বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯, ২৯ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

সারা বাংলার খবর

ভোজ্য তেলের চাহিদার ৮০ ভাগই আমদানী নির্ভর

দেশে বিপুল সম্ভবনার তেলবীজ উৎপাদন কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছছে না

বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৬ মে, ২০২২, ১০:২৮ এএম

দেশে সরিষা, সয়াবিন এবং সূর্যমুখি’র আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ঠ সুযোগ থাকলেও এখনো চাহিদার ৮০ ভাগ ভোজ্য তেলই আমদানী করতে গিয়ে বিপুল বৈদেশিক মূদ্রা ব্যায় হচ্ছে। এবার আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন সহ ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধির রেশ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়ায় সাধারন মানুষকে যেমনি চরম দূর্ভোগে পড়তে হয়েছে, তেমনি বাড়তি মূল্য পরিষোধে বৈদেশিক মূদ্রার মজুদের ওপরও চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সরিষা, বাদাম ও সূর্যমুখি তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারন অদিপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে দেশে মাত্র ৮ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা, সয়াবিন ও চিনা বাদামের আবাদ হয়েছে। এছাড়াও কিছু জমিতে তিল-এর আবাদ হয়েছে। যা থেকে ১১ লক্ষাধিক টন তেল বীজ উৎপাদনের সম্ভবনা রয়েছে। তবে তেলবীজের আবাদ ও উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বেশী হলেও তা চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
তবে এখনো দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগেরও বেশী সয়াবিন তেলের। যার প্রায় পুরোটাই আমদানী নির্ভর। কারণ দেশে আবাদকৃত প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে ১.৬০ লাখ টনের মত সয়াবিন তেলবীজ উৎপাদন হলেও তা দিয়ে কোন ভোজ্যতেল হচ্ছে না। এসব সয়াবিনের প্রায় সবটাই চলে যাচ্ছে পোল্ট্রি ফিডের কারখানায়। বরিশালের হিজলা, মুলাদী ও মেহেদিগঞ্জ ছাড়াও ভোলা এবং লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলে আবাকৃত বিপুল সয়াবিন তেল বীজ মাঠ থেকেই কিনে নিচ্ছে বিভিন্ন পোল্টি ফিড কারখানার নিয়োজিত ফরিয়ার দল।
অপরদিকে বিপনন ব্যাবস্থার অভাব সহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষতির ফলে সূর্যমুখির আবাদও বাড়ছে না। সূর্যমুখি তেলবীজ উৎপাদনের পরে তা নিয়ে কৃষকরা চরম বিপাকে পড়ছেন ক্রেতার অভাবে। অথচ দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ উপক’লীয় এলাকায় সয়াবিন এবং সূর্যমুখির আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন কৃষিবীদগন।
সদ্য সমাপ্ত রবি মৌসুমে দেশে প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টরে সরিষা, ৮০ হাজার হেক্টরে সয়াবিন, ৯৫ হাজার হেক্টরে বাদাম ও প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টরে সূর্যমূখির আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় ২৪ হাজার হেক্টরে সয়াবিন, প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টরে সূর্যমুখি ১৩ হাজার হেক্টরে সরিষা এবং প্রায় ২৩ হাজার হেক্টরে চিনাবাদাম আবাদ হয়। গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিটি তেল বীজের আবাদই সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলেও বেড়েছে। তবে তা কবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছবে সে বিষয়ে কারো কিছু জানা নেই।
এখনো দেশে প্রায় ৩০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদার ৮০ ভাগই আমদানী নির্ভর। এমনকি এবারো উপক’লীয় এলাকায় উৎপাদিত সয়াবিনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। পোল্টি ফিড ও ভোজ্য তেলের দাম গত বছরের প্রায় ৩৫Ñ৪০ ভাগ বাড়লেও ফিড মিলের ফরিয়ারা সিন্ডিকেট করে মাঠ পর্যায়ে সয়াবিন গত বছরেরও কম, ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ টাকা মন দরে কিনে নিচ্ছে। ফলে কৃষকরা এবার সয়াবিন আবাদ করে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলেও অভিযোগ করছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ‘সয়াবিন ও সূর্যমূখী তেল মানবদেহের জন্য যথেষ্ট উপকারী’। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, ‘সয়াবিনে ৪০-৪৫% আমিষ এবং ১৯-২২% পর্যন্ত তেল থাকে। যেকোন ডাল বা শুটি জাতীয় শস্যের তুলনায় সয়াবিনে আমিষের পরিমাণ বেশী। অপরদিকে সূর্যমুখী একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট তেল ফসল হিসেবে বিবেচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ তেল বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল ফসল হিসেবে বিবেচিত। সূর্যমুখীর বীজে ৪০-৪৫% পর্যন্ত লিনোলিক এসিড রয়েছে। অথচ এ তেলে কোন ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড নেই। হেক্টর প্রতি ফলনও ১.৭ থেকে ১.৯ টন পর্যন্ত’ বলে জানিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীগন।
‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি’ ইতোমধ্যে উন্নত প্রযুক্তির ও উচ্চ ফলনশীল প্রায় ৪০টি বিভিন্ন জাতের তেল বীজ উদ্ভাবন করেছেন। যার মধ্যে সয়াবিনের ৬টি এবং সূর্যমুখীর দুটি জাত রয়েছে। বারি ইতোমধ্যে ‘সোহাগ-পিবি-১’, ‘বাংলাদেশ সয়াবিন-৪ বা জি-২’, ‘বারি সয়াবিন-৫’ ও ‘বারি সয়াবিন-৬’ নামের একাধিক উন্নতজাত উদ্ভাবন করেছে। এসব উন্নতজাতের সয়াবিনের ফলন হেক্টর প্রতি ১.৮০ টন থেকে সোয়া দুই টন পর্যন্ত। দো আঁশ, বেলে দো আঁশ ও এটেল দো আঁশ মাটি সয়াবিন চাষের উপযোগী।
অপরদিকে ১৯৭৫ সাল থেকে দেশের উপকূলীয় বরিশাল ও পটুয়াখালী ছাড়াও রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, দিনাজপুর, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমূখীর পরীক্ষামূলক আবাদ হলেও দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকেও এর কোন সম্প্রসারন ঘটেনি। বাস্তবে এখনো দেশে সূর্যমুখী তেল-এর তেমন কোন বাণিজ্যিক উৎপাদনই হচ্ছে না। ফলে অত্যন্ত সম্ভবনাময় এ তেল বীজের আবাদ ও উৎপাদনও বাড়ছে না। বছর কয়েক আগে কয়েকটি এনজিও উপাক’লীয় এলাকায় সূর্যমূখী আবাদে কৃষকদের মাঝে বীজ সরবরাহ করলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফলন সংকট সহ বিপনন ব্যবস্থার অভাবে পরবর্তিতে তার কোন সম্প্রসারন ঘটেনি।
এমনকি গত কয়েক বছর ধরেই রবি মৌসুমে একাধীক ঘূর্ণিঝড় সহ প্রাকৃতিক দূর্যোগেও সূর্যমুখির উৎপাদন বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়া প্রতি বছরই আবাদকৃত জমির সূর্যমুখী ফুলের বাগানে টিয়া’র আক্রমনে এ তেলবীজ পাখির পেটে চলে যাচ্ছে। কৃষক টিয়ার আক্রমন বাঁচিয়ে বীজ ঘরে তুলতে পারছেন না। বারি এ পর্যন্ত ‘কেরানী-ডিএস-১’ ও ‘বারি সূর্যমুখী-২’ নামের দুটি উন্নত জাতের সূর্যমুখী ফুলের জাত উদ্ভাবন করলেও কৃষক পর্যায়ে তার তেমন কোন সম্প্রসারন ঘটেনি।
কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একাধীক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দেশে সয়াবিন এবং সূর্যমুখি সহ তেল বীজ-এর আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার আরো গুরুত্বারোপ করছে বলে জানিয়েছেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps