ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ওয়ান স্টপ সার্ভিস কতদূর

পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেতে কর্মীদের গলদঘর্ম হাতছাড়া হচ্ছে সউদীর বিশাল শ্রমবাজার

শামসুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার দরুন সউদী আরবের বৃহৎ শ্রমবাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ডিজিটাল যুগেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেতে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের গলদঘর্ম পোহাতে হচ্ছে। বিদেশ গমনেচ্ছু পুরুষ-মহিলা কর্মীরা পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আবেদন জমা দিলে তা হাতে পেতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এ ছাড়া বকশিশ না দিলেও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ভাগ্যে জুটছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে হাজার হাজার সউদীর ভিসা ও মেডিক্যাল পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিদেশ গমনেচ্ছুদের বহির্গমন ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘ দিন বিলম্ব হওয়ায় সউদীর নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে গত দুই মাসে সউদীসহ মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানিতেও ভাটার টান শুরু হয়েছে। রেমিট্যান্স খাতেও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয়ের আভাস দিয়েছে বিশেষজ্ঞ মহল।

ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাস কর্তৃপক্ষ ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করে বিদেশ গমনেচ্ছুদের ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যুর জন্য একাধিকবার তাগিদ দিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী দ্রুত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যুর জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস স্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাব দিলেও এ ব্যাপারে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বের কোথাও একজন বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তির পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগে না। আধুনিক যুগে অধিকাংশ দেশেই মাত্র ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স হাতে পাচ্ছে বিদেশ গমনেচ্ছুরা। বায়রার ভারপ্রাপ্ত অর্থ সচিব মিজানুর রহমান এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ উগান্ডা ও ইথিওপিয়া বহির্গমন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাত্র সাত দিনের মধ্যে সউদী আরবে কর্মী সরবরাহ করছে। এতে সউদী নিয়োগকারীরা দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে ঝুঁকছে।

বায়রা নেতা বলেন, সউদী আরবের তাবুকস্থ গ্লোরি রিক্রুটমেন্ট কোম্পানিতে গত ৪ মাসে মাত্র ৪২ জন কর্মী পাঠাতে পেরেছি। কিন্তু ঐ কোম্পানি এ সময়ে উগান্ডা ও ইথিওপিয়া থেকে আড়াই শ’ কর্মী নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান বলেন, জনশক্তি রফতানিতে পদে পদে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় এ খাতটিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ঘুষ ছাড়া বিদেশগামী কর্মীরা প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি হতে পারে না। ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে গেলে কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বিড়ম্বনায় সউদী আরবে বর্তমানে মহিলা গৃহকর্মী প্রেরণের বিষয়টি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আগে প্রতি মাসে ৪-৫ হাজার মহিলা কর্মী সউদী যেত। এখন তা ৫০০-তে নেমে এসেছে। একজন বিদেশগামী কর্মীর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে অনৈতিকভাবে কমপক্ষে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

বিএমইটি’র সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি পুরুষ-মহিলা কর্মী কাজ করছে। ২০১৪-২০১৮ সাল পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৮২ হাজার ২ জন। এই সময়ে অর্জিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৭২.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত সউদী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো কর্মীর সংখ্যা যথাক্রমে এক লাখ ৮৮ হাজার ৭৪৭ এবং ১ হাজার ৬৫৮ জন। গত দুই মাসে সউদী আরবে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

এদিকে, সম্প্রতি ঢাকায় লেবার উইংয়ের শ্রম কল্যাণ সম্মেলনে বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমেদ বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যুতে দেড় থেকে দুই মাস বিলম্ব হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সউদী দূতাবাসে ভিসার জন্য কর্মীদের পাসপোর্ট জমা দিলে ২৪ ঘণ্টায় ভিসা দিচ্ছে।
কিন্তু কর্মীর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় সউদীর শ্রমবাজার হাতছাড়া হচ্ছে। সউদীসহ মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। বায়রার সভাপতি ওয়ান স্টপ সার্ভিস স্থাপনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যুর জোর দাবি জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ গত ২৫ জুন ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করে ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যুর উদ্যোগ নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত ২৫ জুলাই বিদেশগামীদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স-এর ওয়ান স্টপ সার্ভিস স্থাপনের প্রস্তাবটি দেখার জন্য আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রবাসী মন্ত্রী তার লিখিত প্রস্তাবে বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করা না হলে কর্মীদের পাসপোর্ট ভিসার জন্য জমা নিচ্ছে না সউদী দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীরা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহে নানাভাবে হয়রানির শিকার এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগস্ত হচ্ছে। এতে করে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। ফলে মূল্যবান রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। প্রবাসী মন্ত্রী বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স হাতে পেতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লেগে যাচ্ছে। সময়মতো পুলিশ ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সি যথাসময়ে কর্মী পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় ডিমান্ড লেটার বাতিলসহ আর্থিকভাবে সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে অভিবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রবাসী মন্ত্রী তার প্রস্তাবে সউদী গমনেচ্ছু কর্মীদের বিড়ম্বনা কমাতে এবং অভিবাসন খাতকে আরো গতিশীল করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস স্থাপনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যু করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অথবা বিএমইটিতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস স্থাপনের জন্য জোর অনুরোধ জানান।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. সেলিম রেজা গত ২৭ আগস্ট এক চিঠিতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইস্যু প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহানকে বলেন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহে কর্মীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহ সময়মতো কর্মী পাঠাতে ব্যর্থ হলে নিয়োগকর্তার ডিমান্ড বাতিলসহ বিভিন্ন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে বর্তমানে অভিবাসন খাতে নেতিবাচজক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে।

বিএমইটির ডিজি বলেন, বিদেশগামী কর্মীরা পাসপোর্ট গ্রহণকালে একবার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদপত্র প্রদান করেন। পুনরায় ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাসে ভিসা গ্রহণকালে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদপত্র দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা সমীচীন নয়। দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসা করা যেতে পারে বলেও বিএমইটির ডিজি উল্লেখ করেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন