মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

ধর্ম দর্শন

সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা.)

মুফতী হাবীবুল্লাহ মিছবাহ্ | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০২২, ১২:০০ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গৃহিত পদক্ষেপ দাসদেরকে মানুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কারো করতলগত হওয়াটা। তার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ মানবসন্তান স্বভাবগত চাহিদা ও ঈমানের দাবিতে ধর্মীয় কার্যকলাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে অপারগ। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তিই তার জীবন, তার স্বাধীনতা ও তার শক্তি। দাস মুক্তিতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দেন ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান দাসকে দাসত্ব হতে মুক্ত করবে, (আযাদকৃত দাসের) প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ্ তার (মুক্তি দানকারীর) প্রত্যেকটি অঙ্গকে দোযখের আগুন হতে মুক্তি দান করবেন।’ (মিশকাত, হাদিস নং- ৩২৩৬ (১), ৭খ., পৃ-০১)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল ঘোষণা দিয়ে ক্ষ্যান্ত হননি, নিজে দাস মুক্ত করে বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা.)ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাতের অনুসরণ করে দাস মুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে দাসগণ মানবাধিকার ফিরে পেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রীতদাস যায়েদ ইবনে হারিসকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। হজরত আনাস রা., হজরত সালমান ফারসী ও সুহাইব রুমী রা. এবং অপরাপর ক্রীতদাসগণ সামাজিক মর্যাদা লাভ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খিদমত আনজাম দেন। গতকালের ক্রীতদাস আজকের সেনাপতি, আগামীকাল রাষ্ট্রপ্রধান, যাদের দ্বারা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় যে বৈপ্লবিক অবদান রাখেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারীর সামাজিক মর্যাদা দান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ক্রমান্বয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইতিহাসে এ প্রথম মায়েরা সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাক ইসলামী যুগে পৃথিবীর কোথাও নারীর সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তারা ছিল অবহেলার পাত্র ও সন্তান। উৎপাদনের যন্ত্র। তাদেরকে অপবিত্র মনে করা হতো। সমাজে যাতে নারী জাতির সম্মান ও মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সমাজের অর্ধেকাংশ নারীকে অবহেলা করলে সামাজিক সুবিচার পরাহত হবে। এ চেতনা আল্লাহর রাসুলের মধ্যে ছিল পুরাপুরি কার্যকর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঘোষণা দেন- ‘সাবধান! তোমরা নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো, কেননা তারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সাবধান তোমাদের স্ত্রীর ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপর রয়েছে তাদের অনুররূপ অধিকার। পুরুষ তার পরিবার-পরিজনের রক্ষক এবং স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের এবং সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণকারী।’ (রিয়াদুস সালেহীন, ১খ. পৃ. ২৭৬, ২৮৩) বিবাহ, বিধাব বিবাহ, খুল’আ তালাক, স্ত্রীলোকের মৃত পিতা, মৃত স্বামীর সম্পত্তি ভোগের অধিকার প্রভৃতি বিধান দ্বারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ন্যায় ইনসাফ নিশ্চিত করত পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেন যা অপরাপর যে কোনো সামাজিক কাঠামোর চেয়ে ছিল উন্নত। মোদ্দাকথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কল্যাণেই নারী জাতি সর্বপ্রথম পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি পায় এবং নিজেদের যোগ্য আসনে আসীন করার অধিকার ফিরে পায়। মানব সভ্যতা ও ধর্মের ইতিহাসে এ প্রথম নারী তার ন্যায্য সম্পত্তি পাওয়ার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার অধিকার পেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদেরকে তাদের পছন্দকৃত স্বামী গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। কন্যা সন্তান হত্যা নিষিদ্ধ করেন। উপরন্তু কন্যা, মেয়ে, বোন লালনপালকারীদের জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেন- ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। উপযুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা ছিল যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক। মদিনায় তার প্রতিষ্ঠিত সমাজ কাঠামোতে যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে তার নযীর পাওয়া মুশকিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণে খুলাফায়ে রাশিদীন যে সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন তা ছিল পুরাপুরি সুবিচার ও ন্যায় ইনসাফ নির্ভর। মানুষের প্রতি ন্যায় বিচারের যে নবীর ইসলামের মহান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার বুকে স্থাপন করে গেছেন, তার আলোকশিখা এখনো পৃথিবীতে অনির্বাণ।

লেখক : আরবি প্রভাষক, কড়িহাটি ফাজিল মাদরাসা, চাটখিল, নোয়াখালী।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন