ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

আজও পূর্ণতা পায়নি সম্ভাবনাময় মংলা বন্দর

নৌযান ধর্মঘটে ক্ষতিতে বন্দরের ব্যবসায়ীরা

প্রকাশের সময় : ২২ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আবু হেনা মুক্তি : মংলা হবে আন্তর্জাতিক মানের বন্দর এমন প্রত্যাশা নিয়েই সরকার বাস্তবামুখী রোডম্যাপে অগ্রসর হলেও বাস্তবায়নে নেতিবাচকের যোজনায় তা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। গতকাল বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নৌপথে চুরি-ডাকাতি বন্ধ ও নদী খননসহ ১৫ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের নৌযান ধর্মঘট পালনের কারণে মংলা বন্দরে অবস্থানরত সকল দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে বন্দরের আমদানী-রপ্তানীকারকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।  এছাড়া ধর্মঘটের ফলে মংলা বন্দরের সাথে সারাদেশের নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। মংলা বন্দর ব্যবহারে যে সুযোগ রয়েছে তা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মংলা বন্দরকে ভারত নেপাল ভুটান ব্যবহার করলে তা অতীতের দৈন্যদশা ঝেড়ে ফেলে ফের চাঙ্গা হবে। সরকার সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে খুলনা থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত ৩ হাজার ৮শ’ ১ কোটি টাকা ব্যায়ে রেললাইন স্থাপনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এছাড়া বন্দরের জন্য ড্রেজিং প্রকল্পে ১শ’ কোটি টাকার কাজ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শীতা ও উদাসীনতায় সরকারের যেমন কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে তেমনি কার্যক্রমের সফলতায় আসছে ভাটা। বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মংলা বন্দরের জন্য একটি স্থায়ী ড্রেজার ক্রয় করে। ড্রেজারটি ৩ বছর যাবত মংলায় পড়ে থাকলেও তা কোন কাজে লাগানো হচ্ছে না। উপরন্তু ড্রেজার মেরামতের নামে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। খুলনা শিপইয়ার্ড থেকে ড্রেজারটি ড্রাইডকিং ও মেরামত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অডিট আপত্তিও উঠেছে। এ সম্পর্কে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, ড্রেজারটি সঠিক সময়ে কেনা হলেও পরবর্তীতে প্রকল্প ড্রেজার বন্দরে আসায় মংলা বন্দর ড্রেজারটি আর কাজে লাগানো হয়নি। আর অডিটে যে আপত্তি তোলা হয়েছে তা তাদের ব্যক্তি স্বার্থে। তবে উন্নয়ন ও নাগরিক নেতারা বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শীতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।  
সূত্রমতে, পদ্মাসেতু প্রকল্প গ্রহণের অন্যতম যৌক্তিকতা ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলার কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মংলা বন্দরের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। সেইক্ষেত্রে মংলা বন্দরকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, নিশ্চিতভাবেই পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের সাথে সাথেই মংলাবন্দর ব্যবহারে দেশী এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়তি অথচ  কাঙ্খিত এই চাপ গ্রহণের মত প্রস্তুতি এখনো মংলা বন্দরের আছে কি না সেটি এখন বড় প্রশ্ন। মংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানদ-ে প্রথম শ্রেণীর পোর্টে উন্নীত হতে হলে বন্দরের চ্যানেলের বছরব্যাপী নাব্যতার নিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে হবে। জেটির ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বন্দরের সার্ভিস দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক ও ডিজিটাল হতে হবে। পোর্টে ক্ষেত্রবিশেষে ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিস চালু করতে হবে। বন্দর অভ্যন্তরেসহ বহির্নোঙ্গরে আইন শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বন্দরের সাথে অভ্যন্তরীণ সড়ক, নৌ এবং আকাশপথ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আরও সহজ ও মসৃণ করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে খুলনা-মংলা রেললাইন এবং খুলনায় খানজাহান আলী বিমান বন্দর নির্মাণের প্রকল্প দ’ুটি বন্দরের সাথে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। খুলনা- মংলা রেল লাইন প্রকল্পটি এখন যদিও ভ্রুণ পর্যায়ে রয়েছে। যদিও প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাই ২০১৯ সালের মধ্যে যদি এই প্রকল্প দু‘টি বাস্তবায়নসহ বন্দরের অবকাঠামো ও  অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা যুগের চাহিদা এবং সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয় তাহলে পদ্মাসেতু এবং মংলা বন্দরের সুফল যুগপৎ বা সমান্তরালভাবে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের ভিত রচনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করবে যা’ পদ্মাসেতুর সম্ভাব্যতা জরিপের প্রধান বিষয় ছিল।
সূত্রমতে, দক্ষিণাঞ্চল ও বৃহত্তর খুলনার উপকুলীয় অঞ্চল এখন অনেকটা মংলা বন্দরের উন্নয়নের দিকে চেয়ে আছে। মংলা বন্দরকে ব্যবহারের জন্য নেপাল, ভারত, ভুটান অপেক্ষায় রয়েছে। তারা যাতে বন্দর ব্যবহার করতে পারে তার জন্য কাজ চলছে। তবে সরকারের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিয় চুক্তিকে মহল বিশেষ বাঁকা চোখে দেখছে। তাদের বক্তব্য ভারতের সাথে বন্দরকে নিয়ে যেসব চুক্তি ও সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে তা বন্দর তথা দেশের স্বকিয়তাকে বিকিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র মাত্র। এতে করে আমরা ভারত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারি। এমন আশংকা করে যারা বক্তব্য দিয়েছেন তাদেরকে সুবিধাবাদী ও পরশ্রীকাতর বলে আখ্যা দিয়েছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশাল সম্ভবনার আধার এই বন্দরের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবী। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে মংলা বন্দরের জৌলুস ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধ পরিকর। এ অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রসার ছাড়া অর্থনীতির মেরুদন্ড সোজা রাখা অত্যন্ত দুরূহ মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। উল্লেখ্য বিগত দিনে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা শ্রমিক অসন্তোষ, ঘন ঘন ধর্মঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব, সরকারগুলোর বিমাতাসুলভ আচারণে আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাইলফলক ডুবতে বসে। স্বাধীনতার পর খুলনা বাগেরহাটে যে রেল চালু ছিল তা গত একযুগ আগে বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে খুলনা মংলা রেলের এই চুক্তি বন্দরের ভবিষ্যত সকালকে আলোকিত করার ইঙ্গিত বহন করে। খুলনা মংলা রেললাইনের পথ নতুন করে নির্ধারন করা হয়েছে। খুলনার শিরোমনি কেবলঘাট, ভৈরব নদীর ওপর ব্রীজ, দিঘলিয়া, তেরখাদা, রূপসা, কাটাখালি হয়ে মংলা পর্যন্ত যাবে। শিরোমনিতে একটি ষ্টেশন তৈরী করা হবে। খুলনা মংলা লাইনের সমীক্ষা কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের অর্থনীতিতে যথেষ্ট ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান ইনকিলাবকে বলেন, ঢাকা থেকে চট্রগ্রামের চেয়ে মংলা বন্দরের দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরিকল্পনা গ্রহন ও বিগত সরকারগুলোর সদিচ্ছার অভাবে বন্দরটি নানামুখী সংকটে পড়ে। এখনই সময় দলমত নির্বিশেষে উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করা। আমাদের লক্ষ্য মংলা বন্দরের উন্নয়ন এবং খুলনাঞ্চলের অর্থনীতির ভাগ্যের পরিবর্তন।


 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন