রোববার ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০২ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

কেন চীনের ধারে কাছেও যেতে পারবে না

ভারতের বিমানবাহী রণতরী?

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

ভারতের নতুন এবং সবচেয়ে শক্তিশালী জাহাজ, বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্ত, গত শুক্রবার নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভারত বর্তমানে তার নৌবাহিনীর জন্য একটি নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে এবং বিক্রান্ত ভারতের গর্ব এবং শিল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। ভারত সাম্প্রতিককালে স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিত এবং তৈরি রণতরী বিক্রান্ত শুধুমাত্র একটি পরিপক্ক সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের ক্ষমতাকে তুলে ধরে না, পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব এবং ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপে আটকে থাকা প্রোগ্রামের একটি শক্তিশালী অনুস্মারকও। ভারতের পরবর্তী প্রজন্মের নৌবাহিনীর প্রয়োজনের তুলনায় এর সক্ষমতা অনেক কম।

পাকিস্তানের ওপর এক চোখ রাখার সময় ভারতের কৌশলগত ফোকাস ক্রমবর্ধমানভাবে চীন এবং তার নাটকীয় সামরিক সম্প্রসারণের দিকেও রাখতে হচ্ছে। সংখ্যাগতভাবে, চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী, তাদের সমস্ত জাহাজ এখন চীনা শিপইয়ার্ডে ডিজাইন এবং নির্মাণ করা হয়েছে। নৌবাহিনীর শক্তি বাড়াতে এবং সত্যিকারের বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার কারণে চীন এখন রেকর্ড গতিতে নতুন নতুন যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করছে। ভারতীয় কৌশলবিদরা ভবিষ্যতের নৌ-সংঘাতে চীনকে পরাস্ত করতে কী করতে হবে সেদিকে ক্রমবর্ধমানভাবে মনোনিবেশ করছেন। বিমানবাহী রণতরী বা এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারগুলি সেই সংঘর্ষে একটি ভূমিকা পালন করবে, তবে সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের অস্ত্র ব্যবস্থা মোকাবেলা করতে যথেষ্ট সক্ষম হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সময়ের সাথে সাথে আধুনিক হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিক্রান্ত, ভারতের সামরিক স্বদেশীকরণ কর্মসূচির জন্য একটি মাইলফলক, তবে এটি একটি পুরানো নকশায় তৈরি করা, যা ইতিমধ্যেই প্রায় বাতিল হয়ে গেছে। এটি ২০১৯ সালে চালু হওয়া চীনের নিজস্ব প্রথম অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি বিমানবাহী রণতরী শানডং-এর তুলনায় ভালো। উভয়ই সোভিয়েত আমলের নকশায় তৈরি করা হয়েছে।
প্রায় ৪৫ হাজার ওজনের বিক্রান্ত চীনের পুরানো শানডং-এর থেকেও ছোট। উভয় জাহাজেই বিমানের উড্ডয়নে সহযোগিতা করার জন্য পুরানো প্রযুক্তির ‘স্কি-জাম্প’ ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। বিক্রান্ত এবং শানডং উভয়ই স্থানীয় ডিজাইনারদের তাদের নিজস্ব ধারনা বিকাশ করার এবং নৌ-নকশা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ। তবে এই বিশাল যুদ্ধজাহাজের ডিজাইনে ভারত চীনের তুলনায় অনেক ধীরগতি দেখিয়েছে।

এক প্রজন্মের ব্যবধান: উল্লেখযোগ্য বিলম্ব বিক্রান্তকে তাড়িত করেছিল। ২০০৯ সালে এটি তৈরির কাজ শুরু হয় এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে চালু করা হয়। অর্থাৎ, প্রায় ১৩ বছর লেগেছে এটি তৈরি করতে। এর মধ্যে অস্ত্র ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলকভাবে, শানডং তৈরি করতে লেগেছিল মাত্র চার বছর। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক ডিজাইন তৈরি করার ক্ষমতা, ড্রয়িং বোর্ড থেকে সমুদ্র পরীক্ষায় নিয়ে যাওয়া, এসব দিক থেকেই তারা নিকট-প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের চেয়ে অনেক দ্রুত। ২০৩৫ সালের মধ্যে তারা ছয়টি উন্নত বিমানবাহী রণতরী তৈরি এবং চালু করতে যাচ্ছে।

গত জুন মাসে চালু হওয়া চীনের সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরী হাই-টেক ফুজিয়ানের তুলনায় বিক্রান্ত অন্তত একটি প্রজন্ম পিছিয়ে রয়েছে। ফুজিয়ান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নির্মিত প্রথম সুপারক্যারিয়ার, যা বিক্রান্তের চেয়ে অনেক বড়। এটি আরও বিমান ধরে রাখতে সক্ষম হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বিমানের টেকঅফের জন্য পুরানো ‘স্কি-জাম্প’ এর বদলে এতে আধুনকি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ফুজিয়ানকে বিক্রান্তের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে অস্ত্র ও জ্বালানি বোঝাই অনেক ভারী বিমান উৎক্ষেপণ করার সুবিধা দেয়।
স্কি-জাম্প সিস্টেম তার জেটগুলিকে তাদের নিজস্ব জ্বালানি খরচ করে টেক অফ করতে বাধ্য করে, যা জেটগুলি বহন করতে পারে এমন জ্বালানী, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমার পরিমাণ সীমিত করে। ফলে সমক্ষতার দিক থেকে ফুজিয়ানের ধারে-কাছেও যেতে পারবে না বিক্রান্ত। এখানেই শেষ নয়। বিক্রান্তের রাশিয়ান এয়ারক্রাফ্ট ফ্লাইট কমপ্লেক্স, ইলেকট্রনিক স্যুট যেটি বিক্রান্ত আকাশে থাকাকালীন তার বিমানগুলো সনাক্ত করতে এবং পরিচালনা করতে ব্যবহার করে, ইনস্টলেশনের সমস্যা ছিল এবং বেশিরভাগই ভারতীয় ডিজাইনে একীভূত করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার উপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এবং ক্যারিয়ারের সমাপ্তিতে আরও বিলম্বের কারণে রাশিয়ান প্রযুক্তিবিদদের দ্বারা পরিকল্পিত পরিদর্শন আটকে যেতে পারে।

বিক্রান্তের এয়ার উইং পুরাতন প্রজন্মের রাশিয়ান মিগ-২৯ কে-এর সমন্বয়ে তৈরি হবে যেগুলো ভারতের অপর বিমানবাহী জাহাজ আইএনএস বিক্রমাদিত্যে ব্যবহৃত হয়। কাগজে কলমে, ক্যারিয়ারে ব্যবহারের জন্য অভিযোজিত এই মিগগুলি সক্ষম বলে মনে হয়। কিন্তু জেটগুলি অবিশ্বস্ত এবং ভারী বলে প্রমাণিত হয়েছে, যার ফলে এর টেকঅফ এবং অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভারতীয় নৌবাহিনী এখন আরও উন্নত বিমানের সন্ধান করছে, ফ্রান্সের রাফাল এম এবং মার্কিন তৈরি এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট তাদের সম্ভাব্য পছন্দ।

২০২৩ সালে কার্যকরী: সাত বছরেরও বেশি সময় বিলম্ব এবং ছয়গুণ খরচ বেড়ে যাওয়ায়, বিক্রান্ত নির্মাণ একটি বিশাল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারটি কমপক্ষে ২০২৩ সালের আগে চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভারতের নৌ-শিপইয়ার্ডগুলির ধীরগতির পরিবর্তন চীনের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা ইতিমধ্যেই তার দ্বিতীয় সুপার ক্যারিয়ারে কাজ করছে যা ফুজিয়ানের সাথে যোগ দেবে। পর্যবেক্ষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এটি সম্ভবত পারমাণবিক শক্তিতে চালিত হবে, যা সুপারক্যারিয়ারটিকে সত্যিকারেই বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেবে। সূত্র : আল-জাজিরা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন