ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

ইসলামী জীবন

কন্যা শিশুর নিরাপত্তা ও ধর্র্মীয় অধিকার

প্রকাশের সময় : ১৩ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

॥ চার ॥
আর তাদের আটকে রেখো না তাদের যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করতে, কিন্তু যদি তারা কোন প্রকাশ্য ব্যভিচার করে তবে তা ব্যতিক্রম। তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন করবে। তারপর তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা এরূপ জিনিসকে অছন্দ করছ যাতে আল্লাহ প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন।” “আল-কোরআন, ৪ : ১৯।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে বিধবা নারী, সুশ্রী ও সম্ভ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজ সন্তানদের সেবা-যতœ ও লালন-পালনের ব্যস্ততায় নিজেকে বিবাহ হতে বিরত রেখেছে যে পর্যন্ত না সন্তান বড় হয়ে পৃথক হয়ে গিয়েছে এরপর মৃত্যুবরণ করেছে, তাহলে এমন নারী জান্নাতে আমার নিকটবর্তী হবে (দু’আঙ্গুলের মত দূরত্বের ন্যায়)।” “আবু দাউদ, ইমাম, আস-সুনান, অধ্যায়: আল-আদাব, অনুচ্ছেদ : ফজলে মান আলা ইয়াতামা : প্রাগুক্ত।” আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, “মহানবী (স.) বলেন, বিধবা নারী ও মিসকীনদের কল্যাণের জন্য প্রচেষ্টাকারী আল্লাহর পথে জিহাদকারী অথবা দিনভর রোযা পালনকাপরী ও রাতভর তাহাজ্জুদ নামাযে রত ব্যক্তির সমতুল্য সওয়াব পাবে।” “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, অধ্যায়: আননাফাকাত, অনুচ্ছেদ : ফাদলিন নাফাকাতি আলাল আহলি, আল-কুতুবুসসিত্তা, রিয়াদ : দারুস সালাম- ২০০০, পৃ. ৪৬২।”
নারীর সামাজিক দায়িত্ব : কোরআন মাজিদে পুরুষের ন্যায় নারীদেরকেও সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা মানবগুষ্ঠির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি। অর্থাৎ তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত এবং মানব জাতির সর্বাপেক্ষা হিত সাধানকারি।” “ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কোরআনিল আজীম, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৪০১ হি: খ. ২, পৃ. ৯৩।” এখানে নারীদেরকে উত্তম জাতির অর্ধেক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
মানব জাতির বংশ বিস্তারে নর ও নারী উভয়ের ভূমিকা সমান। আল কোরআনে এসেছে- “হে মানুষ! আমি তোমারদেকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদেরকে বিভাজন করেছি বিভিন্ন জাতিতে ও বিভিন্ন গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।” “আল-কোরআন, ৪৯ : ১৩।”
অতএব বোঝা গেল, পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে দুনিয়ার সকল মানুষকে একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। পাপ ও পুণ্যের বিচারে পুত্র ও কন্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কোরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে- “আমি বিনষ্ট করি না তোমাদের কোনো শ্রমিকের কর্ম, তা সে হোক পুরুষ কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা একে অন্যের অংশ।” “আল-কোরআন, ৩ : ১৯৫।”
“যে ব্যক্তি নেক কাজ করবে, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী এবং সে ঈমানদান হবে, এরূপ লোক জান্নাতে দাখিল হবে, আর তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।” “আল-কোরআন, ৪ : ১২৪।“ “যে নেক কাজ করে এবং সে মুমিন, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী, আমি তাকে অবশ্যই দান করবো এক পবিত্র শান্তিময় জীবন এবং তারা যা করত তার জন্য তাদেরকে শ্রেষ্ঠ পুরুষ্কার দান করবো।” “আল-কোরআন, ১৬ : ৯৭।” “যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করে সে কেবল তদানুরূপ প্রতিফল পাবে। আর যে ব্যক্তি নেক কাজ করে সে পুরুষই হোক কিংবা নারীই হোক, সে যদি মুমিন হয় তবে এরূপ লোকরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে, সেথায় তাদেরকে দেয়া হবে বেহিসাব রিযিক।” “আল-কোরআন, ৪০ : ৪০।”
ধন সম্পদ উপার্জন এবং মালিকানার ব্যাপারেও ইসলাম পুত্র ও কন্যার মধ্যে কোন পার্থক্য করে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার প্রাপ্য অংশ। আর প্রার্থনা কর আল্লাহর কাছে তার অনুগ্রহ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” “আল-কোরআন, ৪ : ৩২।”
পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের ব্যাপারেও ইসলাম নর ও নারীর মধ্যে কোন পার্থক্য করে না। আল্লাহ বলেন- “আর তালাকপ্রাপ্ত নারী তিন হায়েয পর্যন্ত নিজেকে প্রতীক্ষায় রাখবে। তাদের পক্ষে বৈধ নয় গোপন রাখা যা আল্লাহ তাদের জরায়ূতে সৃষ্টি করেছেন, যদি তারা আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাসী হয়। আর যদি তারা আপন-মীমাংসা করতে চায় তবে ঐ সময়ে তাদের ফিরিয়ে নিতে তাদের স্বামীরা অধিক হকদার। নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের আছে তাদের উপর। আর নারীদের উপর রয়েছে পুরুষদের মর্যাদা। আল্লাহ পরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞ।” “আল-কোরআন, ২ : ২২৮।”
দ-বিধানেও ইসলাম নর ও নারীর মধ্যে কোন পার্থক্য করে না। মহান আল্লাহ বলেন, “হে বুদ্ধিমানগণ! তোমাদের জন্য কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” “আল-কোরআন, ২ : ১৭৯।”
উত্তরাধিকার আইনে নর-নারী উভয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম সমান গুরুত্ব আরোপ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” “আল-কোরআন, ৯৬ : ১।”
কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনায় জ্ঞানার্জন শুধু পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়নি বরং পুুরুষের ন্যায় নারীকেও জ্ঞানার্জনের পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ সকললেই ঐক্যমত্য পোষণ করেন। এসব নিদের্শনা হতে প্রমাণিত হয় যে, বহু ক্ষেত্রেই পুত্র ও কন্যার মধ্যে সমতা রয়েছে। এসব ব্যাপারে উভয় শ্রেণির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুত্র ও কন্যাতে পার্থক্য করার অধিকার মানুষের নেই। আল্লাহ তার মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যেখানে যত সংখ্যক পুরুষ এবং যেখানে যত সংখ্যক নারীশিশু পয়দা করতে চান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কন্যাসন্তান বেশি দিয়েছেন। তার পুত্র সন্তান জন্ম নিলেও তারা শিশু কালেই ইন্তিকাল করেন। আল্লাহ তার প্রিয়তম নবীকে কি কারণে বেশি কন্যাসন্তান দান করলেন? নবী-রসূলগণ জানেন ও পুরোপুরি বিশ্বাস করেন, আল্লাহ তাআলা যা কিছু করেন সে সব কিছুর মধ্যে অবশ্যই হিকমত আছে, এজন্য কোন অবস্থাতেই তারা মনক্ষণœ হন না। সাধারণ মানুষকে কন্যা শিশুর অধিকারের ব্যাপারে সচেতন করতে রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কন্যাদেরকে অপছন্দ করো না আমি নিজেই তো কন্যাদের পিতা।” “আদ-দাইলামী, আবি গুজা, আল ফিরদাউস ফি মাছুরিল খিতাব, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৯৮৬, খ. ৫, পৃ. ৩৭।” ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ কন্যা ও নারীকুলকে দুর্লক্ষণে বলে অভিহিত করার কারণে সাধারণ মানুষও কন্যা শিশুর জন্মকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করে। এ কারণেই অভিশপ্ত হয়েছে কওমে লূত এবং তাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে। আল-কোরআনে এসেছে “তিনি যা খুশি সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। আবার যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা বানান। নিশ্চয় তিনি মহাজ্ঞানী, সবকিছু করতে সক্ষম।” “আল-কোরআন, ৪২ : ৪৯৫০।”
মানব বংশের অস্তিত্ব রক্ষা ও এর প্রসারের প্রয়োজনে ছেলে ও মেয়েসন্তান উভয়ের গুরুত্বই সমান। আল্লাহ তাআলা ছেলে সন্তানদের দ্বারা এক ধরনের কর্ম করান এবং মেয়ে সন্তান দ্বারা অন্য ধরনের কর্ম করিয়ে থাকেন। আর এজন্য তাদের দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক আকৃতি, ভিন্ন-ভিন্ন মন-মেজাজ ও আলাদা আলাদা রুচি-বৈশিষ্ট্য। একজন পুরুষের মধ্যে জীবন-যৌবনের যে চাহিদা আছে তা পূরণ করার জন্য অবশ্যই একজন জীবনসাথী আবশ্যক। নারী ব্যতীত অন্য কিছুতেই এ চাহিদা পূরণ হয় না। সারাদিন পরিশ্রম করে ফিরে এলে স্ত্রীর মিষ্টি হাসি ও প্রীতিপূর্ণ সম্ভাষণ মুহূর্তের মধ্যে সব ক্লান্তির অবসান ঘটায়। তাই ইসলামে কন্যাশিশুকে অশুভতো নয়ই বরং সৌভাগ্যের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কন্যা ও পুত্র সন্তান দ্বারা একই রূপ সেবা পাওয়া যায় না। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রুগ্ন অবস্থায় শয্যাপাশে বেশিক্ষণ অবস্থান ও বিনিদ্র রজনী যাপন করতে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অগ্রবর্তী। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ঘরের কাজ বেশি করে মেয়েরা। হাসপাতালগুলোতে সেবা শুশ্রƒষার দায়িত্বে মেয়েদের বেশি নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। ইসলাম পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে নারীদেরকে এ সেবা কাজের অনুমতি দেয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন