মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

সম্পাদকীয়

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণকে স্বাগত জানাই পরিস্থিতি উত্তরণে কাজের জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৮ অক্টোবর, ২০২২, ১২:০০ এএম

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ৫৫০ কোটি ডলার ঋণ পাচ্ছে। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করে গত শনিবার রাতে সাংবাদিকদের এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। তিনি আরো জানিয়েছেন, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় এ ঋণ দেয়া হচ্ছে। অনেকটা সহজ শর্তে এ ঋণ পাওয়া যাবে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণের অর্থ ছাড় হবে। ফলে ডলার সংকট কেটে যাবে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে এটা একটা সুখবর। করোনা ও যুদ্ধের কারণে বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকট দেখা দিয়েছে। আমরাও এ সংকটের বাইরে নেই। আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। রফতানি আয়, প্রবাসী আয়, রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অবনমন ঘটেছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। প্রতিটি খাদ্যপণ্য, ব্যবহার্যপণ্য ও সেবাপণ্যের দাম বেড়েছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ও টাকার মূল্যমান কমেছে। খাদ্য, জ্বালানি শিল্পের কাঁচামালসহ জরুরি আমদানির জন্য যখন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন, তখন রিজার্ভ কমে যাওয়া মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাহোক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ পেলে বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে অনেকটাই স্বস্তি আসবে। সব ঋণের সাথেই কিছু শর্ত থাকে। এইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণও তার ব্যতিক্রম নয়। অত্যন্ত কঠিন শর্তে সরকার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে বলে সমালোচনা ছিল। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, কোনো কঠিন শর্ত বাংলাদেশকে পালন করতে হবে না। কারণ, উন্নয়ন সহযোগীরা যেসব সংস্কারের পরামর্শ দিচ্ছে, সেগুলো সরকারের কর্মসূচীতেই রয়েছে। এগুলো নতুন বিষয় নয়।

স্বাভাবিক যে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া গেলে, অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীও ঋণ দিতে দ্বিধা করে না। জানা গেছে, বাংলাদেশ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ছাড়াও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দেশ থেকে ঋণ পাওয়ার আশা করছে। এছাড়া পাইপলাইনেও বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার রয়েছে। এ অর্থ প্রাপ্তি দ্রতায়িত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা এ মুহূর্তে খুবই দরকার। পর্যবেক্ষকদের মতে, বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা রয়েছে ঋণের অর্থের সদ্ব্যবহার নিয়ে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যেসব ঋণ ও সহায়তা আসে তার একটা বড় অংশ লুটপাট ও অপচয় হয়ে যায়। অদক্ষ, অনৈতিক ও দলীয় আনুগত্যশীল কর্মকর্তাদের কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়ন যেমন ত্রুটিপূর্ণ ও বিলম্বিত হয়, তেমনি ব্যয় বাড়ে এবং নির্বাধে লুণ্ঠন সম্পন্ন হয়। গতকাল একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত এক খবরে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় অর্থের কী রকম ক্ষতি হয়, তার উল্লেখ রয়েছে। ২০১৮ সালে ৩৪টি সার গুদাম নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। সেই প্রকল্পের মাত্র ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশের কাজ হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত এক বছর সময়ও পার হয়ে গেছে। এখন প্রকল্পটির জন্য মূল বরাদ্দ ১৯৮৩ দশমিক শূন্য ৪ কোটি টাকার স্থলে ২৪৬৫ দশমিক ৫২ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের অদক্ষতা ও অকর্মন্যতার জন্যই যে এমনটা হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। এভাবে প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময় যেমন চলে যায়, তেমনি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। চুরি-অপচয়-লোপাট তো আছেই। এজন্য আজ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক কিংবা প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে, এমন প্রমাণ বিরল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহহীনদের পুনর্বাসনের জন্য গৃহনির্মাণের যে মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। অথচ, ওই গৃহনির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষতার প্রমাণ মিলেছে, যার জন্য কাউকে তেমন কোনো শাস্তির মুখোমুখী হতে হয়নি। কোনো মতেই, এ অবস্থা চলতে পারে না। জনগণের ট্যাক্স কিংবা বৈদেশিক ঋণের টাকার এমন অপব্যয় বন্ধ করতে হবে।

বাইরের উৎস থেকে টাকা আসবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও টাকার যোগান বাড়বে। কিন্তু এই টাকা কীভাবে খরচ হবে সেটা আগে ঠিক করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে। খাদ্যোৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন এবং আমদানির মাধ্যমে আসতে পারে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা। এই সঙ্গে কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশজুড়ে কাজের একটা জোয়ার তৈরি করতে হবে। এ জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ, কর্মিষ্ট লোকবল সরকারের সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষতাহীন, অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ, দলবাজ লোক বাদ দিতে হবে। সকল কাজের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করার বিকল্প নেই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
নোমান ১৮ অক্টোবর, ২০২২, ৯:৪৫ এএম says : 0
এ টাকা নিয়ে যথাযথভাবে কাজে লাগালে দেশের উন্নয়ন সম্ভব
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন