শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ০৫ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

জাতীয় সংবাদ

সেই রিকশার জন্য খুন!

এক হাতে দিয়েই সংসারের হাল ধরেছিলেন প্রতিবন্ধী হাসান

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ১৪ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

এক হাতে দিয়েই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন শারীরিক প্রতিবন্ধী মো. হাসান (৪২)। আর সেই রিকশাটির জন্যই তাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। সংসার জীবনে লড়াকু এ মানুষটির এমন মৃত্যুতে এখন অথৈ সাগরে পড়েছে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার। নিষ্ঠুরতম এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই যুবককে গ্রেফতারের পর আলোচিত এ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটিত হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন কর্মকর্তারা জানান, ওই প্রতিবন্ধীর কাছ থেকে রিকশাটি ছিনতাই করার জন্যই তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মো. আলাউদ্দিন (২৫) ও মো. শাকিল আহমদ (১৯) খুনের দায় স্বীকার করে এর বিস্তারিত বর্ণনাও দিয়েছেন। এ দুইজন নগরীর লালদীঘি পাড়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতেন। নিজেরা গাড়ির চালক হওয়ার জন্য লাইসেন্স পেতে টাকা জোগাড় করার উদ্দেশেই এ খুনের পরিকল্পনা করেন।

গতকাল রোববার এ দুইজনকে গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের তথ্য দেন পিবিআই কর্মকর্তারা। গত ৯ নভেম্বর সকালে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকায় প্রায় অর্ধগলিত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদি হয়ে কর্ণফুলী থানায় একটি হত্যা মামলা করে। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। তবে পিবিআই লাশটি শনাক্ত করতে পারছিল না। প্রায় পঁচে যাওয়ায় চেহারাও বিকৃত হয়ে যায়। ডান হাত নেই তাছাড়া বাম হাতের আঙ্গুল পঁচে যাওয়ায় আঙ্গুলের ছাপও নেয়া যাচ্ছিল না।

এর মধ্যে পিবিআই পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুকের কাছে খবর আসে তার পূর্ব পরিচিত হাসানকে ৭ নভেম্বর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর তিনি শিকলবাহা থেকে উদ্ধার ওই লাশ দেখে তাকে হাসান হিসাবে শনাক্ত করেন। মূলত এরপর থেকেই মামলার তদন্তে গতি আসে। নোয়াখালী জেলায় গ্রামের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় হাসান ছিলেন ওই পিবিআই কর্মকর্তার পূর্ব পরিচিত। আর হাসানকে ফোনে দুই দিন ধরে না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরাও পরিদর্শক ফারুকের কাছে ফোন করেছিলেন। ওমর ফারুক জানান, হাসান গ্রামে সাইকেল চালিয়ে দুধ বিক্রি করতেন। ডান হাতে টিউমার হয়ে সেখান থেকে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ায় বছর চারেক আগে হাসানের ডানহাত কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা। যার কারণে সে পেশা তাকে ছাড়তে হয়।

পরে কিছু দিন নোয়াখালীতে ‘ক্যানভাসার’ হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু নিজের ও চার সন্তান এবং স্ত্রীর ভরণপোষনে আর্থিক অনটনের পড়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। নগরীর বাকলিয়ায় অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। তার একই এলাকায় বাড়ি এক মেকানিক বাম হাতে চালাতে পারে এরকম একটি বিশেষ অটোরিকশা তৈরি করে দিয়েছিলেন। নগরীর বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকায় এক হাতে রিকশা চালিয়ে তার ছুটে চলার দৃশ্য অনেকের নজর কাড়তো।

পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, হাসানের লাশ শনাক্তের পর মোবাইল ফোনের লোকেশন দিয়ে শুরু হয় হত্যাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ। আর এ কাজে মহানগরী ও কর্ণফুলী এবং আনোয়ারা উপজেলার ৪৮টি স্পটে শতাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা পিবিআই পরিদর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, সিসিটিভি ফুটেজে এক জনের পরনে থাকা গেঞ্জিতে একটি লেখা দেখা যায়। আর এক জনের পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। সেই সূত্র মিলিয়ে আলাউদ্দিন ও শাকিলকে শনাক্ত করা হয়। শিকলবাহার আদর্শ পাড়ায় যে স্থানে লাশ পাওয়া গেছে সেখানে একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায় দুই যুবক একটি অটোরিকশা করে যাচ্ছিল। কিন্তু বের হয়ে আসার কোন ফুটেজ দেখা যায়নি।

হাসানের মোবাইলের লোকেশন নিয়ে দেখা যায় নগরীর লালদীঘি, কোতোয়ালী, কর্ণফুলী সেতু, শিকলবাহা, ফকিরনির হাট, কাফকো এবং নদী পার হয়ে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর ঘাট হয়ে আবার লালদীঘিতে এসে মোবাইলটি বন্ধ করা হয়েছে। কাফেকো এবং ১৫ নম্বর ঘাট এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দুই জনের স্পস্ট ছবি পাওয়া যায়। পরে সেটার সূত্র ধরে দুইজনকে ৭ নভেম্বর রাত দেড়টার দিকে লালদীঘি এলাকায় রিকশা খুঁজতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে একজনের পরনে থাকা গেঞ্জিতে ‘এভরিডে’ লেখা দেখা যায়। সেটি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় হত্যাকারীরা লালদীঘির আশেপাশের এলাকা থেকে অটোরিকশাটি ভাড়া করেছেন এবং ওই এলাকায় তাদের অবস্থান।

পিবিআই জানায়, আলাউদ্দিন ও শাকিলের পরিচয় হয় ২০ থেকে ২৫ দিন আগে। আলাউদ্দিন আগে গণপরিবহনে হেলপারের কাজ করতেন। গাড়িতে কাজ করতে তাকে আরকান সড়ক পরিবহন সমিতির সদস্য হতে হবে যেজন্য তার সাড়ে সাত হাজার টাকার প্রয়োজন। আর শাকিলও সেখানে কাজ করতে শিক্ষানবীশ ড্রাইভিং লাইসেন্স করার ইচ্ছে ছিল। মূলত সেই টাকা জোগাড় করতেই তারা অটোরিকশা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, গ্রেফতার আলাউদ্দিন বাড়ি শিকলবাহা আদর্শ পাড়া এলাকায়। তারা লালদিঘী এলাকা থেকে ৩০০ টাকায় হাসানের অটোরিকশাটি ভাড়া করে আদর্শ পাড়া পর্যন্ত। সেখানে গিয়ে দুই জন ভাড়া পরিশোধ করে হাসানের অটোরিকশাটি জোর করে রেখে দেয়ার চেষ্টা করেন। এতে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। হাসান রিকশায় থাকা কাঠ দিয়ে তাদের আঘাত করেন। এ সময় শাকিল গাছটি নিয়ে উল্টো হাসানকে আঘাত করেন।

হাসানের ডান হাত না থাকায় তার অটোরিকশাটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। সেটার বাম হাতে ব্রেক রেখে ডান দিকে একটি বেল্ট দিয়ে রিকশাটির হ্যান্ডেলের সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল নিয়ন্ত্রণের জন্য। সেই বেল্ট দিয়ে শাকিল হাসানের গলায় টান দেন। এ সময় হাসান রাস্তায় পড়ে গেলে আলাউদ্দিন তার পা চেপে ধরেন। এভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা হাসানের লাশটি রাস্তার পাশে একটি ডোবার মধ্যে ফেলে দেন। ধস্তাধস্তিতে আলাউদ্দিনের পায়ের স্যান্ডেল খুলে গেলে তিনি সেগুলো সেখানে রেখে খালি পায়ে চলে যান। ৯ নভেম্বর সকালে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে স্থানীয় লোকজন লাশটি দেখতে পায় এবং পুলিশ সেটি উদ্ধার করে।

পিবিআই জানায়, হাসানকে হত্যা করে তারা অটোরিকশাটি নিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে আনোয়ারার ফকিরনির হাট এলাকায় চলে যান। সেখানে আলাউদ্দিনের পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে অটোরিকশাটি বিক্রি করতে চাইলে তিনি তাদের ধাওয়া করেন। পরে কিছুদূর গিয়ে অটোরিকশাটি ফেলে তারা কাফকো এলাকায় চলে যান। সেখান থেকে নদী পার হয়ে পতেঙ্গা ১৫ নম্বর ঘাটে চলে আসেন। সেখান থেকে লালদীঘির পাড় চলে আসেন। দুই আসামীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন