বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯, ১০ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

জাতীয় সংবাদ

নেতৃত্বের দৌড়ে বিতর্কিতরা

ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলন ৩ ডিসেম্বর

রাহাদ উদ্দিন | প্রকাশের সময় : ১৬ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হতে যাচ্ছে দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বহুল প্রতীক্ষিত ৩০ তম সম্মেলন। সম্মেলনের ঘোষণার পরপরই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে নেতাকর্মীরা। তদবির আর লিংক লবিংয়ে সরব পদপ্রত্যাশীরা। কে হচ্ছেন ছাত্রলীগের পরবর্তী সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে। ইতোমধ্যে দলের হাইকমান্ড থেকে এমন বার্তা এসেছে যে, মেধাবী, সৎ, যোগ্য, ছাত্র সমাজের কাছে সমাদৃত, পারিবারিকভাবে আওয়ামী পরিবারের সন্তান হবেন এমন ছাত্র নেতাকেই সম্মেলনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত করা হবে। বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে সংগঠনের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার সাথে জড়িত কাউকে এতে মূল্যায়ন করা হবে না। এছাড়া করোনা মহামারীর সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যে ছাত্র নেতারা আলোচনায় এসেছেন তাদেরকে এ কমিটিতে প্রাধান্য দেয়ার কথাও জানিয়েছেন দলের হাইকমান্ড।

কিন্তু সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার সাথে সাথেই নেতা হওয়ার লক্ষ্যে জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য নেতাদের পাশাপাশি বেশকিছু বিতর্কিত নেতারাও শীর্ষ পদের আশায় ছুটছেন। যাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত পরিবার, ছাত্রদল-শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্টতা, মাদক সেবন ও চাঁদাবাজির সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এসব বিতর্কিতদের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাহসান আহমেদ রাসেল। যিনি ঢাবির সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে দুই শিবির নেতাকে হল থেকে বের করে পূনরায় একজনকে হলে তুলে সংগঠনকে বিতর্কিত করেন। এছাড়া,পলাশীতে চাঁদাবাজি, তার অনুসারীদের দিয়ে নিয়মিত ঢাবির ফুলার রোড এলাকায় ছিনতাই করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তৎকালীন হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস ও সহথসভাপতি রাকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য সহ ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাষ্কর্যের সামনে চাঁদাবাজির সংবাদ সংগ্রহ করার সময় ৫ সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করেন। পরে এ ঘটনার ২১ জনকে চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে ১১ জনকে বহিষ্কার করে শাখা ছাত্রলীগ। এরাও ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন। পলাশীতে চাঁদাবাজি, হলে ফাঁও খাওয়া ও বিভিন্ন সময়ে হলের রুম দখল নিয়ে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সহ-সভাপতি মাজহারুল ইসলাম শামীমের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করার অভিযোগ রয়েছে। শামীম বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে ছাত্রলীগের অনেক নেতাকে বাঁচানোর প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে ডাকেন। শামীমের বাবা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি থাকাকালে দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনও করেন তার বাবা।

উত্তরবঙ্গ থেকে শীর্ষ পদে আসতে চান সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদৌস আলম। যিনি ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিলে পহেলা বৈশাখের কনসার্টে হামলায় জড়িত ছিলেন। ২০২১ সালের ১৩ আগাস্ট চানখারপুল এলাকায় একটি গাড়ি আটকিয়ে তার থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও, তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্তত ছিলেন বলে সংগঠনটির একাধিক নেতাকর্মীরা জানান।

ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন যার বর্তমান বয়স ৩১ বছর। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মেয়াদ শেষে হল কমিটি দিয়েছেন। সেই হল কমিটিগুলো এখনও পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি। ছাত্রলীগের হল সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককের অভিযোগ, হল কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে গড়িমসি করা সাদ্দাম এবং সনজিতের সাংগঠনিক অক্ষমতার প্রকাশ। ২০২০ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বৃহৎ কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদের অনুসারীদের সাথে ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তৈয়ব নামের এক ব্যবসায়ীর মাইক, সাউন্ডবক্সসহ প্রায় ৮ লাখ টাকার জিনিস নষ্ট হয়, যার জন্য তিনি দায়ী করেন সাদ্দাম হোসেনকে। তার পাওনা টাকা দিবে দিবে করে এখনো দেয়নি সাদ্দাম। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাবির টিএসসিতে ছাত্র অধিকার পরিষদ আয়োজিত কাওয়ালী গানের অনুষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে সাদ্দামের বিরুদ্ধে। এছাড়াও হলগুলোতে ছাত্র নির্যাতনকারীদের প্রশ্রয়, সরকার বিরোধী রাজনীতিতে জড়িত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তার ওঠাবসা দেখা যায়। তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এমনকি তিনি কোন পদও নেননি।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের আরেক পদপ্রত্যাশী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সোহান খান। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিবির আখ্যা দিয়ে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অনূর্ধ্ব ২৯ কিংবা ৩০ এর কোটায়ও নেই সোহান খান।

বরিশাল অঞ্চল থেকে রয়েছেন সহ-সভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন। যার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্দিন হলের সভাপতি হওয়ার পর ওই হলের ক্যান্টিন মালিকের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে যা জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। এছাড়া অনূর্ধ্ব ২৯ কিংবা ৩০ কোটায়ও তিনি পিছিয়ে।

এ অঞ্চলের আরেক নেতা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নেতৃত্বে ২০১৫ সালের ২ আগস্ট রাতে ঢাবির বিজয় একাত্তর হলের তৎকালীন সভাপতি থাকাকালীন মো. হোসাইন মিয়া নামের নিজ দলের এক কর্মীকে শিবির আখ্যা দিয়ে রাতভর নির্যাতন করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওই সময় ইনানের সাথে হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত। ওই ঘটনায় হল প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি ইনান ও ফুয়াদ হোসেনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।

সাংগঠনিক সম্পাদক সোহানুর রহমান সোহানের বিরুদ্ধে ঢাবির শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে ২০১৬ সালে পলাশীর মনির নামের এক জুস বিক্রেতার কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। ওই দোকানদার চাঁদা না দিলে তার দোকান ভাঙচুর করে লাখ টাকা মূল্যের মালামালের ক্ষতি করেন সোহান। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা, বিভিন্ন সময়ে হল ক্যান্টিন, দোকানে ফাও খাওয়া ও হল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে হল ছাড়া করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সোহানের বর্তমান বয়স ৩২ এর কোঠায়। যা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে আসার অনুপযোগী।

সিলেট অঞ্চলের ছাত্রলীগ নেতা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদক আল আমিন রহমান ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক। ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল ছাত্রলীগ আয়োজিত পহেলা বৈশাখের কনসার্টে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসা দিবসে এক কনসার্ট আয়োজক কমিটির কাছে এক লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা ও চাঁদা না দেওয়ায় ওই কনসার্ট বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক তুহিন রেজা ছাত্রলীগের বর্ধিত কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। এসময় তিনি প্রায় ২০০ জনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদায়ন করেন যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিবির ও ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মাদক গ্রহণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাছাড়া, তুহিন ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের অংশের কমিটিতে অনেককেই টাকার বিনিময়ে পদায়ন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঢাবির সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর শিকদারের বিরুদ্ধে রয়েছে একগুচ্ছ অভিযোগ। হল ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার পর বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের মারধর ও হল থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের শুরুতে হলের সামনের পলাশীর এক ফলের দোকানদারের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। হল সংসদের কক্ষ নিজের দখলে নিয়ে তা ছাত্রলীগের কার্যালয়ে রূপান্তরিত করে তানভীর। এছাড়া, তানভীর ওই হল কমিটিতে চাঁদাবাজ, মাদকাসক্ত, ছাত্র নির্যাতনকারীদের পদায়ন করেন। চলতি বছরের শুরুতে ঢাবির আরেক হল শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের বর্তমান সভাপতি কামাল উদ্দিন রানার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই ওই হলের ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক কেএস-এর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ওই ওয়াইফাই কোম্পানি ভালো সার্ভিস দিতে পারতো না বলে নতুন ওয়াইফাই আনা হয়। সম্প্রতি ওই হলের নিয়োগ জালিয়াতির সাথেও তার জড়িত থাকার কথা ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়াও অনূর্ধ্ব ২৯ কিংবা ৩০ কোটার বাইরে রয়েছেন বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। এদের মধ্যে রয়েছে সহ-সভাপতি কামাল খান, ইয়াজ আল রিয়াদ ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান প্রমুখ।
ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ইনকিলাবকে বলেন, সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন, সৎচরিত্র, ছাত্র সমাজের মাঝে গ্রহণযোগ্য ও পারিবারিকভাবে আওয়ামী ব্যাকরাউন্ডের হবে এমন ছাত্র নেতাদেরই সম্মেলনের মাধ্যমে বাছাই করা হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন