শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯, ১২ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

সম্পাদকীয়

খেলা নিয়ে মারামারি-খুনোখুনি কাম্য নয়

| প্রকাশের সময় : ৩ ডিসেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

দেশে এখন বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে পছন্দের দলের সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা চলছে। ইতোমধ্যে গ্রুপ পর্বের খেলা প্রায় শেষের দিকে। নকআউট পর্ব শুরু হবে। গ্রুপ পর্ব থেকে কে কোন দল নকআউট পর্বে যাচ্ছে বা যাবে, কার কত পয়েন্ট, কত পয়েন্ট লাগবে, পছন্দের দল ভাল খেলছে কিনাÑএমন সব বিশ্লেষণ সমর্থকদের মধ্যে চলছে। বিশ্বকাপ নিয়ে সমর্থকের মধ্যে এতই উত্তেজনা যে, পছন্দের দলের পতাকা কে কত বড় করে তৈরি করতে পারে, এ নিয়েও হচ্ছে প্রতিযোগিতা। নিজ নিজ পছন্দের পতাকা বাসা-বাড়ির ছাদে ও আঙ্গিণায় টাঙ্গিয়ে রাখছে। বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের প্রতিযোগিতা বেশি দেখা যায়। দেশে এ দুটি দলের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। কে সেরা এবং কে চ্যাম্পিয়ন হবে, এ নিয়ে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক তর্কাতর্কি, বাগবিতণ্ডা হতে দেখা যায়। একদলের হারে আরেক দলের সমর্থকরা খুশি হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একদলের সমর্থকরা আরেক দলের সমর্থকদের খোঁচা দিয়ে পোস্ট দেয়। সেখানেও সাইবার তর্ক জুড়ে দেয়। বিশ্বকাপ এলেই দেশে তরুণ থেকে শুরু করে সবশ্রেণীর মানুষের মধ্যে এ ধরনের উন্মাদনা পরিলক্ষিত হয়। খেলা নিয়ে সমর্থন ও উত্তেজনা দোষের কিছু নয়। তবে তা যখন মারামারি এমনকি খুনোখুনির দিকে ধাবিত হয়, তখন তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা ও উন্মাদনা বিরাজ করছে। গত বিশ্বকাপে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে মারামারিতে বেশ কয়েকজন নিহতও হয়। খেলাকে খেলা হিসেবে না নিয়ে একেবারে মারামারি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উদ্বেগের। বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন উত্তেজনার মধ্যেই আরেকটি উদ্বেগজনক খবর পাওয়া গেছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে এক কলেজ শিক্ষার্থীকে কয়েক কিশোর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। গত বৃহ¯পতিবার রাত ৯টার দিকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের ধোপাখিলা গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি শুভরঞ্জন চাকমা। ফেনী মহিপাল সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী পাভেল ধোপাখিলা গ্রামের নানার বাড়িতে বেড়াতে যায়। সন্ধ্যার পর গ্রামের কয়েকজন তরুণের সঙ্গে সে ব্যাডমিন্টন খেলতে যায়। রাত ৯টার দিকে অন্তত ৮ কিশোর নিজেরা ব্যাডমিন্টন খেলবে জানিয়ে পাভেল ও তার সঙ্গীদের খেলার মাঠ থেকে উঠে যেতে বলে। তারা উঠে যেতে রাজি না হওয়ায় ওই কিশোরদের সঙ্গে পাভেল ও তার সঙ্গীদের বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে ওই কিশোররা পকেট ও কোমর থেকে ছুরি বের করে পাভেলকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত ও মারপিট করতে থাকে। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে খেলার মাঠে ফেলে পালিয়ে যায়। পাভেলকে বাঁচাতে গিয়ে আরো জন ৪ আহত হয়েছে। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক পাভেলকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা স্থানীয় কোনো খেলা হোক, তা নিয়ে দুই পক্ষের মারামারির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। খেলাকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটবে তা কল্পনাও করা যায় না। সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার লক্ষ্য নিয়ে উভয় পক্ষ খেলতে নামে। নিজেদের শারীরীক-মানসিক ও আত্মিক উন্নতির লক্ষ্যেই খেলাধুলা করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়রা যেমন বিনোদিত হয়, তেমনি উপভোগকারীরাও বিনোদিত হয়। বলা হয়ে থাকে, কিশোর, তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকাসক্তিসহ নানা অপরাধকর্ম থেকে দূরে রাখার অন্যতম উপায় হিসেবে কাজ করে খেলা। যেসব তরুণ খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে সুষ্ঠু মনমানসিকতা গড়ে উঠে। প্রযুক্তির এ যুগে মোবাইল, ল্যাপটপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তরুণ সমাজের বিরাট একটা অংশ খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গেছে। এছাড়া খেলার মাঠ কমে যাওয়াও এক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরে দিন দিন খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। ফলে কিশোর ও তরুণদের খেলার সুযোগ কমে গেছে। তারা ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে আসক্ত হয়ে অলস হয়ে পড়ছে। এর কুপ্রভাবে একশ্রেণীর কিশোর গ্যাংস্টার হয়ে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাং গড়ে তুলছে। সমাজের জন্য তারা আতংক ও নতুন উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে গ্যাংয়ের হাতে অনেক কিশোর প্রাণ হারিয়েছে। শুধু তাই নয়, তুচ্ছ ঘটনায়ও কিশোরদের মধ্যে মারামারি ও খুনের মতো ঘটনা ঘটে। সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজে এ ধরনের প্রবণতাকে মূল্যবোধের অবক্ষয়কে দায় করেছেন। আমাদের সন্তানরা কিভাবে ও কোন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, এ বিষয়টি এখন অনেকটা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। চৌদ্দগ্রামে ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়ে কিশোরদের মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছে, তা মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পরিবার ও সমাজের অভিভাবক শ্রেণির উদাসিনতার কারণেই ঘটেছে। ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে তর্কাতর্কি এবং মারামারির ঘটনা চলমান অবক্ষয়েরই ফল।
খেলাধুলা বা অন্য কোনো সামান্য ঘটনা নিয়ে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মারামারি এবং খুনের মতো ঘটনার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কারও সন্তানই নিরাপদ থাকবে না। সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি, সামাজিক বন্ধন ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। এ নিয়ে সমাজের অভিভাবক শ্রেণির সচেতন হওয়া সময়ের দাবী। সবার আগে পরিবারের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মিশছেÑএ বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সন্তান বিপথে গেলে তার দায় অভিভাবকদের ওপরই বর্তায় এবং এতে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। কিশোর ও তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সমাজের অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। কিশোর ও তরুণরা যাতে সব ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকে এজন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন