বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে ভারত, ঘুমহীন সংখ্যালঘুরা

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৪ আগস্ট, ২০২২, ৮:৪০ পিএম

১৫ অগাস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস৷ ৭৫ বছরে কখনো বাবরি মসজিদ ইস্যু, কখনো গুজরাটের সহিংসতা, কখনো বা জ্ঞানবাপী বিতর্কে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷প্রশ্ন ওঠেছে, কেমন আছেন ভারতের সংখ্যালঘুরা? –এএফপি, ডয়েচে ভেলে

বারাণসীর গঙ্গাতীরের এক হিন্দু পুরোহিত সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিনিধির সঙ্গে নরম স্বরে কথা বলেছিলেন৷ কিন্তু স্বাধীন ভারতের ৭৫ বছর পরেও তার কথায় কোথাও যেন একটি হুমকি ছিল৷ তার মত, ধর্মই ভারতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হোক৷ জয়রাম মিশ্র নামের এই পুরোহিত বলেন, ‘‘সময়ের সঙ্গে অবশ্যই বদলাতে হবে৷ হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি হাতকে কেটে বাদ দেয়া উচিত আমাদের৷''

ভারতের এক দশমিক চার বিলিয়ন (এক বিলিয়ন অর্থাৎ ১০০ কোটি) জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দু৷ কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হয়, তখন এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ, বহু-সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র ছিল৷ কিন্তু এখন? এখন ডানপন্থিরা দেশটিকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছে এবং হিন্দুদের আধিপত্য আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে৷ এর ফলে ২১০ মিলিয়ন মুসলমান তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন৷

এই দাবিগুলি নাকি হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার মূল কারণ৷ তার সরকার সারা দেশে এই নীতি ও প্রকল্পগুলিকে সমর্থন করেছে৷ পবিত্র শহর বারাণসীতে একটি নতুন মন্দির করিডোর গড়ে তোলা হয়েছে, যা হিন্দুরাষ্ট্রের প্রবণতাকে আরো শক্তিশালী করছে৷ গান্ধী একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু ছিলেন৷ কিন্তু তিনি একটি লক্ষ্যে স্থির ছিলেন, সেটা হচ্ছে ভারতে ‘প্রত্যেক মানুষ সমমর্যাদা পাবে, তার ধর্ম যাই হোক না কেন'৷ তার কথায়, ‘‘রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হতে বাধ্য৷'' ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা এবং দেশভাগের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়৷ এক ধর্মান্ধ হিন্দুই বাপুজিকে হত্যা করেন৷ হত্যাকারী মনে করতেন, মুসলমানদের প্রতি গান্ধীজি খুব বেশিরকমের সহানুভূতিশীল৷

পুরোহিত মিশ্র বিশ্বাস করেন, গান্ধীজির সেই আদর্শ এখন অচল, পুরোনো৷ তিনি এএফপিকে বলেন, ‘‘গান্ধী বলতেন, কেউ যদি তোমার এক গালে চড় মারে, অন্য গালটি বাড়িয়ে দিতে হবে৷ অন্যান্য ধর্মের তুলনায় হিন্দুরা সাধারণত শান্তিপ্রিয় এবং ধীরস্থির৷ তারা একটি মশা মারতেও দ্বিধা করে৷ কিন্তু অন্য সম্প্রদায় এই মানসিকতার সুযোগ নিচ্ছে এবং আমরা এর পরিবর্তন না করলে তারা আমাদের উপর আধিপত্য করবে৷''

অনেকের কাছে এই পরিবর্তন শুরু হয়ে গিয়েছে৷ মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এ বিষয়ে জোর দিচ্ছে৷ আট বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন হিন্দুত্ব-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলিই এর প্রতীক৷ অযোধ্যায় একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে হিন্দু উগ্রবাদীরা তিন দশক আগে মোঘল আমলের একটি মসজিদ ধ্বংস করেছিল৷ সেইসময় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় দেশজুড়ে হাজারের বেশি লোকের মৃত্যু হয়৷ ডানপন্থিদের অত্যাশ্চর্য উত্থানের জন্য সেটি ছিল রাজনীতির বড়সড় অনুঘটক৷ মুম্বই উপকূলে এমন এক হিন্দু যোদ্ধার মূর্তি তৈরি হচ্ছে যিনি সফলভাবে ইসলামিক মুঘল সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন৷ সেই রাজা ছত্রপতি শিবাজির ২১০ মিটার লম্বা মূর্তি নির্মাণে ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হওয়ার কথা৷ এতেও বিজেপির সমর্থন রয়েছে৷

নয় মাস আগে মোদী নিজের নির্বাচনি এলাকা বারাণসীতে মহাসমারোহে একটি বিশাল মন্দির করিডোরের উদ্বোধন করেন৷ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল, তিনি গঙ্গায় ডুব দিয়ে পুণ্যস্নান করছেন৷ তিনি ২০১৪ সাল থেকে এই শহরের প্রতিনিধিত্ব করছেন৷ এখান থেকে প্রথম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেন৷ ৪৪ বছর বয়সি সৈয়দ ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘‘পরিকাঠামো, রাস্তা, নদীর তীর প্রকল্প এবং পরিচ্ছন্নতা, সবকিছুই বেশ ভালো৷'' তবে মুসলিম হাসপাতালের কর্মী বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে ‘সত্যিই চিন্তিত' তিনি৷ তার কথায়, ‘‘ধর্মকে কেন্দ্র করে অত্যধিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমাগত উত্তেজনা ও ঘৃণার অনুভূতি তৈরি হয়েছে৷''

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত বারাণসী৷ ঐ রাজ্যের জনসংখ্যা ব্রাজিলের চেয়েও বেশি৷ বিজেপির ‘হিন্দুত্ব' অ্যাজেন্ডার মূলে রয়েছে এই রাজ্য, এই শহর৷ মুঘল সম্রাট আকবর শহরের নাম পরিবর্তন করার ৪৫০ বছর পর বারাণসীর কাছে অবস্থিত এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করে প্রয়াগরাজ রাখা হয়েছে৷ কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর নির্বিচারে ধ্বংস করেছে কর্তৃপক্ষ৷ এদের অধিকাংশই মুসলিম৷ একে অনেকেই সংখ্যালঘুদের ভিন্নমত দমনের অসাংবিধানিক প্রচেষ্টা বলছেন৷ কর্ণাটকে গত বছর খ্রিস্টানদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ সেখানকার স্কুলে হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছে বিজেপি৷ সেইসময় মুসলিমরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন৷

উত্সাহিত হিন্দু গোষ্ঠীগুলি দাবি করেছে, ইসলামিক শাসনের সময় মন্দিরের উপরে মসজিদগুলি নির্মিত হয়েছিল৷ বারাণসী করিডোরের পাশে শতাব্দী প্রাচীন মসজিদ নিয়ে অযোধ্যার মতো ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে৷ ২০০২ সালে ৫৯ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনে আগুন দেয়া হয়েছিল৷ সেইসময়ে গুজরাটে কমপক্ষে হাজার জনকে কুপিয়ে, গুলি করে এবং পুড়িয়ে মারা হয়েছিল৷ মোদী সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন৷ হত্যাকাণ্ড রুখতে যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন না তিনি, এমন অভিযোগ উঠেছে বারবার৷

লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক হর্ষ ভি পন্ত বলছেন, বিজেপির উত্থান হয়েছে গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকেই৷ এই কংগ্রেস কয়েক দশক দেশ শাসন করেছে৷ নির্বাচনের সময় ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচারের উদ্দেশে দুটি প্রধান ধর্মের চরমপন্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি৷ অধ্যাপক হর্ষ ভি পন্ত বলেন, ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙচুর করার পর হিন্দু অনুভূতিকে ব্যবহার করেছে বিজেপি যা এখন ‘ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু'৷ তার কথায়, ‘‘প্রত্যেকের নিজস্ব একটা বক্তব্য আছে এ নিয়ে৷ ভাবে, আর কেউ কিছু জানেন না৷ তারা দুই থেকে তিন দশক ধরে এখানে রয়েছে৷ বিভেদ বাড়ছে ক্রমশ৷'' যারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে চায়, যেমন ডানপন্থি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সংগঠন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন একটি আশীর্বাদ৷

এক নেতা সুরেন্দ্র জৈন এএফপিকে বলেন, ‘‘আমরা একটি হিন্দুরাষ্ট্র, কারণ ভারতের পরিচয় হিন্দুত্ব দিয়েই৷'' ‘ধর্মনিরপেক্ষতার দ্বৈত মুখ' ভারতের ‘অস্তিত্বের জন্য একটি অভিশাপ এবং হুমকি হয়ে উঠেছে', বলেন তিনি৷ সুরেন্দ্র বলেন, ‘‘এর মানে এই নয় যে অন্য সবাইকে চলে যেতে হবে৷ তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারে কিন্তু ভারতের মূল চরিত্র সবসময় হিন্দুত্ব হতে হবে৷'' গুজরাটে তার শাসনামলে যে মেরুকরণের বক্তৃতা করেছিলেন মোদী, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তা মূলত এড়িয়ে যান তিনি৷ কিন্তু সমালোচকদের মতে তিনি প্রায়ই নিজের দলের উসকানিমূলক মন্তব্যগুলি উপেক্ষা করেন৷

তার ক্রিয়াকলাপে বোঝা যায়, তাদের স্পষ্টভাবে সমর্থন না করেই হিন্দুরাষ্ট্রের আহ্বানকে শক্তিশালী করছেন তিনি৷ এটি মুসলিমদের উদ্বেগের কারণ৷ বারাণসীর একটি মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক ৫২ বছরের নাসির জামাল খান বলেন, ‘‘আমার পূর্বপুরুষরা এখানে জন্মেছে, যদিও বিভেদের অনুভূতি বেড়ে চলেছে৷'' তিনি এমন একটি দিনের আশা করেন যখন ভারতের নির্বাচিত নেতারা ধর্ম নিয়ে কথা বলা বন্ধ করবেন৷ তিনি বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে পরিবারের পিতা হিসেবে দেখি৷ সন্তানদের সঙ্গে একজন বাবার আলাদা আচরণ করা উচিত নয়৷''

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Akkas Ahmed ১৪ আগস্ট, ২০২২, ৯:৫৩ পিএম says : 0
চিন্তা করবেন না। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা মিথ্যে নয়।অ বিশ্বাসীরা ধংস হবেই একদিন।
Total Reply(0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন