বৃহস্পিতবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ০৩ ভাদ্র ১৪২৯, ১৯ মুহাররম ১৪৪৪

জাতীয় সংবাদ

স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চায় রোহিঙ্গারা

কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে ‘গো হোম ক্যাম্পেইন’

কক্সবাজার ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০২২, ১২:০১ এএম

‘চল চল আরাকানত যাইগৈ, আঁরার ঘরত যাইগৈ’ এই স্লোগানে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে রোহিঙ্গারা মিছিল করতে করতে যোগ দেয় মহাসমাবেশস্থলে। এ সমাবেশের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরার আওয়াজ তোলায় পাল্টে গেছে পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতিতি। গতকাল রোববার সকালে দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের দাবি নিয়ে বালুখালী ফুটবল খেলার মাঠে ‘গো হোম ক্যাম্পেইন’ নামে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার দাবিতে মহাসমাবেশের আয়োজন করেছে রোহিঙ্গারা। সেখানে একসাথে যোগ দেয় ক্যাম্প ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নাম্বারে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল ক্যাম্পের পৃথক পৃথক স্থানে কয়েকটি সমাবেশের আয়োজন করেন রোহিঙ্গারা। এসব সমাবেশে তারা গণহত্যার বিচার, দ্রুত প্রত্যাবাসনসহ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছেন। ‘গো হুম’ ক্যাম্পেইনসহ নানা স্লোগান লেখা অসংখ্য ব্যানার হাতে রোহিঙ্গারা মাঠে নামলেও সেখানে আয়োজক হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। আয়োজকের স্থলে উল্লেখ করা হয়েছে ‘নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী’।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট ক্যাম্পে প্রথমবারের মতো বড় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত মাস্টার মুহিববুল্লাহর নেতৃত্বে। কিন্তু এবারের বিশাল সমাবেশে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই বিষয়টি এখনো গোপন রেখেছে রোহিঙ্গারা। একটি সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পে এবারো মহাসমাবেশ আয়োজনে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে নিয়ে নেতৃত্বে দিচ্ছে নিহত রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহর হাতে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস ফর হিউম্যান রাইটস’। তাদের দাবিগুলোর লিফলেটে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস ফর হিউম্যান রাইটস নামের সংগঠনের লোগো রয়েছে। ওই লিফলেটে ১৮টি দাবি উল্লেখ করেছে রোহিঙ্গারা।

উত্থাপিত দাবিগুলো হলো, রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেই ডাকতে হবে, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন করতে হবে, সীমিত সময় রাখা যাবে মিয়ানমার ট্রানজিট ক্যাম্পে, প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করতে হবে তাদের নিজ নিজ গ্রামে, প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত প্রত্যেক চুক্তি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসঙ্ঘ, ওআইসি, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, বাংলাদেশ, এনজিও, সংশ্লিষ্ট সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, বার্মার ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল, সম্পত্তি ফেরত, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের সমাবেশের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হয়েছে কিনা সেটি জানতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে।
উল্লেখ্য, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয়ের আশায় বাংলাদেশে ছুটে আসে। পরে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদেরকে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়।

শরণার্থী শিবিরের সমাবেশ নিয়ে গতকাল বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন করেছে। কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মাদ ফারুকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মূল দাবি হচ্ছে আমরা আমাদের নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি চাই। সেখানকার নাগরিক হিসেবে সেখানে থাকতে চাই। কিন্তু নিরাপত্তা না থাকলে আমরা যেতে পারবো না’।

‘আমরা এখনো ফিরে যেতে ভয় পাই। তাই নিজের দেশে আমরা বেঁচে থাকার নিরাপত্তা চাই। আর এসবকিছু নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারকে দায়িত্ব নিতে হবে। ফিরে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে যদি আমরা আবারও কোন গণহত্যা নির্যাতনের মুখোমুখি হই তার জন্যে দায়িত্ব নিতে হবে’।
তিনি জানিয়েছেন, শিবিরে অবস্থানরত সবাই একসাথে জড়ো না হলেও সকল শিবিরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিজেদের মতো করে সমাবেশ করেছেন, সেøাগান দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে সবমিলিয়ে হাজার দশেক রোহিঙ্গা এতে অংশ নিয়েছেন।

তার ভাষায়, ‘শিবিরে কেউ আর থাকতে চায় না। আমাদের অনেকেই নিজের দেশে ভাল অবস্থায় ছিলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আর এখন এত অল্প জায়গায় লাখ লাখ মানুষের সাথে, খুব অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকি। এভাবে কে থাকতে চায়? শরণার্থী জীবন আর নয়’।
এর আগে কক্সবাজারের শরণার্থীরা বলেছেন, নাগরিকত্ব ও বিচারসহ অন্যান্য দাবি না পূরণ হলে তারা কখনোই মিয়ানমারে ফিরবেন না। ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অনেকের মধ্যে ভীতিও কাজ করেছে। অনেকেই ফিরে যেতে চাননি।

কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা, সাবেক ক্যাম্প নেতা মোহাম্মদ নূর বলছেন, সমাবেশ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ইস্যুটির দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। ‘দুই হাজার সতের সালের পর প্রায় পাঁচ বছরতো হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ যেন আমাদের ভুলেই গেছে। তারা আমাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে যা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেসব যেন থেমে গেছে’।
‘আমাদের মনে হয়েছে, আমরা যদি এভাবেই বসে থাকি তাহলে বিশ্ব আমাদের জন্য কিছু করবে না। এখানে আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সমস্যা, স্বাধীনভাবে চলা ফেরার সমস্যা। আমরা আর কতদিন এভাবে থাকবো’? ‘বাংলাদেশ আমাদের দীর্ঘদিন ধরে মানবতা দেখিয়েছে। আর কত দেখাবে’, প্রশ্ন মোহাম্মদ নূরের।

আজকের বিশ্ব শরণার্থী দিবসকে মাথায় রেখে এ আয়োজন করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শরণার্থী দিবস বলে রোহিঙ্গাদের মাথায় কিছু নেই। আর তাছাড়া আমরা শরণার্থী হিসেবেও স্বীকৃতি পাইনি’।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে বলা হলেও বাস্তবে বিষয়টি থেমে রয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুরুতে কথা বললেও তাদের জোরালো বক্তব্য ইদানীং আর শোনা যায় না। রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার অর্থ সহায়তাও কমে এসেছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে সমস্যার সমাধান যেন হচ্ছেই না।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার কিছু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার পূর্বশর্ত বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার এখনো পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ নেয়নি। বরং সেখানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। যদিও জেলার পুলিশ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার-এর কার্যালয় জানিয়েছে, এ আয়োজন রোহিঙ্গাদের স্বতঃস্ফূর্ত।
কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবিরের একজন বাসিন্দা বলছেন, সরকারের সহায়তায় তারা এ আয়োজন করেছেন।
তার ভাষায়, ‘ক্যাম্পে কোনো ধরনের সমাবেশ বিক্ষোভ করা নিষেধ। সরকার এতদিন এটা করার অনুমতি দেয়নি। কিন্তু এবার তারা আমাদের বলেছে, বিক্ষোভ নয় তবে একটা ক্যাম্পেইনের মতো করতে পারবো আমরা। সেটার জন্য আমরা জড়ো হতে পারবো। আমাদের ব্যানার পোস্টারও বানিয়ে দেয়া হয়েছে’।

শিবিরে আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ বাহিনী এপিবিএন ১৪’র অধিনায়ক মোহাম্মদ নাইমুল হক বলেছেন, ‘এটা ওদের একটা ক্যাম্পেইন, সমাবেশ বলা যাবে না। ওরা নিজেদের দেশে ফেরত যেতে চায়। তাই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে। এটা তো সরকারবিরোধী বা দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড না। যদি কোনো বিষয়ে বিক্ষোভ করে তখন তাদের পারমিশন নিতে হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সেটা অ্যালাউড হয় না’।

রোহিঙ্গাদের এ আয়োজনে সহায়তা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এপিবিএনের আরো অনেক কাজ আছে। এটা ওদের আয়োজন। যারা প্রত্যাবাসন চায় না তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে’।
২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ২ বছর পূর্তির দিনে কুড়ি হাজারের মতো রোহিঙ্গা কুতুপালং শিবিরে সমাবেশ করেছিল। রোহিঙ্গাদের এত বড় সমাবেশ এর আগে কখনো হতে দেখা যায়নি। সেসময় সরকারের অনেকেই সেই সমাবেশের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (3)
Md Abdur Rahim ২০ জুন, ২০২২, ৬:৩৮ এএম says : 0
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাঠানো হউক তাদের দেশে
Total Reply(0)
Muhammad Nahid Hasan ২০ জুন, ২০২২, ৬:৩৬ এএম says : 0
আল্লাহ আমাদের ভাইদেরকে নিজ বাড়িতে ফেরার তৌফিক দান করেন। আমিন।
Total Reply(0)
Mollah Kapasia ২০ জুন, ২০২২, ৬:৩৭ এএম says : 0
অন্যায় ভাবে এদের নিজ দেশ থেকে বের করে দিয়েছে বার্মা, অথচ প্রতিটা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর রাষ্ট্র যদি উগ্রতাকে উস্কে দেয়,এরা যাবে কোথায়,,,? জাতিসংঘের মাধ্যমে বার্মাকে বাধ্য করে এসব লোকদের বার্মায় ফেরত পাঠানো হউক
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন