ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

ইসলামী জীবন

কন্যা শিশুর নিরাপত্তা ও ধর্র্মীয় অধিকার

প্রকাশের সময় : ৮ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

॥ তিন ॥
পুরুষ হলেই নারী থেকে কেউ অধিক সম্মানিত হয় না। বর্তমান বিশ্বের কোন পুরুষ খাদিজা, আয়িশা ও ফাতিমা (রা.)-এর সমান মর্যাদাবান হবে না। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই নারীদের অযোগ্য ও হীন মনে করা হয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিও নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ।
বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে উপরের বর্ণনা হতে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া গেল। বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় নারীকে জীব-জন্তু এবং ব্যবহারিক সামগ্রীর মত মনে করা হতো। দুর্ভাগ্যের প্রতীক, অপকর্মের উৎস, শয়তানের দোসর, নরকের দ্বার, যৌন চাহিদা চরিতার্থ করার বাহন হিসেবেই পরিচিত ছিল নারী। মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর মর্যাদার জন্য যিনি প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠেন, নারীকে সংসার, সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে যিনি প্রথম স্বীকৃতি দান করেন, সত্যিকারার্থে নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির যিনি প্রবক্তা, তিনি হচ্ছেন একজন পুরুষ- সর্বযুগের, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোরআন নাযিলের মাধ্যমে নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআন নারীকে মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যা হিসেবে বিভিন্নভাবে মর্যাদার আসনে আসীন করেছে। ইসলামে নারী ও পুরুষের মাঝে বৈষম্য ছাড়া অন্য কোন বৈষম্যের স্থান নেই। এমনকি আল-কোরআনেও ক্ষেত্রবিশেষ পুত্রের চেয়ে কন্যাকে মহান করে তুলে ধরা হয়েছে।
বস্তুত বিশ্বজাহান সৃষ্টির মূলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক সুচিন্তিত মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুসারেই তিনি সব কিছু জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। প্রথম মানুষ আদম (আ.)কে সৃষ্টি করার পর পরই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার পরিকল্পনাকে কার্যকর করার জন্য তার জুড়ি মা হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আল-কোরআনের বাণীসমূহ প্রণিধানযোগ্য। আল-কোরআনে বলা হয়েছে- “তিনিই তো সেই মহান সত্তা যিনি সৃষ্টি করলেন তোমাদেরকে একটি মাত্র ব্যক্তি এবং বানালেন তার থেকে তার জুড়িকে।” “আল-কোরআন ৪ : ১”
সৃষ্টি প্রসারের উদ্দেশ্যে নর-নারীর পারস্পরিক সম্মিলন এবং এতে যে প্রশান্তি ও প্রজন্ম বৃদ্ধি প্রক্রিয়া এটিই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অভীপ্সিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক বস্তু আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারো।” “আল-কোরআন, ৫১ : ৪৯” তিনি আরও বলেন, “পবিত্র মহান তিনি, যিনি জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন উদ্ভিদ, মানুষ এবং তারা যাদেরকে জানে না তাদের প্রত্যেককে।” “আল-কোরআন, ৩৬ : ৩৬”
মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর আকৃতি দান করেছেন। তিনি বলেন, “আর মান-মর্যাদার দিক দিয়েও আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টিলোকের অনেকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” “আল- কোরআন, ৯৫ : ৪”
তিনি বলেন, “নিশ্চয় আমি বনী আদমকে মর্যাদা দান করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলভাগে ও জলভাগে চলাচলের বাহন দান করেছি। আর আমি তাদেরকে দিয়েছি নানাবিধ উত্তম জীবনোপকরণ এবং আমি তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” “আল-কোরআন, ১৭ : ৭০”
পুত্র ও কন্যা যদিও দু’টি ভিন্ন সত্তা তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্র ছাড়া উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট মিল এবং সমতা রয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আল্লাহ তাআলা কন্যাকে পুরুষের জন্য নিয়ামত হিসিবে মর্যাদাবান করেছেন। এ প্রসঙ্গে কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “মানুষের কাছে মনোরম করা হয়েছে আকর্ষণীয় কাম্য বস্তুসমূহের মহব্বত যেমন নারীর, সন্তান-সন্ততির, স্তূপিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্যের, চিহ্নিত অশ্বরাজির, গবাদি-পশুরাজির এবং ক্ষেত-খামারের। এসবই হল পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তু। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল।” “আল-কোরআন, ৩ : ১৪” নারীজাতি পুরুষদের জন্য আকর্ষণীয় নিয়ামত। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় জানা যায়, রাসূল (সা.) বলেছেন, “এ পৃথিবীতে আমার প্রিয় বস্তু হচ্ছে নারী।” “নাসাঈ, ইমাম, আস-সুনান, অধ্যায়: ইশরাতিন্নিসা, অনুচ্ছেদ : হুববিন্নিসা, আল-কুতুবুসসিত্তা, রিয়াদ : দারুসসালাম, ২০০০;”
রাসূল (সা.) বলেন, “আল্লাহ তাআলা মাতাগণের নাফরমানী, তাদের অধিকার আদায় না করা, চারদিক থেকে ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে সঞ্চয় করা এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত প্রোথিত করাকে তোমাদের জন্য চিরতরে হারাম করে দিয়েছেন।” “বুখারী ইমাম, আস-সহীহ; বৈরুত: দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবী, তা. বি. : খ. ৮, পৃ. ২৫১, হাদীস নং- ২২৩১।” মহানবী (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তির কন্যা সন্তান হবে, সে যদি জীবিত দাফন না করে, তার প্রতি তাচ্ছিল্যমূলক আচরণ না করে এবং নিজের পুত্রসন্তানকে তার উপর প্রাধান্য না দেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” “আবূ দাউদ, ইমাম, আস-সুনান, অধ্যায়: আল-আদাব, অনুচ্ছেদ: ফি ফাদলে মান আলা ইয়াতামা, আল-কুতুবুসসিত্তা, রিয়াদ : দারুসসালাম, ২০০০।”
কোরআন কন্যা সন্তান হত্যা করার মত মানবতাবিরোধী কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং কন্যা সন্তানকে মর্যাদা এতই বেশি দেয়া হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কন্যা সন্তানই দোযখের আগুন থেকে বাঁচার উপায় হতে পারে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, “আল্লাহ যদি কন্যা সন্তানদের মাধ্যমে কাউকে কোন রকম পরীক্ষায় ফেলেন আর সে যদি তাদের প্রতি সদয় আচরণ করে, তাহলে ঐ সব কন্যা সন্তান তার জন্য দোযখের আগুন থেকে বাঁচার কারণ হবে।” “মুসলিম, ইমাম, আলস-সহীহ, বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবী, তা. বি. খ. ১৩, পৃ. ৭৫, হাদীস নং- ৪৭৬৩।”
তৎকালীন আরব সমাজে ইয়াতীম শিশু কন্যারা নির্যাতিত হতো সবচেয়ে বেশি। তাদের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা হতো। কোরআন তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর দিয়ে দাও ইয়াতীমদের তাদের সম্পদ এবং বদল করো না খারাপ মালের সাথে ভাল মালের। আর গ্রাস করো না তাদের মাল তোমাদের মালের সাথে মিশিয়ে। নিশ্চয় এরূপ করা গুরুতর পাপ।” “আল-কোরআন, ৪ : ২।”
আল্লাহ তাআলার এ স্পষ্ট ঘোষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইয়াতীমরা অবহেলিত নয় বরং গুরুত্ব ও অধিকারের মর্যাদাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- “আর তোমরা ইয়াতীমদের পরীক্ষা করে নেবে, যে পর্যন্ত না তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখতে পাও তবে তাদের মাল তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে। ইয়াতীমের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না এবং তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না যে সচ্ছল সে যেন ইয়াতীমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকে এবং যে অভাবগ্রস্ত সে যেন সঙ্গত পরিমাণে ভোগ করে। যখন তোমরা তাদের হাতে তাদের সম্পদ প্রত্যর্পন করবে, তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্য হিসেব গ্রহণে আল্লাহ যথেষ্ঠ।” “আল-কোরআন, ৪: ৬।” আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয় যারা ইয়াতীমদের মাল অন্যায়ভাবে খায়, তারা তো শুধু তাদের পেটে আগুন ভর্তি করছে; আর তারা সত্বরই দোযখের আগুনে জ্বলবে।” “আল-কোরআন, ৪ : ১০”
উপর্যুক্ত বর্ণনা হতে প্রতীয়মান হয়, ইয়াতীম শিশুরা কখনও অবহেলার পাত্র নয়। বরং মানুষ হিসেবে তারাও বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী। রাসূল (সা.) বলেছেন: “হে আল্লাহ! আমি দুই দুর্বল (ইয়াতীম ও নারী)-এর প্রাপ্য অধিকার রক্ষা করব।” “ইবনে মাজাহ, ইমাম, আস-সুনান, অধ্যায়: আল আদাব, অনুচ্ছেদ: হাককুল ইয়াতীম, আল-কাহেরা, দারু ইবনুল হাইছাম, ২০০৫, খ. ৪, পৃ. ১০০, হাদীস নং- ৩৬৭৮।” আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষকে একজনকে অপরজনের ভূষণ তুল্য এবং একে অপরের পরিপূরক ঘোষণা দিয়ে তাদের বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। স্ত্রী যে স্বামীর জন্য শান্তির আধার, প্রশান্তির উৎস তা আমরা কোরআনের এ বর্ণনা থেকে উপলব্ধি করতে পারি। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের জন্য হালাল নয় নারীদের জবরদস্তি উত্তরাধিকার গণ্য করা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন