ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০২ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ সফর ১৪৪১ হিজরী

সারা বাংলার খবর

আম-কাঁঠালের বাণিজ্যিক আবাদে ঝুঁকছেন কৃষক

প্রকাশের সময় : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নাছিম উল আলম : দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ উপক‚লজুড়ে গাছে গাছে ইতোমধ্যেই আমসহ নানা মৌসুমি ফলের মুকুলে ছেয়ে গেছে। ভাটি এলাকা বিধায় এ অঞ্চলে এসব মৌসুমি ফলের মুকুলও আসে কিছুটা বিলম্বে। তবে এখনো বাণিজ্যিকভাবে আম-কাঁঠালের বাণিজ্যিক চাষ না হলেও ক্রমে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ থেকে গৃহস্থ বাড়ি ও কৃষকগণ এসব মৌসুমি ফলের বাণিজ্যিক আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। উপরন্তু দেশের ৭১০ কিলোমিটার উপক‚লভাগজুড়ে গত কয়েক দশকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যে উপক‚লীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানেও কিছু মৌসুমি ফলের বাগান করা হয়েছে। তবে তার বাণিজ্যিক উৎপাদন এখনো শুরু হয়নি। ফলের মানের বিবেচনায় তা ততটা উন্নত নয়। উপরন্তু দক্ষিণাঞ্চলে মৌসুমি ফলের বাগান সৃষ্টিতে বন বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর-ডিএই ও কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট-বারীর কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নেই। এমনকি এ অঞ্চলে সরকারী এসব কৃষি এবং বন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মাঠ পর্যায়ে নার্সারীর স্বল্পতাও রয়েছে। ফলে ভাল জাত ও মানের ফলের চারা পর্যন্ত কৃষকের দোড় গোরায় পৌছান যাচ্ছে না। এমনকি এসব মৌসুমি ফলের আবাদ ও উৎপাদন প্রযুক্তি নিয়ে ডিএই’র কোন কারগরি সহায়তাও পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বছর কয়েক আগে বেসরকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘ব্রাক’ বরিশালে উন্নত ফলের নার্সারী করলেও তা বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩০ভাগই উপক‚লীয় এলাকায়। মোট জনসংখ্যার ২৮%-এর বসবাস ৭১০কিলোমিটার দীর্ঘ উপক‚লীয় এলাকা যুড়ে। এ অঞ্চলে সৃষ্ট বিশাল বনভ’মির একটি অংশজুড়ে নানা ফলদ গাছ থাকলেও তা খুব একটা পরিকল্পিত ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর নয়। তবে বন বিভাগ এবং কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের মতে এ অঞ্চলে আম-কাঠাল সহ দেশীয় সব ধরনের ফলদ গাছ-এর আবাদ ও সুমিষ্ট ফল উৎপাদনের উপযোগী। ২০০৩-০৪ সালে তৎকালীন সরকার ১ কোটি নারকেল চাড়া রোপণ কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। তার আওতায় বন বিভাগ, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারন অধিদফতর প্রায় ৬৫ লাখ নারকেল চাড়া বিতরন করে। যার অর্ধেকেরও বেশী উপক‚লীয় এলাকায় রোপন করা হয়। কিন্তু ঐসব নারকেল গাছ রোপন থেকে শুরু করে তার পরবর্তি পরিচর্যাও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি নির্ভর ছিল না। উপরন্তু গবাদী পশুর ক্ষুধার অন্ন হয়েও বিপুল সংখ্যক নারকেল গাছ সাবার হয়েছে। ফলে রোপিত চারার অর্ধেকও আর পরিপক্কতা পায়নি।
‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-বারি’র মতে আমাদের দেশের ৫ লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় সোয়া ২লাখ টন নানা জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে। স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিমানে বৈচিত্রের ফল আম অন্য অনেক যেকোন ফলের সাথেই তুলনাহীন। পাকা আমে প্রচুর পরিমানে ‘ভিটামিন-এ’ এবং খনিজ পদার্থ রয়েছে। এমনকি কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে আমে ‘ভিটামিন-এ’র পরিমাণ অন্য যেকোন ফলের চেয়ে বেশী।
তবে পিরোজপুরের নেসারাবাদ ও কাউখালী এবং বরিশালের বানরীপাড়াতে বাণিজ্যিকভাবে ইতোমধ্যে বিপল সংখ্যক নার্সারী গড়ে উঠেছে। ঐসব নার্সারী থেকে আম সহ বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছের চাড়া সারা দেশেই সরবরাহ হচ্ছে। এমনকি এসব নার্সারী ইতোমধ্যে দেশজুড়ে সুখ্যাতিও অর্জন করেছে। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে এখনো শুধুমাত্র কলা, আমড়া ও পেয়ারা ছাড়া অন্য কোন ফলের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে না। যদিও সাম্প্রতিককালে আম ও কাঠাল সহ আরো বিভিন্ন ফলজ গাছের আবাদ সম্প্রসারিত হচ্ছে। পিরোজপুরের সদর, কাউখালী ও নাজিরপুর উপজেলার কিছু স্থানে ‘মাল্টা’র মত উন্নতমানের ফলেরও আবাদ শুরু হয়েছে। কাজী পেয়রার আবাদও যথেষ্ঠ সম্প্রসারন ঘটেছে বরিশাল, ঝালকাঠী ও পিরোজপুরের কিছু কিছু এলাকায়। কিন্তু আম-কাঠালের ভাল জাত ও মানের চারার সংকট রয়েছে। সরকারী কোন নার্সারীতে এসব ফলের ভাল জাত ও মানের চারা এখনো খুব একটা সহজলভ্য নয়।
বাঙালীর কাছে আম একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল হিসেবে সুদূর অতীতকাল থেকেই সমাদৃত। রসালো ও সুমিষ্ট এ ফল-এর উৎপাদন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যথেষ্ঠ উন্নত হলেও দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকায় তার পরিকল্পিত আবাদ এখনো অনেক পেছনে। এমনকি বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর আম গাছ থাকলেও তা পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিক নয়। মানের দিক থেকেও উন্নত নয়। তবে সাম্প্রতিককালে পিরোজপুরের কাউখালী, মঠবাড়ীয়া, নেসারাবাদ, বরিশালের বানরীপাড়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও গলাচিপা ছাড়াও বরগুনার আমতলী এলাকায় সিমিতাকারে আমের বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি ইতোমধ্যে অনেকগুলো উচ্চ ফলণশীল ও সুমিষ্ট আমের জাত উদ্ভাবন করেছে। এরমধ্যে ‘বারি আমÑ১’ বা ‘মহানন্দা’ জাতের আম গাছে প্রতিবছরই নিয়মিত ফল দেয়। প্রতিটি গাছে ৭শ থেকে ৮শ পর্যন্ত আম উৎপাদন হয়ে থাকে। এছাড়া ‘বারী আম-২’ এবং ‘বারি আম-৩ বা আ¤্রপালি’ ইতোমধ্যে সারা দেশে যথেষ্ঠ সুখ্যাতী অর্জন করেছে। ‘বারি’ আরো বেশ কিছু উন্নত জাতের সুমিষ্ট আমের জাত উদ্ভাবন করেছে।
বরিশালে নগরীর উপকন্ঠে রহমতপুরে বারি’র একটি নার্সারী থাকলেও তা বেশীরভাগ মানুষেরই অজানা। পাশাপাশি নগরীর লাকুঠিয়া এলাকায় ডিএই’র একটি বিক্রয় কেন্দ্র থাকলেও সেখানে তেমন কোন চারা বা ফলের কলম পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্য জেলাগুলোর চিত্রও প্রায় একই। এমনকি ফলদ গাছ রোপন ও উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসাররন অধিদফÍর, বন অধিদফÍর ও বারি’র তরফ থেকেও তেমন কোন সহযোগীতা নেই বলে অভিযোগও রয়েছে। উন্নত ফলদ গাছের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে তেমন কোন উদ্যোগও নেই। অথচ গোটা দক্ষিণাঞ্চল যুড়েই এসব মৌসুমি ফল-এর উন্নত জাতের আবাদ সম্প্রসারন সহ তার ব্যাপক উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষিবীদদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে আধা নিবিড় পদ্ধতিতেও আম চাষ করতে পারলে এঅঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে অন্তত ৫০ হাজার টন আম ও সমপরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদন সম্ভব।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন