ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

নিবন্ধ

বহুরূপী শয়তানের কান্ডকারখানা ইমাম গাজ্জালির ৭৩ ফের্কা দর্শন

কে এস সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যেমন রয়েছে খোদাদ্রোহী ও মানবের মহাশত্রু অভিশপ্ত ইবলিস শয়তানের বিবরণ তেমনি রয়েছে তার প্ররোচণা, প্রতারণা, ভ-ামি, নষ্টামী, শয়তানি কুমন্ত্রণা ইত্যাদি সব ধরনের কুকর্ম, ঘৃণ্য কার্যকলাপ এবং অপতৎপরতার বিশাল ফিরিস্তি ও বিরাট তালিকা। ইবলিস শয়তানের দাস্তান-কাহিনী বলে লিখে কূলকিনারা পাওয়া কঠিন ব্যাপার। লিখিত ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত নমুনা রয়েছে। এ অশুভ অদৃশ্য শক্তি সদা-সর্বদা-সার্বক্ষণিকভাবে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করার ঘৃণ্য কাজে সক্রিয়-প্রয়াসী এবং অবিরাম তৎপর। তার অপকর্মগুলো মানুষের কাছে অতি সুন্দর ও সুশোভিতভাবে উপস্থাপন করতে তার জুড়ি নেই। তার সর্বনাশা তৎপরতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.) মানুষকে বারবার সতর্ক ও সাবধান করে দিয়েছেন। কিন্তু ওই দুষ্ট অপশক্তির কবলে মানুষকে প্রতিনিয়ত পড়তেই হয়।
ইবলিস শয়তানের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও প্রতারণার প্রথম শিকার হয়েছিলেন প্রথম মানবমানবী আদম-হাওয়া। অহংকারের পরিণতিতে সম্মানিত আজাজিল পরিণত হয় ইবলিস শয়তানে এবং বিতাড়িত হয়। অভিশপ্ত হয়। আরও বহু ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট উপাধি লাভ করে। শয়তানের আসল নাম ছিল আজাজিল। তার ভাগ্যে জোটে স্থায়ী লানত-অভিশাপ। আজাজিল হতে ইবলিসে পরিণত হলে তার আকার-অবয়ব এমনভাবে বিকৃত হয় যে, কোনো লোক তাকে দেখলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তার জান্নাতে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। ইবলিসে পরিণত হয়ে সে কত বড় ঘৃণ্য-পাপিষ্ট হয়ে যায় যে, বহু ধরনের শাস্তি তাকে ভোগ করতে হবে এবং সে জাহান্নামিদের খতিব হিসেবে স্থানলাভ করবে। ইবলিস শুরু থেকে বনি আদমকে গোমরাহ করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নবীদেরকেও সে ধোঁকা দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। সে নমরূদ, ফেরাউন, বনি ইসরাইলকে বিভ্রান্ত করে এবং বিভ্রান্ত হয়ে তারা ধ্বংস হয়।
ইবলিস হজরত ঈসা (আ.)-কে ধোঁকা দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে নাসারা-খিস্ট্রানদের কীভাবে গোমরাহ করে সে কাহিনীটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্ণিত আছে যে, একদিন ইবলিস হজরত ঈসা (আ.)-কে বলেন, আপনি মৃত ব্যক্তিদের জীবিত করার এবং অন্ধ-কুষ্ঠদের দৃষ্টিশক্তি দান ও সুস্থ করতে সক্ষম, খোদায়ী দাবি কেন করেন না? আমার সৈন্যরা এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। ঈসা (আ.) বলেন, এসব মোজেযা বা অলৌকিক ঘটনা আমার এখতিয়ারভুক্ত নয়, আল্লাহর কুদরতের কারিশমা। তুই আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যা, আমাকে গোমরাহ করতে এসেছিস। ইবলিস বলে, ঠিক আছে, আপনি আমার পরামর্শ গ্রহণ করছেন না তাতে আমার অসুবিধা নেই, আপনার কারণে আমি আপনার উম্মতকে গোমরাহ করে ছাড়ব, এসব লোকের মাধ্যমে আপনাকে আল্লাহর পুত্র, আপনার মাতাকে আল্লাহর স্ত্রী (নাউজুবিল্লাহ) এবং আপনাকে শূলীতে চড়াব।
মাওলানা আবদুল হাই সুরতী লিখিত আল বাছায়ের পুস্তকের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ঈসা (আ.)-কে শূলীতে চড়ানোর ঘটনাটি নি¤œরূপ:
ইবলিস বলল, নাসারাদের অন্তরে এ কথা ঢুকিয়ে দেই যে, হজরত ঈসা (আ.) বিনা পিতায় সৃষ্টি হয়েছে এবং তাঁর কাছ থেকে বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। যথাÑ মৃত ব্যক্তিদের জীবিত করা, চিড়িয়াদের সৃষ্টি করা। এসব অস্বাভাবিক শক্তির প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাস্তবিকই তিনি এমনযোগ্য যে, তাকে খোদার পুত্র অথবা তিন খোদার এক খোদা বলা যায়। আল্লাহ তাঁর কালামেপাকে বলেছেন, এগুলো তার ব্যক্তিগত কৃতকর্মের মোজেযা না বরং আল্লাহর হুকুমে প্রকাশ পেয়েছিল এবং কখনো এভাবে রদ করা হয়েছে যে, হজরত ঈসা (আ.)ও তো আদমের ন্যায় মাটি হতে পয়দা হয়েছিলেন। সুতরাং যদি বিনা পিতায় পয়দা হওয়া খোদা হওয়ার দলিল তাহলে হজরত আদমের খোদা হওয়াতে কোনো প্রশ্ন আসতে পারে না। আদম তো পিতামাতা ছাড়া সৃষ্ট।
প্রকৃত এক খোদা তিনিই যিনি ইবলিস উদ্ভাবিত খ্রিস্টান তত্ত্ববাদের অবসান ঘটালেন হজরত মারয়াম (আ.)-এর স্বাভাবিক মৃত্যু দান করে এবং তাঁর পুত্র নবী-রাসূল হজরত ঈসা (আ.) জীবিত আসমানে উঠিয়ে নিয়ে আর খ্রিস্টানরা মিথ্যাবাদী ইবলিসের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত ঈসা (আ.)-কে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে বলে অন্ধবিশ্বাসী হয়ে আছে। এক আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী : তাঁর উম্মত তিহাত্তর ফের্কায় বিভক্ত হয়ে পড়বে। তাদের মধ্যে একটি মাত্র ফের্কা নাজাতপ্রাপ্ত হবে বাকিরা সব জাহান্নামি হবে। হুজুর (সা.)-এর এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোহাদ্দেসীনেকেরাম তেহাত্তর ফের্কা সংখ্যা নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। হজরত শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভী ফের্কাগুলোর নাম-পরিচয় উল্লেখ করেছেন। হজরত ইমাম গাজ্জালি (র.)ও এ ব্যাপারে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি হাদিসটির স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা করেছেন ও বলেছেন যে, জিন্দিক বা নাস্তিকদের গোমরাহি ভ-ামির ওপর শয়তান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে থাকে এবং ওইসব গোমরাহরাই নাস্তিক শয়তানের ফাঁদে পড়ে।
হজরত ইমাম আহমদ গাজ্জালি (র.) তাঁর ‘মকতুবাতের’ এক পর্যায়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার উম্মত তেহাত্তর ফের্কায় (দলে) বিভক্ত হয়ে পড়বে। তাদের মধ্যে একটি মাত্র দল নাজাতপ্রাপ্ত হবে এবং বাকি সব দল ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এ বিরোধ বিভক্তির কারণ এই যে, প্রকৃতপক্ষে উম্মত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেÑ একদল উত্তম, দ্বিতীয় দল নিকৃষ্ট এবং তৃতীয় দল মধ্যম।
উত্তম দল হচ্ছে সুফিয়ায়ে কেরাম অর্থাৎ আউলিয়া-মাশায়েখ ও সুফী সাধক শ্রেণী, যারা নিজেদের জীবনের সমস্ত খায়েশ, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা আল্লাহর মর্জি-ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দিয়েছেন।
নিকৃষ্ট দল হচ্ছে ফাসেক অর্থাৎ প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত লোকেরা, যারা জুলুম-অত্যাচার করে, ব্যভিচার  করে এবং মনের কামনা-বাসনা লাগামহীন ছেড়ে দিয়ে আত্মপ্রতারণা-প্রবঞ্চনার শিকার এবং ভেবে থাকে যে, আল্লাহতায়ালা করিম ও রহিম দয়ালু মেহেরবান এবং এতেই আস্থাশীল থাকে।
মধ্যম দল তারা যারা সকলের মধ্যে আপসকামী ও তাকওয়া বা শুদ্ধ চরিত্রের অধিকারী।
এ তিন শ্রেণীর মধ্যে প্রতিটি চব্বিশ প্রকারের এসব শ্রেণীকে একত্রিত করলে সর্বমোট তেহাত্তর ফের্কা বা দল হবে। এত দলের আধিক্যের কারণ এই যে, উত্তম মানুষ সুফীসাধকদের প্রতি শয়তানের হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি হয় যারা কোনো প্রকারের পাপাকর্ম ও কামনা-বাসনার প্রতি আকৃষ্ট ছিল না। তাছাড়া শয়তান অভুক্তদের প্রতিও হিংসা প্রদর্শন করতে থাকে। সে মনে মনে বলে, যদি এসব লোক নিকৃষ্ট উম্মত তথাপি আশা আছে তারা নিজেদের অপমান ও অসম্মান সম্পর্কে অবহিত হবে। নিজেদের নিকৃষ্টতা দেখবে এবং তওবা করবে। আল্লাহতায়ালা তাদের তওবা কবুল করবেন। কেননা তিনি বলেছেন, আমি তওবাকারীদের নিশ্চয় ক্ষমাকারী। তাই এমন কোনো উপায় বের করা চাই যাতে এসব পবিত্র লোক পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং কলুষতায় জড়িয়ে পড়ে। এ জন্য শয়তান সুফিয়া ও ফাসেকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে চায়। অতএব সে সুফীদের নিকট এসে বলতে থাকে তোমরা আড়ালে থাক নিজেদের কাজে ও বিপদের সম্মুখীন করে কী লাভ! তোমাদের আনুগত্য আল্লাহর প্রয়োজন এবং তোমাদের পাপ দ্বারা তাঁর কী ক্ষতি! তোমরা কি দেখছ না আল্লাহ রহিম ও করিম এবং ক্ষমাকারী দয়ালু। শরয়ী তকলীফ অর্থাৎ বাধ্যবাধকতার উদ্দেশ্য মানব জাতির মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করা, যাতে তারা দুনিয়াতে অর্থ-সম্পদ ও মানসম্মান লাভের ফলে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হয়ে পড়ে। আনুগত্যের উদ্দেশ্য আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করা। এ নৈকট্য তোমরা লাভ করেছ। সুতরাং নিজেকে বিষণœ করা এবং জাগতিক কামনা-বাসনা হতে বিরত থাকা আহমকি ছাড়া আর কী হতে পারে।
যখন সুফী শ্রেণীর মধ্যে এসব শয়তানি প্ররোচনা ও বাতিল ধারণা প্রভাবিত হয়ে যায় এবং মন দুনিয়ার কামনা-বাসনার প্রতি সায় দিতে থাকে এবং এসব ধারণা অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তখন তারা পাপাচার উপত্যকায় পদার্পণ করে এবং নারী ও সন্তানাদিদের অপ্রয়োজনীয় মনে করতে থাকে অথচ তাদের পরনে থাকে সুফীদের পোশাক এবং মুখে আওড়াতে থাকে আকর্ষণীয় বুলি। তারা জানে না যে, আল্লাহতায়ালা করিম দয়ালু হলেও তিনি শাদীদুল ইকাব কঠিন শাস্তি দানকারীও। তাদের (সুফীদের) নৈকট্য পয়গাম্বরদের মর্যাদা ও নৈকট্যের চেয়ে বেশি নয় এবং সব নবী-রাসূলের মধ্যে কেউ আনুগত্য ও ইবাদতের দামান কখনো ত্যাগ করেননি এবং সন্দেহ সংশয়ে প্রতারিত হননি। শয়তান যখন সুফীদের অন্তরে বাতিলের বীজ বপন করে দেয় তখন তাদের আসল কাজ হতে তারা অবসর পায় এবং শয়তান ভালোভাবে উপলব্ধি করে যে, এখন তাদের সংশোধন আর কোনো কাজে আসিবে না। কেননা তাদের এসব অপকর্ম দুনিয়াবী কামনা-বাসনার কাছে বন্দী হয়ে গেছে। এতদসত্ত্বেও তারা সুফীদের পোশাক, বেশভূষা, চালচলন, আচার-আচরণ এবং জীবনযাপন ইত্যাদি অনুসরণ এবং তারা নিজেদের মনে করে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী। অতএব জানা থাকা উচিত, এরাই হচ্ছে নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোকদের অন্তর্ভুক্ত। এদের কোনো চিকিৎসা নেই, একমাত্র চিকিৎসা অনুকম্পা প্রদর্শন করা।
ইমাম গাজ্জালি (র.) তেহাত্তর ফের্কার যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইবলিস শয়তানের প্ররোচনায় কীভাবে ভ- সুফীদের উদ্ভব হয়েছে। ইমামের বর্ণিত বক্তব্যের আলোকে ভ- সুফীদের সঠিক পরিচয় লাভ করা সহজ। পক্ষান্তরে খাঁটি আল্লাহওয়ালা সুফী সাধকগণ ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য গণিমত ও সৌভাগ্যস্বরূপ। ইমাম গাজ্জালি (র.)-এর দৃষ্টিতে এরাই প্রথম শ্রেণীভুক্ত।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন