রোববার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

অভ্যন্তরীণ

গর্ভবতী মায়েদের ভরসা প্রশিক্ষিত ৬০ ধাত্রী

উল্লাপাড়ার ১৪ ইউনিয়নের বন্যাকবলিত এলাকা

| প্রকাশের সময় : ২১ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জয়নাল আবেদীন জয়, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) থেকে : প্রসবকালীন সমস্যায় চিকিৎসার অভাবে আর কোনো গর্ভবতী মায়ের অকাল মৃত্যু হবে না। জন্মের সময় পৃথিবীর আলো দেখার আগেই আর কোনো শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে না। প্রত্যন্ত ঘোর পল্লীর মাতৃ ও শিশু মৃত্যু রোধকল্পে প্রশিক্ষণধারী সবুজ অ্যাফ্রোন পরা ধাত্রী মায়েরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এখন মাতৃ ও শিশু মৃত্যু রোধ করছে। একই সাথে এই ধাত্রী মায়েরা গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন বিভিন্ন পরামর্শ দেয়াসহ যাবতীয় সেবা দিচ্ছে। এগুলো পেতে গর্ভবতী মায়েদের এখন আর শহরে হাসপাতালসহ চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে না। বাড়ির পাশে মুঠোফোনে ডাকলেই পাশে পাচ্ছে সবুজ অ্যাফ্রোনধারী প্রশিক্ষিত ধাত্রী মায়েদের। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম জনপদের ঘরে ঘরে গিয়ে এই ধাত্রী মায়েরা মেয়েদের প্রসবকালীন সেবাসহ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়। উপজেলা গভর্নন্স প্রজেক্ট (ইউজেডজিপি) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৬০ জন ধাত্রী নীরবে এমন সেবা পৌঁছে দিচ্ছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে গ্রামীণ নারীদের দোরগোড়ায়। জানা যায়, চলনবিল অধ্যুষিত বৃহৎ উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রাম বন্যাকবলিত। বন্যায় এ উপজেলার মাঠঘাট তলিয়ে একাকার হয়ে যায়। আবার শুকনো মৌসুমে রাস্তাঘাট শুকিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে উপজেলার বিপর্যস্ত কাঁচা রাস্তাঘাট দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উপজেলা শহরে আসা অত্যন্ত কষ্টকর। এসব এলাকার গর্ভবতী মাসহ অসুস্থ মানুষেরা বরাবরই চিকিৎসা বঞ্চিত হয়ে আসছে। উল্লাপাড়া উপজেলার এই প্রত্যন্ত গ্রামজনপদের শিশু মৃত্যু হ্রাস ও মহিলাদের নিরাপদ প্রসব নিশ্চিতকরণে ৬০ জন মহিলাকে ধাত্রী বিদ্যা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ইউজেডজিপি প্রকল্পের অর্থায়নে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মহিলাদের ১২ দিনব্যাপী হাতেকলমে এই ধাত্রী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। উল্লাপাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সিজারসহ মহিলাদের প্রসব কাজে নিয়োজিত প্রশিক্ষিতদের সহায়তায় এ প্রশিক্ষণ করায়। উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের চিকিৎসা বঞ্চিত এলাকার মেয়েদের ধাত্রী বিদ্যায় অগ্রাধিকার দেয়া হয়। উপজেলার বঙ্গালা ইউপির ৫ জন, উধুনিয়া ইউপির ১০ জন, বড়হর ইউপির ১৪ জন, মোহনপুর ইউপির ১৯ জন, দূগানগর ইউপির ২ জন, হাটিকুমরুল ইউপির ২ জন, বড়হর ইউপির ২ জন, পঞ্চোক্রোশী ইউপির ২ জন, সলপ ইউপির ৩ জন মহিলা ধাত্রী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ১২ দিনব্যাপী হাতেকলমে প্রশিক্ষণ শেষে সমাপনী দিনে এসব ধাত্রীকে সবুজ অ্যাফ্রোন পরিয়ে ধাত্রী কাজে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেয়া হয়। এসব ধাত্রী এখন উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ঘোর পল্লীতে তাৎক্ষণিক গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারিসহ গর্ভকালীন পরিচর্যার যাবতীয় পরামর্শ দিচ্ছে। সবুজ অ্যাফ্রোন পরে এই ধাত্রীরা গ্রামীণ জনপদে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দূতের ন্যায় কাজ করছে। গ্রাম জনপদের প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে এসব ধাত্রী মায়েকে মুঠোফোন নম্বর দেয়া আছে। তাদের কোনো বিপদ-আপদ হলে ফোন করলেই বাড়িতে হাজির হয়ে সমস্যর সমাধান দিচ্ছে ধাত্রীরা। শুধু গর্ভবতীর চিকিৎসাই নয়, শিশু, বয়োবিদ্ধসহ সবার জরুরি চিকিৎসার পরামর্শ দিচ্ছে তারা। জরুরি প্রয়োজনে এই ধাত্রীরা অসুস্থদের নিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসকসহ চিকিৎসালয়ে। ইউজেডজিপি প্রকল্পের অর্থায়নে মহিলাদের ধাত্রী প্রশিক্ষণ দেয়ায় উল্লাপাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার শিশু ও মাতৃ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হয়েছে। প্রসবকালীন সময়ে উল্লাপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় এখন আর মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ মহিলা এখন বাড়িতেই এসব ধাত্রীর কাছে নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি করাচ্ছে। এতে একদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো মোটা অংকের টাকার চিকিৎসা ব্যয় থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে এসব ধাত্রী পেয়েছে সম্মানজনক কর্মসংস্থান। উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন হাবীব, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (বর্তমান সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব) মোহাম্মদ শামীম আলম এবং উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসার মাসুমা খাতুন সফটি সময় উপযোগী জনহিতকর এই প্রকল্প গ্রহণ করে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেন। একই সাথে তারা এ উপজেলার চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের জন্য ২০ লাখ টাকার ফান্ড গড়েছেন। এই ফান্ডের টাকা ব্যাংকের রাখা হয়েছে। সেই টাকার লভ্যাংশ থেকে দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় অর্থ সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পটি এখন উল্লাপাড়ার গণমানুষের দারুণ কাজে লাগছে। ধাত্রী প্রশিক্ষণ নেয়া উপজেলার বড়পাঙ্গাসী ইউপির হাওড়া গ্রামের শিউলী খাতুনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক মহিলাকে নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন। একই সাথে সে এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের গর্ভকালীন সময়ে পরামর্শ দেয়াসহ তাদের যাবতীয় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। গর্ভবতী মহিলাদের শরীর চেকআপসহ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যেতে সহায়তা করছে। এতে তিনি সেবা গ্রহিতাদের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পেয়ে তার পরিবার চালাচ্ছেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন