ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ওয়ান্ডারার্সের নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবক লীগ

প্রতিদিন কোটি টাকার খেলা চলতো

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

ঢাকায় মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোতে সর্বপ্রথম জুয়ার আসর জমে ওঠে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে। ওই ক্লাবের সভাপতি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার। ক্যাসিনো চালু হওয়ার ২/৩ বছরের মাথায় ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে এক রাতে শত কোটি টাকার কারবার চলে। অথচ ক্যাসিনোর নেপথ্যে যুবলীগের নাম আসলেও রহস্যজনক কারণে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নাম আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতার প্রভাবে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এতোটাই প্রভাবশালী ছিল যে, ক্লাবের বয়রা জুয়ারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হাঁক ডাক ছাড়তো- ‘স্যার এখানে আসেন, এটা সরকারি ক্লাব, এখানে কোনো সমস্যা হবে না।’ মতিঝিল পাড়ার অন্যান্য ক্লাব যুবলীগ ঢাকা মহানগরের তত্বাবধানে চললেও ব্যতিক্রম ছিল ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। তারা কাউকে তোয়াক্কা করতো না। তবে ক্লাবের সভাপতি হলেও এখানে পরিচালিত ক্যাসিনোর সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা কাওছার। গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘সকলের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালনা কমিটির সভাপতি, এটা কোন মালিকানা নয়। পাশাপাশি জুয়া, ক্যাসিনো খেলা বা মালিকানা অথবা পরিচালনা এ ধরনের কোনো কিছুর সাথে আমি কোনদিনই ব্যক্তিগতভাবে জড়িত নই।

এদিক, প্রতি ক্লাবের ক্যাসিনোতে সুন্দরী তরুণী ছিল। তাদের কেউ কেউ ক্যাসিনোর বোর্ড চালানোতে প্রশিক্ষিত ছিল। জুয়ারীদের আকর্ষণের জন্য মধ্যরাতে তরুণীদেরকে দিয়ে বোর্ড চালানো হতো। দুটি শিফটে বিভক্ত হয়ে তরুণীরা ডিউটি করতো। মাসে বেতন ছিল কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা। এর বাইরে তরুণীরা জুয়ারীদের মনোরঞ্জনেও ব্যবহার হতো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বেচ্ছাসেব লীগ নেতা সভাপতির দায়িত্বে থাকার সময়ই ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে প্রথম ক্যাসিনো চালু করা হয়। কামরুল নামে একজনের পরামর্শে শহিদুল নামে এক ব্যবসায়ী ও তার আরও ৬ ভাই মিলে ওয়ান্ডারার্সে ক্যাসিনো চালু করে। কামরুল ওই ক্লাবের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। ক্যাসিনো চালু করার ২/৩ বছরের মধ্যেই তা জমে ওঠে। সরকারি কর্মকর্তা, রাজউকের প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, গণপূর্তের ঠিকাদার, হাউজিং ব্যবসায়ী, ভূমি ব্যবসায়ী, জনশক্তি রফতানিকারক থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ক্যাসিনোতে আসায় অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ান্ডারার্সের ক্যাসিনো জমজমাট হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় যারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ক্যাসিনোতে নিয়মিত যেতেন তারা আসতে শুরু করে ওয়ান্ডারার্সে। তারা টাকার পরিবর্তে ডলার নিয়ে বসতেন খেলতে। রাতভর কোটি টাকার খেলা জমতো।
সূত্র জানায়, মতিঝিলের ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো চালু হওয়ার পর অন্যান্য ক্লাবে বাকারা খেলার জন্য যখন ৫/৬টি টেবিল ছিল, ওয়ান্ডারার্সে তখন টেবিলের সংখ্যা ১৫/২০টি। এই ক্লাবে জুয়ারীর সংখ্যা এতোটাই বেশি ছিল যে, রাতে লাইন ধরে জুয়ারীদের চিপস সংগ্রহ করতে হতো। প্লাস্টিকের তৈরী ওই চিপস দিয়েই চলতো জুয়া খেলা। ১ লাখ, ৫০ হাজার, ২৫ হাজার, ১০ হাজার, ১ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন মানের চিপস পরে কাউন্টারে দিলে প্রকৃত টাকা মিলতো। এমনকি কোনো জুয়ারী যদি রাতে বাসায় ফিরতেন তখন তিনি টাকা বহন করা নিরাপদ মনে না করলে ক্যাশ কাউন্টারে টাকা ডিপোজিট হিসাবে জমা রাখতে পারতেন। পরদিন যে কোনো সময় সেই ডিপোজিট ফেরত নিতে পারতেন।

সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের ম্যানেজার কামরুল ক্যাসিনোর বদৌলতে এখন কমপক্ষে দুশ’ কোটি টাকার মালিক। ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার একাধিক ফ্ল্যাট। চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে। অথচ ক্যাসিনো চালু হওয়ার আগেও কামরুল ভাত খাওয়ার একটা টোকেনের জন্য ক্লাবে ক্লাবে ঘুরতেন। সূত্র জানায়, দিনে বা রাতে যারা ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতো তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হতো ক্লাবের পক্ষ থেকেই। এজন্য জুয়ারীদেরকে একটা টোকেন দেয়া হতো। কোনো কোনো জুয়ারী হেরে গিয়ে খাবার না খেয়েই চলে যেতেন। কামরুল ওই সব জুয়ারীর কাছে থেকে সেই খাবারের টোকেন চেয়ে নিতো। সেই কামরুলই এখন দুশ’ কোটি টাকার মালিক।

সূত্র জানায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার তত্বাবধানে পরিচালিত ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এতোটাই প্রভাবশালী ছিল যে, ক্লাবের পক্ষে বয়রা রাস্তায় দাঁড়িয়ে জুয়ারীদের ডাকতো। ক্লাবের সামনের গেইট ছাড়িয়ে তারা মতিঝিল থানার সামনে গিয়েও ডাকাডাকি করতো। যা দেখে অনেকেই সাহস করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ী জানান, ওয়ান্ডারার্সে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার নেশায় তিনি প্রায় ৪০ কোটি টাকা হারিয়েছেন। জুয়ার নেশায় বিক্রি করেছেন ৭টি ফ্ল্যাট। তিনি জানান, অন্যান্য ক্লাবের ক্যাসিনো মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের ভয়ে বন্ধ থাকতো। কিন্তু ওয়ান্ডারার্স ছিল ব্যতিক্রম। এখানকার ক্যাসিনো কখনও বন্ধ হতে দেখিনি। এ কারণে অনেকেই মনে করতো এটা ‘সরকারি’। যা ক্যাসিনো থেকেই প্রচার করা হতো।

এদিকে, অন্যান্য ক্যাসিনোর মতো ওয়ান্ডারার্সেও ছিল ১৫/১৬জন সুন্দরী তরুণী। যারা দুই শিফটে ক্যাসিনোতে ডিউটি করতো। তরুণীদের কাউকে কাউকে বাকারার ভিআইপি বোর্ডে বসানো হতো। বাকিরা থাকতো জুয়ারীদের আশেপাশে দাঁড়িয়ে। তারা মোটা অংক ধরার জন্য জুয়ারীদের উৎসাহিত করতো। কেউ কম অঙ্ক ধরলে তরুণীরা ভৎসনা করতো। বলতো, স্যার এতো কম ধরবেন, ভাবতেও পারিনি। ছোট পোষাক পরিহিত তরুণীরা সব সময় জুয়ারীদের সেবায় ব্যস্ত থাকতো। এর বাইরে এসব তরুণীরা জুয়ারীদের মনোরঞ্জনের জন্যই ব্যবহার হতো। তবে তা ক্যাসিনোর বাইরে, ছুটির সময়। আলাপকালে একজন বলেন, একেক জন তরুণীর মাসে আয় ছিল কমপক্ষে দুই লাখ টাকা। মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতন ছাড়াও তারা প্রতি রাতে মোটা অঙ্কের টিপস পেতো।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (10)
Mozammel Haque ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৫ এএম says : 0
ধন্যবাদ জানাচ্ছি Rab কে " এর পাশাপাশি বড় বড় কর্মকর্তারা জারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক,
Total Reply(0)
Amin Ulislam ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৫ এএম says : 0
কমিশনার স্যার আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ আগে বড়ো নেতা কর্মীদের ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি কার্যকারিতা না করতে পারেন তাহলে শুধু মুখে বলে লাভ নেই।
Total Reply(0)
Md Shahidul Islam ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৬ এএম says : 0
মতিঝিল এলাকার শিশুরাও জানে ক্লাবগুলোতে কি হয় আর আমাদের সোস্যাল মিডিয়া জানলো গতকাল যা এখন সব চ্যানেলের প্রচারিত গরম খবর!
Total Reply(0)
শেখ মোহাম্মদ শান্ত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৬ এএম says : 0
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার জন্য জুময়ার নামায পরে দোয়া করলাম যে ভাবে নিজ দলের অসৎ দুর্নীতি মার্কা লোকদের বিরুদ্ধে একশনে গেছেন সেটা যাতে অব্যহত থাকে এবং বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের সংস্হার দুর্নীতি গ্রস্হ লোকদের ও ভেজাল কারকদের আইনের আওতায় এনে সুন্দর একটি বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার তাওফিক যেন আল্লাহ দানকরেন। আল্লাহ আপনার সহায় হউক।।
Total Reply(0)
Nahar Minu ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৭ এএম says : 0
আশার আলো দেখছি।তবে পুলিশবাহিনীর মাঝে সততা ফিরে আসলে আরো ভালো কিছু আশা করা যাবে।
Total Reply(0)
Md Imam Uddin Chowdhury ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৭ এএম says : 0
সম্মানিত ডিএমপি কমিশনারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমি আসার সাথে সাথে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য আমি আশা করব ডিএমপি কমিশনার প্রত্যেকটা অবৈধ অন্যায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন যাতে করে বিএনপিতে কোন অন্যায় অবৈধ কাজ সমূলে উৎপাটিত হবে এবং এর দৃষ্টান্ত স্বরূপ সারা বাংলাদেশে অন্যায়-অবিচার বন্ধ হবে আশা করি উনি উনার দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন থাকবেন
Total Reply(0)
Abul Mansur ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৮ এএম says : 0
জামাত শিবির কোন জায়গায় মিটিং করলে তার খবর গোয়েন্দা সংস্থা রাখে,,৩ বছর যাবৎ যুবলীগ নেতা যে অবৈধ ব্যাবসা করে আসছে তার খবর কি গোয়েন্দা সংস্থা রাখেনা?
Total Reply(0)
Saleem Shkaks ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:২৮ এএম says : 0
তাহলে কি এতদিন পুলিশ বাহিনীর ঘোড়ার গাড়িতে ছিলো তিন বছর যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালাতে মিডিয়া প্রসাশন কিছুই জানেনা হাসকর।
Total Reply(0)
Mustafa Zahid ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১১:৩৫ এএম says : 0
মানুষ যখন জুয়া খেলে ভিখারি হয়, তখন মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে যায়, তারপর খুন, ডাকাতি এবং ধর্ষণ শুরু করে.
Total Reply(0)
Yourchoice51 ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৮:১৪ এএম says : 0
ক্যাসিনোতে অভিযান, যুবলীগ নেতা গ্রেফতার, ইত্যাদি ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছে আরেকটা ওয়ান/ইলেভেন সরকারের নাটক। ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে যারা ছিটকে পড়বেন, তারাই এ সাঁড়াশি অভিযানে ধরা খাবেন; অন্যরা বহাল তবিয়তেই থাকবেন; কোটি কোটি টাকা নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিতেও অনেকে সক্ষম হবেন। আর সরকারি বাহিনীর কথা বলবেন; এরা আরো ভালো আছেন; এদের বাড়ি-ঘরের খবর নিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। তবে আশার কথা এই যে, মহান সৃষ্টিকর্তাকে কেউ এড়াতে পারবেন না; এটা একশো ভাগ সত্য - বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। তাঁর বিচার অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো নেই এবং কখনোই কারো থাকবে না।
Total Reply(0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন