শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

ধর্ম দর্শন

আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)

নূর মুহাম্মদ রাহমানী | প্রকাশের সময় : ৩১ মার্চ, ২০২২, ১২:০৪ এএম

নাম আসমা। উপাধি ‘জাতুন-নিতাকাইন’। নবীপত্নী আয়েশা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করার সময় আমরা তাড়াতাড়ি করে কিছু খাবার পাকিয়ে একটি থলেতে করে রেখে দিলাম। কিন্তু থলেটি বাঁধার জন্য রশি-দড়ি জাতীয় কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই বড় বোন আসমা (রা.) কোমরবন্ধ খুলে দু’ টুকরো করে এক টুকরা দিয়ে থলেটির মুখ বাঁধলেন। এ কাজটি তাঁর এত সম্মান বয়ে এনেছে যে, ইতিহাসে তাকে জাতুন-নিতাকাইন বলে স্মরণ করা হয়। (বোখারি, হাদিস ৩৯০৫)।

তিনি ছিলেন নবীপত্নী আয়েশা সিদ্দিকা রা. এর সৎ বোন, আর আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর হলেন সহোদর ভাই। হিজরতের ২৭ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। নানা কোরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আবদুল উজ্জা এবং দাদা আবু কুহাফা মক্কার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্যতম। বাবা ইসলামের প্রথম খলিফা হেজাযের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। আর মা কাতলা কিংবা কুতাইলা বিনতে আবদুল উজ্জা।

ইসলাম গ্রহণ : তিনি সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম নারী সাহাবি। মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঈমান ও তাকওয়ার ওপর নবীজির কাছে বাইয়াত হন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক বলেন, তাঁর আগে মাত্র ১৭ জন মহান ব্যক্তি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন।

বিয়ে ও সন্তানাদি : সিদ্দিকে আকবর (রা.) মহানবী (সা.)-এর ফুফু সাফিয়্যা (রা.)-এর পুত্র এবং রাসুলের বিশিষ্ট সাহাবি জোবায়ের ইবনুল আওয়ামের (রা.) সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী জোবায়ের যেমন আশারায়ে মোবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন। তেমনি আসমা নিজেও একজন ভাগ্যবতী নারী সাহাবি। যার পিতা, দাদা, বোন, ভাই, স্বামী এবং সন্তানাদি সবাই মহানবী (সা.)-এর সাহাবি হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি নিজেও বাবার মতো দুরন্ত সাহসিকতা, স্থিরতা, বিরত্ব এবং সত্য ও সততার মূর্তপ্রতিক ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ৫ ছেলে এবং ৩ কন্যাসন্তান দান করেন। ছেলেরা হলেন-আবদুল্লাহ, উরওয়া, মুনযির, মুহাজির এবং আসেম। আর কন্যারা হলেন খাদিজাতুল কোবরা, উম্মে হাসান এবং আয়েশা।
আবু জেহেলের বেয়াদবিমূলক আচরণ : হিজরতের রাত অতিবাহিত হলো। সকাল হলে কোরাইশ নেতা আবু জেহেল মহানবী (সা.)-কে বিছানায় না পেয়ে ক্রোধে প্রায় পাগল হয়ে গেল। প্রথমে আলী (রা.)-কে খুব ধমকাধমকি করল। তারপর আবু বকর (রা.)-এর ঘরে গেল। ভেতর থেকে আসমা (রা.) দরজা খুললেন। আবু জেহেল রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার বাবা কোথায়? তিনি উত্তর করলেন, আমার জানা নেই। এ কথা শুনেই এ বদমায়েশ লোকটা আসমা (রা.)-এর গালে এত জোরে চড় মারল যে, তাঁর কানের দুল দূরে গিয়ে পড়ল। (সিরাতে ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা : ৩৪৪)।

ত্যাগ-তিতীক্ষা : তিনি বাড়িতে থেকে বাবা ও নবীজির খবর রাখতেন। মক্কার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। পাহাড়-পর্বত ও অনেক ভয়ানক স্থান পাড়ি দিয়ে খাবার-পানি তাদের কাছে নিয়ে যেতেন। এটা এ কারণে সম্ভব হয় যে, তিনি জানতেন যে, তিনি আল্লাহর হেফাজতে রয়েছেন।

আবু বকর (রা.) রাসুলের সঙ্গে হিজরতের সময় সাথে করে পুরো সম্পদই নিয়ে নেন। যার পরিমাণ ছিলো ৬ হাজার দেরহাম। পরিবারের জন্য কিছুই রেখে যাননি। আবু বকরের বাবা আবু কুহাফা তাঁর সফরের বিষয়টি জানতে পেরে-তিনি মুশরিক ছিলেন-পুত্রের বাড়িতে গেলেন এবং নাতনীকে বললেন, আমি তো দেখছি সে চলে গিয়ে তোমাদের কষ্ট দিয়েছে, আর সম্পদের মাধ্যমেও তোমাদের কষ্ট দিয়েছে। আসমা তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, দাদা, আব্বু আমাদের জন্য অনেক সম্পদ রেখে গেছেন। তারপর আসমা কিছু পাথর নিয়ে সে টুকরিতে রাখল যেখানে মানুষ টাকা-পয়সা রাখে। তারপর টুকরিটিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলেন। তারপর তার হাত স্পর্শ করালেন (আবু কুহাফা তখন অন্ধ ছিলেন) এবং বললেন, দাদা দেখুন, আব্বু আমাদের জন্য কত সম্পদ রেখে গিয়েছেন! আবু কুহাফা বললেন, তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ সম্পদ রেখে গেলে তো ভালোই করেছেন। এখানে আসমার (রা.) মূলত উদ্দেশ্য ছিল তাঁর দাদাকে টাকা-পয়সার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা এবং তার থেকে কোনো খরচ গ্রহণ না করা। কারণ দাদা হলেও তিনি মুশরিক ছিলেন, আর মুশরিকের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে তিনি অপছন্দ করতেন।

মদিনায় সর্বপ্রথম মুসলমান শিশুর জন্ম : মদিনায় সর্বপ্রথম জন্ম হওয়া মুসলমান শিশু আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের। আসমা নিজেই বর্ণনা করেন, আমি মদিনায় গেলে আদরের সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রা.) আমার কোলে আসে। আমি তাকে নিয়ে রাসুল (সা.)-এর খেদমতে গেলাম এবং তাকে তাঁর কোলে দিলাম। রাসুল তাকে চুমো দিলেন। তাহনিক করে দিলেন তথা খেজুর চিবিয়ে তাঁর মুখে দিলেন। প্রিয়নবীর এই লালা মিশ্রিত খেজুরই ছিল তাঁর পেটে যাওয়া প্রথম খাবার। শেষে প্রিয়নবী তাঁর জন্য দোয়া করে দিলেন।

জোবায়ের (রা.)-এর সঙ্গে বিচ্ছেদ : আসমা (রা.) ও জোবায়ের (রা.) দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দাম্পত্ত-জীবন পার করছিলেন। কিন্তু জোবায়ের (রা.)-এর মেজাযে কিছুটা কঠোরতা ছিল। তবে আসমা (রা.) ধৈর্যের সঙ্গেই দিনাতিপাত করছিলেন। কিন্তু একদিন ঘরোয়া ঝগড়া এ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল যে, তা তালাক পর্যন্ত গড়াল। বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও আসমা তাঁকে খুব ইজ্জত-সম্মান ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতেন এবং তাঁর ভালো গুণগুলো আলোচনা করতেন। তালাকের পর স্বীয় ভাগ্যবান পুত্র আবদুল্লাহ (রা.)-এর সঙ্গে জীবন পার করেন।

সাদাসিধে জীবন : তাঁর জীবন ছিল সাদাসিধে। তিনি নিজেই বলেন, জোবায়ের (রা.)-এর সঙ্গে আমার বিয়ের সময় তিনি নিতান্ত অভাবগ্রস্ত ছিলেন। মোটে তাঁর সম্পদ ছিল একটি ঘোড়া ও একটি উট। তাই ঘরের কাজ সেরে ঘোড়া এবং উটের যত্ন ও পানি আনার কাজ আমাকেই করতে হতো। মহানবী (সা.) জোবায়েরকে (রা.) বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে অল্প-স্বল্প জমি দিয়েছিলেন। আমি সেখান থেকে খেজুরের বিচি মাথায় করে নিয়ে আসতাম এবং সেগুলো ছেঁচে ঘোড়াকে খেতে দিতাম। তারপর আমার বাবা আমাদের কষ্ট লাঘবের জন্য একটি কৃতদাস পাঠালেন এবং এরপর সেই ঘোড়ার কাজসহ বাইরের সব কাজ করতো। (বোখারি : হাদিস ৫২২৪)।

দানশীলতা : তিনি ছিলেন অনেক দানশীল। দু’ হাত ভরে দান করতেন। কাসেম ইবনে মুহাম্মদ বলেন, আমি আয়েশা ও আসমার চেয়ে অধিক দানশীল নারী দেখিনি। তবে তাদের দানের ধরন ছিল ভিন্ন। আয়েশা একটার পর একটা বস্তু জমা করতেন, জমা হয়ে গেলে তারপর সবগুলো একসঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যয় করতেন। আর আসমা পরবর্তী দিনের জন্য কোনো কিছুই সংরক্ষণ করতেন না।

মৃত্যু : আসমা (রা.) খুব দোয়া করতেন- হে আল্লাহ, আবদুল্লাহর লাশ না দেখা পর্যন্ত আমার মৃত্যু যেন না হয়। হয়েছেও তাই, আবদুল্লাহ শহিদ হওয়ার কয়েক দিন পরই তিনি মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। আর আবদুল্লাহ শাহাদাতবরণ করেছেন ৭৩ হিজরির জুমাদাল উলা মাসে। মৃত্যুর সময় তাঁর আসমার (রা.) বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। এ দীর্ঘ জীবনে তিনি পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। তবে জীবনের শেষ দিকে এসে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মোট ৫৬টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

লেখক : শিক্ষক হাদিস ও ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps