ব্যবহার করছিলেন যাতে তার স্বামীরও অ্যাকসেস ছিলো। মিডিয়াগুলো সে প্রশ্নটিই করছে।
বিল ক্লিনটনের এক সাবেক উপদেষ্টা ‘মিনি হিলারি’ বলে ডাকতেন হুমাকে। হিলারি যেখানেই যেতেন, হুমা থাকতেন। ২০০৮ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডাকে হিলারি যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে গেলেন, সেদিনও সঙ্গে হুমাকেই নিয়ে গিয়েছিলেন। বেনগাজী ইস্যুতে অক্টোবরে যখন হিলারিকে কংগ্রেসে টানা ১১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখনও হুমা আবেদিন সেখানে ছিলেন। ক্লিনটনদের কাছে হুমা দ্বিতীয় কন্যার মতো। আবার কেউ কেউ এও বলেন, হুমা-হিলারি বোন-বোন।
৮ নভেম্বর ফয়সালা হবে আরও অনেক কিছুর
মার্কিন সিনেটের ৩৪টি আসনে পছন্দের সিনেটর বেছে নিতে ৮ নভেম্বর ভোট দেবেন মার্কিন ভোটাররা। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ সিনেটের আসন সংখ্যা একশ’টি। ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন একেকজন সিনেট সদস্য। ইতোমধ্যেই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৪টি আসনের। এর মধ্যে ২৪টি রিপাবলিকানদের এবং দশটি ডেমোক্রাটদের দখলে। এই ৩৪টি সিনেট আসনের গুরুত্ব দুই দলের কাছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের থেকে কম নয়। কারণ বর্তমানে নিম্নকক্ষ হাউজে রিপাবলিকানরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সিনেটে খুব অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা।
সিনেটে একশ’ আসনের মধ্যে বর্তমানে ৫৪টি রিপাবলিকানদের দখলে। কিন্তু ৮ নভেম্বরের ভোটে যদি ডেমোক্রাটরা নিজেদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি আর মাত্র চারটি আসন বাগিয়ে নিতে পারে আর হিলারি ক্লিনটন যদি নির্বাচনে জয়ী হন, তবে সিনেটে দুই দলের আসন সমান সমান হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে ডেমোক্রাটরা। কারণ সিনেটে কোনো বিষয়ে দুই দলের ভোট সমান হলে নীতি নির্ধারণী ভোটটি দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। আর এখানেই রিপাবলিকানদের যত শঙ্কা।
শুধু প্রেসিডেন্ট বা সিনেটরই নয়, নভেম্বরের ৮ তারিখে নিজেদের পছন্দের গর্ভনরকেও বেছে নেবেন ১২টি অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা। ৩৪টি অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা রাজ্যের বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের ব্যাপারে নিজেদের মতামত দিতে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটেও অংশ নেবেন। এছাড়া ৮ নভেম্বরই কমপক্ষে ২৫টি নগরীতে মেয়র বাছাই করবেন সংশ্লিষ্ট ভোটাররা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই এদিন অনুষ্ঠিত হবে বিভিন্ন মিউনিসিপ্যালিটির ভোট। ব্যালেটোপিডিয়া জানাচ্ছে, ৮ নভেম্বর দেশটির ৮০ শতাংশ লেজিসলেটিভ আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া অনেক রাজ্য কিংবা কাউন্টিতে এমনকি স্কুল বোর্ড সদস্য ও বিচারক নির্বাচিত করার ব্যাপারেও এদিন ভোট দেবেন মার্কিন ভোটাররা। সব মিলিয়ে ৮ নভেম্বরে নির্বাচন প্রক্রিয়ার কর্মযজ্ঞের বিস্তার আসলে আরও অনেক বিশাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। -সূত্র : এএফপি, বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন