রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

পানি নামছে, ক্ষতি স্পষ্ট হচ্ছে

সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে নগরীকে বন্যামুক্ত রাখতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা ধান-চাল ব্যবসায়ীদের ক্ষতির

ফয়সাল আমীন, সিলেট/ মো. হাসান চৌধুরী সুনামগঞ্জ থেকে | প্রকাশের সময় : ২৪ মে, ২০২২, ১২:০৫ এএম

বন্যায় সর্বনাশ করেছে সিলেটের নানাখাতে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ভেসে গেছে মৎস্য সম্পদ। সেইসাথে অপূরণীয় লোকসানের মুখে ফেলেছে ধান চাল ব্যবসায়ীদের। ক্ষতি মোকাবেলায় ছিল না কোনো প্রস্তুতি। বৃষ্টি ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যায় এমন পরিস্থিতি চিন্তায় ছিল না। চোখের সামনে দেখেছেন কেবল উন্নয়নের জোয়ার। সেই জোয়ার যে টেকসই যে ছিল না, বিষয়টি এখন আঁচ করছেন ভুক্তভোগীরা। নদীগুলো একদিনে পানি ধারনের ক্ষমতা হারায়নি, কিন্তু সে দিকে মনোযোগ দেননি পদস্থরা। নিচে ইঁদুরের গর্ত রেখে উপরে মাটির পলেফ দিয়েই গেয়েছেন উন্নয়ন বন্ধনা। সে কারণে বন্যার পানি নদী মাড়িয়ে নিরাপদ আবাসস্থলে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, উৎপাদনশীল খাতে ঢুকে করে দিয়েছে তছনছ। ক্ষয়ক্ষতি পুষাতে নতুন করে শুরু করতে হবে এমনটিই মনে করা হলেও বন্যার এমন পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ দরকার বলে মনে করছেন সচেতন মহল। নতুবা প্রতিবছর এমন দুযোর্গের মুখে পড়ে সর্বস্ব হারাবেন সিলেটবাসী।

সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জেলার ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক এখনও রয়েছে পানির নিচে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত, পুননির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত বাসাবাড়ির তালিকা প্রণয়ন এবং নগরীকে বন্যামুক্ত রাখতে করণীয় নির্ধারণে একটি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ইতিমধ্যে। এ কমিটির যৌথ প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। নগরীর বন্যা পরিস্থিতিতে গত রোববার সব দফতর-সংস্থা ও অংশীজনকে নিয়ে নগরীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিসিকের আয়োজনে নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নির্দেশনা দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট ১ (সদর-নগর) আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় সুরমা নদী খনন, নগরীর পকুর-দিঘি উদ্ধার ও খনন এবং ছড়াগুলোকে শতভাগ উদ্ধার করার নির্দেশ দেন তিনি। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নগরীকে রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এদিকে, চলতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সিলেটের সড়ক। পানি কমে এলেও এখনও অনেক সড়ক পানির নিচে রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করত পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সিসিক, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) ৫৩৬ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে রয়েছে জানায়। বন্যার পানি নামলেও এসব সড়ক সংস্কারে লাগবে প্রচুর সময়। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান ইনকিলাবকে জানান, সিসিক এলাকার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৫টি ওয়ার্ডের প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার সড়কে বন্যার পানি উঠে গেছে। পানি নামলেই দ্রুততম সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে কাজ শুরু করা হবে।

এদিকে, আকস্মিক বন্যায় সিলেটের ১১টি উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ৭৪৯টি পুকুর, দিঘী, হ্যাচারি ও মাছের খামার তলিয়ে গেছে। এতে ২ কোটি ১৩ লাখ মাছের পোনা এবং ২ হাজার ৩০৫ টন মাছ বন্যার পানিতে ভেসে মাছ চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদফতর। মাছ ভেসে যাওয়া ছাড়াও হয়েছে অবকাঠামোগত ক্ষতি। এর ফলে সিলেট জেলার ১৫ হাজার ১৬৩ জন খামার মালিকের ২ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম এ তথ্য জানান।

এছাড়া সিলেটে বন্যার দাপটে ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন ধান-চালের ব্যবসায়ীরা। সুরমা নদী তীরবর্তী ধান-চালের মিল ও আড়তে গুদামজাত করে রাখা কোটি টাকার ধান-চাল নষ্ট করেছে বন্যার পানি। সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের নগরীর কাজিরবাজার ধান-চালের মিল ও আড়তে গিয়ে জানা যায়, গুদামে রাখা সারি সারি ধান-চালের বস্তা ভিজে নষ্ট হয়েছে বন্যার পানিতে। গুদামগুলো থেকে বেরিয়ে আসছে ধান-চাল পচা দুর্গন্ধ। মজুতকৃত ৫০ কেজির হাজার হাজার বস্তা চাল ভিজে পচন ধরেছে।

এদিকে সুনামগঞ্জের ৫ উপজেলায় পাহাড়ী ঢল ও প্রবল বর্ষণে রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালর্ভাট, কৃষি জমি, শীতকালীন সবজি ও পুকুরের মাছ ভেসে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। টানা বর্ষনে পাহাড়ী ঢল ও বন্যার পানিতে ৫ উপজেলার ১২’শ পুকুরের মাছ ভেসে তিন কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের অধীনে জেলার ৫ উপজেলায় প্রায় ২৭২ কি. মি. রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই সাথে ৩টি ব্রিজ ও কালর্ভাট ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে প্রায় একশ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। কৃষি ক্ষেত্রে ১০৮৯ হেক্টর বোরো ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৭০ হেক্টর, আউশ বীজতলা ১৫০ হেক্টর, আউশ ধান ৩০ হেক্টর, চিনাবাদাম ৭৫ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এ ছাড়াও মানুষের ঘরবাড়ী ও গরু বাছুরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্বরূগঞ্জ গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল জানান, অকাল বন্যায় আমাদের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কোনভাবে পুষিয়ে উঠা সম্ভব নয়। একদিকে অকালে বোরো ফসল অন্যদিকে পাহাড়ী ঢলের পানিতে আউশ আমন সবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সরকার কৃষকদের ঋণ সহায়তা না দিলে এ অবস্থা থেকে উত্তরন সম্ভব হবে না

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps