শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ০৫ ভাদ্র ১৪২৯, ২১ মুহাররম ১৪৪৪

জাতীয় সংবাদ

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক

স্বামী-সন্তানদের রেকর্ডপত্র তলব

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৫ আগস্ট, ২০২২, ১২:০০ এএম

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার এবং তার পরিবার সদস্যদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাবিকুন নাহারের স্বামী সৈয়দ মো: আলমগীর, ছেলে সৈয়দ মো: সামিন ইয়াসার, মেয়ে সাবাহও ইকরার সম্পদেরও তথ্য-উপাত্ত (স্মারক নং- চাওয়া হয়েছে। সংস্থার সহকারী পরিচালক জিএম আহসানুল কবির গত ২৫ জুলাই রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি দেন। সাবিকুন নাহার ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন জেলা রেজিস্ট্রি অফিসহ সংশ্লিষ্ট ২৪টি দফতরে চিঠি পাঠানো হয়। নিবন্ধন অধিদফতরের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন’র অভিযোগ আনা হয়। চিঠিতে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের নামে কোনো জমি/প্লট/ফ্ল্যাট/বাড়ি/দোকান ইত্যাদি রেজিস্ট্রেশন থাকলে বিনা খরচে দলিলের সার্টিফায়েড কপি ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনুসন্ধান কর্মকর্তার হাতে পৌঁছানোর অনুরোধ জানানো হয়। সাবিকুন নাহারের বর্তমান ঠিকানা-ফ্ল্যাট-এ/২,বাড়ি নং-৩৭, রোড-১০/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা এবং স্থায়ী ঠিকানা, শাক্তা (পশ্চিম পাড়া), কেরাণীগঞ্জ, ঢাকার ঠিকানায় নোটিশটি পাঠানো হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহারের বিরুদ্ধে রয়েছে ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। দীর্ঘদিন সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় প্রত্যেকটি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে রেখে এসেছেন দুর্নীতির স্বাক্ষর। কমিশনে দলিল সম্পাদন, জমির শ্রেণী পরিবর্তন, জাল দলিল সম্পাদন এবং ‘খাড়া দলিল’ সম্পাদনে তিনি নিতেন মোটা অংকের ঘুষ। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হওয়ার আগে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার। এরও আগে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার। এ সময় তিনি সরকারি ফি’র অতিরিক্ত দলিল প্রতি লাখে ৩০০ টাকা নিতেন। দলিল লেখক সমিতির নামে দিতে হতো দলিলপ্রতি ৮শ’ টাকা করে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে কোনো ফি না থাকলেও তিনি দলিলপ্রতি ১৫শ’ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা নিতেন। হেবা দলিলেও ছিল না কোনো ফি। কিন্তু সাবিকুন নাহার নিতেন ১৫শ’ টাকা করে। বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রিতে নিতেন ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো দলিলে পর্চার মূল কপি না থাকলে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি ফটোকপি দিয়েও রেজিস্ট্রি করতেন। নকল তুলতে দলিল প্রতি ভেন্ডার নিতেন ২ হাজার টাকা করে। এখান থেকে ৫শ’ টাকা বখরা পেতেন সাবিকুন নাহার। রূপগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মাসে গড়ে দলিল হতো ১২শ’টি। এই হারে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে সাবিকুন নাহারের মাসিক আয় ছিল ৫০ লাখ টাকার বেশি। জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে অব্যাহত রাখেন ঘুষ বাণিজ্য। কর্মকর্তা-কর্মচারি, দলিল লেখক এবং নিকাহ রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকে তিনি ঘুষ নিচ্ছেন অভিনব কায়দায়। তার অধীনস্থ ঢাকা সদর,কেরাণীগঞ্জ, গুলশান, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, সূত্রাপুর, উত্তরা, বাড্ডা, আশুলিয়া, খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। জেলা রেজিস্ট্রার টাইপিস্ট শরীফের মাধ্যমে মো: রফিকুল ইসলাম নামক ব্যক্তির কাছ থেকে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়ার কথা বলে ১৮ লাখ টাকা ঘুষ নেন। পরে রফিকের পরিবর্তে প্যানেলে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে অধিক টাকা ঘুষ নিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়।
চলতি বছর জানুয়ারিতে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী মো: রাসেল মিয়াকে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে বাড্ডা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন করেন। অফিস সহকারী তুহিনকেও পদায়ন করেন মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। গত কয়েক বছরে তিনি দেড় শতাধিক নিযোগ, বদলি, পদোন্নতি ও প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কয়েক মাস আগে তিনি অন্তত ৪০ জন মোহরার, টিসি মোহরার ও অফিস সহকারী বদলিসহ ১১ জন অফিস সহকারীকে বিভিন্ন অফিস থেকে এনে ঢাকা সদরের রেকর্ডরুমে পদায়ন করেন। তিনি একই চেয়ারে দীর্ঘদিন থেকে মন্ত্রী, পদস্থ আমলা এবং সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙিয়ে বদলি বাণিজ্য করছেন। তিনি চলেন বিলাসবহুল গাড়িতে। নিজ এলাকা কেরাণীগঞ্জের শাক্তায় রয়েছে শত কোটি টাকার সম্পত্তি। রাজধানীর হাতিরপুল, গুলশান ও উত্তরায় রয়েছে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট। ধানমন্ডির রোড নং-৯-এ, ১৫ কাঠা প্লটের ওপর নির্মাণ করেছেন ‘গোলাপ ভিলা-১’ এবং ‘গোলাপ ভিলা-২’ নামে ৮ তলা বাড়ি। নামে-বেনামে তার রয়েছে মার্কেট, দোকান এবং স্বর্ণের ব্যবসা। তার স্বামী সৈয়দ মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন ৮ বছর ধরে মৎস্য অফিসার হিসেবে ৮ বছর কেরাণীগঞ্জে কর্মরত রয়েছেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে সংস্থাটি। এর আগে বিগত কমিশন আমলে সাবিকুন নাহারের দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান হলেও অদৃশ্য ইশারায় সেগুলো ‘নথিভুক্ত’ হযে যায়। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান কমিশন নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদক সচিব মো: মাহবুব হোসেন বলেন, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তিনি যেই হোন- দুদক অনুসন্ধান করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় এটিরও অনুসন্ধান চলছে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন