সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৬ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সুযোগ সীমিত: যুক্তরাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণের প্রতিক্রিয়া

অনলাইন ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৮ মে, ২০২২, ১১:০৩ এএম

বাংলাদেশে বর্তমানে শন্তিপূর্ণ সমাবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি না পাওয়া, সমাবেশে বাধা দেওয়া, সমাবেশস্থলে ক্ষমতাসীন দলের বা অঙ্গসংগঠনের একই দিনে সমাবেশ আহ্বান করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে সমাবেশে অংশ নেওয়া লোকজনকে ভয়-ভীতি দেখানোসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ২০২১ কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রকাশ করেছে। ২০২১ সালের বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির মূল্যায়নে তৈরি হয়েছে ‘২০২১: কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিসেস’। বিশ্বের ১৯০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টে এ রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি বিশ্বের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের আইনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের বিধান রয়েছে, বর্তমান সরকার এই অধিকার সীমিত করেছে। বর্তমানে বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভের মতো সমাবেশের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অগ্রিম অনুমতি নিতে হয়।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মতে, বিরোধী দলগুলির জমায়েত নিষিদ্ধ করার জন্য আইনী বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়। আবার মাঝে মাঝে পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরাও বিরোধী দল বা সংগঠনের কর্মীদের বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করে।

উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের পর গত বছরের ২৬-২৮ মার্চে হেফাজত-ই-ইসলামের সদস্যরা বিক্ষোভ করেছিল। তাতে বলা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা না আসা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল। কিন্তু পুলিশ আসার পরেই বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারী এবং পুলিশ দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় পুলিশ ৩,২৭০ জন নামধারী এবং আরও অনেককে অজ্ঞাতনামা আসামী করে ১৫৪টি মামলা দায়ের করেছে। এই ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের সদস্যসহ বিরোধীদলীয় ১ হাজার ২৩০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার ও আটক করা হয়। এছাড়াও একইসময়ে আন্দোলন করা বাংলাদেশ ছাত্র, যুব ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের ৫৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

এছাড়া বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা প্রায় সারা বছর ধরেই অসংখ্য বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছেন। বিশেষকরে, সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপিকে অনুষ্ঠান করতে অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। গত বছরের ২৯ মার্চ খুলনায় বিএনপি কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় ২০ জন আহত হয়। এছাড়া একই বছরের ৩১ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত দরিদ্রদের জন্য খাদ্য বিতরণ অনুষ্ঠানের কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য ছোট ছোট রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠানেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্টে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বিষয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ বেশ কয়েকজনের প্রতিক্রিয়া জানতে ভয়েস অফ আমেরিকার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তাদের কথায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানা গেছে।

রুহুল কবির রিজভী
জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি

বাংলাদেশ বর্তমানে গুম-খুন-অপহরণের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দ্রব্যমূল্যের দাম লাগামহীন হয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ খুন-গুম-হত্যা করেছে, গত ১০ বছরে দেশের ১১ লাখ কোটি টাকা পাচার করে বেগমগঞ্জ গড়ে তুলেছে, মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় হোম করেছে, এই অন্যায়, দুর্নীতি নিয়ে জনগণের পাশে দলটি দাঁড়াবে কীভাবে? যেহেতু নিজেদের দাঁড়ানোর মুখ নেই তাই তারা দেশের নাগরিকদেরও কথা বলতে দেয় না। আমরা দেখেছি, এক যুগের বেশি সময় ধরে বিনা ভোটের এই অবৈধ সরকার গুম, খুন, অপহরণকে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রক্ষাকবচে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাব বাহিনী ও র‌্যাব-পুলিশের সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে পিছু হটায় গুম-খুনের আতঙ্কে থাকা পরিবারগুলোয় কিছুটা হলেও স্বস্তি নেমে এসেছিল। কিন্তু সরকার আবার আগের চেহারায় ফিরতে শুরু করেছে। গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের এখন ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। দেশে একধরনের বাকশাল কায়েম করা হচ্ছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মতো কর্মসূচীকেও সরকার ভয় পায়।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ

যারা বলে দেশে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সুযোগ কম, তারা কথাটি সত্য বলেন না। যখন কেউ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের নামে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, মারামারি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও হামলা করতে দ্বিধা করে না, তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের আওতায় আনে। একটা শ্রেণি আছে সরকার চাপে পড়লে তাদের কাছে ভালো লাগে। তারাই দেশ বিরোধী নানা ষড়যন্ত্র করে বেড়ায়। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের এখানে এসেছে। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে সুসংহত হতে আরও চেষ্টা করছে। তাই আওয়ামী লীগ অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিও আস্থা রাখতে চায়। কিন্তু যারা দেশ বিরোধী, দেশের অমঙ্গল কামনায় ষড়যন্ত্র করে তাদের সাথে আওয়ামী লীগ কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না। এক সময়ে এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না। দেশের জনসাধারণকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিহত করবে।

মাহমুদুর রহমান মান্না
সভাপতি, নাগরিক ঐক্য

আমরা বছর বছর দেখছি আমাদের জিডিপি বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তু মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে আরও অনেক সূচক আছে, সেগুলোর কোনোটিই ঊর্ধ্বমুখী তো নয়ই বরং সবই নিম্নমুখী। বর্তমানে দেশে সীমাহীন বৈষম্য ও দারিদ্র বেড়েছে, চাকরি নেই। দেশে একটি দুঃশাসনের সাম্রাজ্য গড়া হয়েছে। সরকার যদি নিয়মিতভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, তবে তাদের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। সরকার নিজে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তাহলে কেন ক্ষমতায় আছে? কেউ সরকারের বিপক্ষে কথা বলতে চাইলে তার টুঁটি চেপে ধরা হয়। বৈষম্য, বেকারত্ব, দুঃশাসন নিয়ে কথা বলা যাবে না। কোনো সভা সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ করতেও দেওয়া হচ্ছে না। সবকিছুতে বিধি-নিষেধ আর অনুমতি নেওয়ার বাহানা। একটি দেশের জনসাধারণকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না, অধিকারের কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না সেই দেশটি একটি বাংলাদেশ।

নূরুল হক নূর
সদস্য সচিব, গণ অধিকার পরিষদ, সাবেক ভিপি, ডাকসু

বর্তমান সরকার যেভাবে বিরোধী দল-মত মানুষের ব্যাপারে কঠোর হয়েছে, অতীতে বাংলাদেশের কোনো সরকারের আমলে হয়েছে বলে কেউ দাবী করতে পারবে না। সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ শাসন করছে না বলেই যে কোনো কর্মসূচীকে ভয় পায়। কাউকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশও করতে দেওয়া হয় না। নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। অধিকাংশ সময়ে দেখা যায় দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ সভা বা সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করা হয়। আবার দেখা যায় লাঠিচার্জ করা হয়। গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা বারবার সরকার সমর্থকগোষ্ঠীর ও এদের অঙ্গসংগঠনের কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে। আবার দেখা গেছে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ পুলিশ ভঙ্গ করে দিয়ে আমাদের নেতা-কর্মীদের আটক করেছে। এই বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ দেশবাসীর মনে আছে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। সরকার এসব করার মধ্য দিয়ে আসলে ভীতির রাজত্ব কায়েম করতে চায়। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকেরই আছে।

জোনায়েদ সাকী
প্রধান সমন্বয়কারী, গণসংহতি আন্দোলন

বাংলাদেশে এখন যে পদ্ধতিতে ক্ষমতাসীন দল বিরোধীদের দমন করছে তাতে গণতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করার অধিকার থাকে না। সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে ভূমিকা দেখা যায়, তা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক একটি দেশের সাথে মানানসই নয়। আমরা জানি যে, যে কোনো পরিস্থিতিতেই কোনো বিশেষ ঘটনা প্রেক্ষিতে যে কেউ চাইলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ বা বিক্ষোভ প্রদর্শণ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে অত্যন্ত দুঃখের এবং হতাশার সাথে আমরা লক্ষ্য করছি এই ধরনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হয়। এইভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। মানুষের কথা বলার, প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps