বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৯ শ্রাবন ১৪৩১, ১৭ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

শিক্ষাঙ্গন

ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নারী দিবসের ভাবনা

প্রকাশের সময় : ৭ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মেহেদি তারেক

বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। তাই নারী-পুরুষ সবার সম্মিলিত চেষ্টাই পারে আমাদের দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে। বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতির পিছনে বড় যে শক্তিটি কাজ করছে তা হলো আমাদের নারী শক্তি। দেশের নারীর এক বিশাল অংশ আজ গার্মেন্স শিল্পের সাথে জড়িত। যা গার্মেন্স সেক্টর তথা আমাদের দেশকে করেছে সমৃদ্ধ। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, গবেষণায়ও কিন্তু আজ নারীরা অনেক এগিয়া গেছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাই নারীদের দাবি যে এখন সমমর্যাদার সেকথা এখন সবার মুখেই।
১৮৫৭ সালে ৮ মার্চ নিউইর্য়াকের একটি সুই কারখানার নারী শ্রমিকেরা ১২ ঘণ্টা কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। পুলিশ তাদের ওপর চালায় নির্মম অত্যাচার। গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আন্দোলনরত নারী শ্রমিকদের। এরপর থেকে ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আর ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিবসটিকে নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। আর তখন থেকেই এই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে।
আগামীকাল ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে আড্ডা জমেছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বন্ধুরা মিলে ক্যান্টিনে, খেলার মাঠে, ঝালমুড়ির কিংবা ফুসকা সব আড্ডায় প্রাণ যেন “নারী দিবস”। তাই ক্লাসের ফাঁকে অফ প্রিয়ডে আড্ডা আর গল্পে নারী জাগরণ, লিঙ্গ বৈষম্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা থেকে নারীদের তথা সমাজকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় জানাচ্ছে এই তরুণ শিক্ষার্থীরা।
নারী দিবসের ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান ৭ম সেমিস্টারের ছাত্রী সাইমা, সানমুন ও মৌমিতা বলেন, বর্তমানে ২০ বছরের কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে স্কুলে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৬৪ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পর্যায়ে উত্তরণের হারও বেড়েছে। জাতীয় স্তরে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা সব বয়সী মেয়ের মধ্য থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ২৫ শতাংশ। মৌমিতা আরো বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা আশার কথা যে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
এ বিষয়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহানারা আক্তার বলেন, “সমাজব্যবস্থায় নারীকে আজ শুধু পণ্য নয় ‘পণ্যের পণ্য’ করা হয়েছে। এ অবস্থান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং সমাজের প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে”।
তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ দেশের নারী সমাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা এর আগে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই নারী ভিসি না থাকলেও বর্তমানে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে একজন নারীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী প্রক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কখনো কোনো নারীকে দেখা যায়নি এ তথ্যটিও তিনি জানান অনেকটা আক্ষেপের সুরে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সিলভী সুলতানা বলেন, নারীদের ক্যাম্পাসে আসা যাওয়ার পথে এখনো ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়। তিনি প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তারা যেন এটি বন্ধ করার ব্যাপারে আরো উদ্যোগী হয়।
আর্ন্তজাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী অধ্যয়ন বিভাগ একটি শোভাযাত্রা বের করবে। শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনের সামনে শেষ হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। নারী দিবস সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানিয়া বলেন, একদিন ঘটা করে দিবসটি পালন করলেই চলবে না। নারী উন্নয়নে আরও কাজ করতে হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্মি বলেন, দেশের সব বড় বড় ক্ষেত্রে আজ নারীরা সফলতার পরিচয় দিচ্ছে। ট্রেন, উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ও পরিচালনা করছে নারীরা। তাই এখন একজন নারীকে নারী বলে পাস কাটিয়ে চলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঢাবির শিক্ষার্থী আসমা আহমেদ বলেন, আজও একা মেয়েকে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে পথ চলতে হয়। এসব প্রতিকূলতা থেকে মুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশ আরও উন্নত হয়ে যেত। ইডেন কলেজের সবনম, সাম্মি, তানিয়া, মুক্তা, আশা সবাই এক সুরে বলে উঠেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা সবই এখন নারীরা করতে শুরু করেছে। তবে তারা আরও বলেন, এখনো নারী অগ্রগতিতে পিছিয়ে আছে, হাতেগোনা কয়েকজন নারী এগিয়ে এসেছেন। তবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ সব জায়গায় নারীরা পুরুষের তুলনায় বঞ্চিত। তারা ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে বঞ্চিত হয়। বঞ্চনা থেকে নারীরা কিভাবে বেরিয়ে আসতে পারে, সে জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহফুজা আক্তারের মতে, “লিঙ্গ সমতা সূচকে এ দেশের নারীদের অবস্থান এখন পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নারীদের তুলনায় উন্নত হয়েছে। কিন্তু অধিকারের সম্পূর্ণ সমতা আসেনি। চাকরির ক্ষেত্রে নারী সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত; নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের মধ্যে নারী-পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পান। যা একজন নারী হিসেবে আমি কখনই মেনে নিতে পারি না। সমাজের এসব অসঙ্গতি দূর করতে হলে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে”।
তবে নারীর সম-অধিকারের প্রশ্নটি কেবল নারী সমাজে অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বস্তুত, এতে রয়েছে নারী-পুরুষের মিলিত বিশ্বে সর্বজনীন প্রগতির প্রতিশ্রুতি। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ সমতা অর্জনের পথে পশ্চাৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এক বিরাট বাধা। শিক্ষায় নারীর আরও অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অবশ্যই পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্বাস করেন সবাই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন