শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

ইসলামী জীবন

তাদের রমজান আমাদের রমজান

প্রকাশের সময় : ৫ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মাওলানা আবদুর রাজ্জাক

সময় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া একটি নেয়ামত। সময় মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু সময়কে একত্রিত করলে যা হয় সেটাই একজন মানুষের জীবন। নেক আমলের মাধ্যমে ব্যয় করা প্রতিটি মুহূর্ত জান্নাত লাভের পাথেয় আর বদ আমলে নষ্ট করা সময় যতই ক্ষুদ্র হোক তা জীবনেরই একটি অংশ। অতিবাহিত হয়ে যাওয়া সময় কখনও ফিরে আসে না। এ জন্য অনেকে সময়কে তুলনা করেন ¯্রােতের সঙ্গে। নদীর ¯্রােত যেমন ফিরে আসে না সময়ও ফিরে আসে না।
কবি ইকবাল মানুষের জীবনকে বাতাসের সাথে তুলনা করেছেন। “জীন্দেগী ইনসান কী এক দম কে সাওয়া কুছহী নাহী-দম হাওয়া কী মওয হায় রম সাওয়া কুছ্হী নাহী”।
মানুষের জীবন হলো সামান্য বাতাস ছাড়া কিছুই না। বাতাসের কোন স্থায়িত্ব নেই। সময় তথা জীবন বরফ গলার মত গলে যাচ্ছে। জলন্ত সিগারেটের ন্যায় নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। সময়কে ভালো কর্মের মাধ্যমে ব্যয় করার অর্থ হলো জীবনকে গড়া জান্নাতের জন্য। আর সৎকর্মহীন সময় নষ্ট করার অর্থ হলো জীবনকে ধ্বংস করা, জাহান্নামের জন্য তৈরি করা। মনে রাখবে সময় তথা জীবন কিন্তু নির্ধারিত। মহান আল্লাহ তাআ’লা বলেন “প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। যখন তাদের সেই নির্দিষ্ট সময় এসে পৌঁছে তখন তারা মুহূর্তকাল না পশ্চাদপদ হতে পারবে আর না অগ্রসর হতে পারবে” (সূরা -ইউনুস-৪৯)
মহান আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেন-“মানুষের হিসাব নিকাসের সময় আসন্ন। কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে ”। (সূরা আম্বিয়া-১)।
আবার আল্লাহ তাআ’লা এক স্থানকে অন্য স্থানের উপর, এক মানুষকে অন্য মানুষের উপর, এক সময়কে অন্য সময়ের উপর দান করেছেন শ্রেষ্ঠত্ব। মহান আল্লাহর ঘোষিত শ্রেষ্ঠ, মহিমান্বিত, বরকতপূর্ণ সময়ের একটি হলো রমজান মাস। এই শ্রেষ্ঠ সময় রমজানকে যথাযথভাবে হেফাজত ও সৎকর্মে অতিবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহর অনেক বান্দা অর্জন করেছেন শ্রেষ্ঠত্ব ও জান্নাতের পাথেয়। আবার আমরা অনেকে এই তাৎপর্যপূর্ণ সময়কে নষ্ট করে নাফরমান বান্দায় পরিণত হচ্ছি অনায়াসে। বক্ষমান নিবন্ধে বড়দের রমজান ও আমাদের রমজানের তুলনামূলক আলোকপাত করা হবে।
তাদের তিলাওয়াত
রমজান মাস কোরআন নাযিলের মাস। এ মাসে কোরআনে পাকের সঙ্গে প্রতিটি মুমিনের সর্বাধিক সম্পর্ক থাকার কথা। কোরআন বিশুদ্ধভাবে শেখা, কোরআনের তিলাওয়াত, তরজুমা, তাফসীর এবং কোরআন পাকের বিধান প্রতিষ্ঠা, দা’ওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে কোরআনি জীবন গঠনের দাবি ছিল অপরিহার্য। অন্তত কোরআনে কারীম তিলাওয়াতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং খালেকে কায়েনাত আল্লাহ তাআ’লার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের এটাই সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু আমরা ক’জনে যথাযথ কোরআনে পাকের এ দাবি আদায়ে সচেষ্ট হচ্ছি? প্রথম প্রথম কিছুটা তিলাওয়াত করলেও দু’ এক দিন যেতে না যেতই আমরা তিলাওয়াত ছেড়ে দেই। যারা আলেম নয় তারা ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। আর আলেম-উলামারা ডুবে যায় কালেকশন ইত্যাদিতে। কিন্তু আমাদের বড়রা কি করতেন সেটা লক্ষ্য করে দেখা দরকার।
ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর কথা প্রসিদ্ধ আছে তিনি রমজান মাসে ৬১ খতম তিলাওয়াত করতেন। আমাদের মুরব্বী হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.) তারাবিতে শোয়া পারা শোনাতেন, সাহরী পর্যন্ত তারজামাসহ তা পড়তেন চার-পাঁচ বার। সে অংশটুকু তাহাজ্জুদের সময় শোনাতেন দু’বার। সাহারী খাবার পর ফজরের নামাজের আগে এবং পরে ঘুমানোর আগে সে অংশটুকু একবার তিলাওয়াত করতেন। সকাল দশটার দিকে ঘুম থেকে ওঠে শীতের দিনে চাশতের নামাজে একবার এবং গরমের দিনে দু’বার তিলাওয়াত করতেন। জোহরের নামাজের পনের মিনিট আগে দেখে দেখে দু’বার তিলাওয়াত করতেন। জোহরের নামাজের ফরজের আগে সুন্নতে দু’বার, পরের সুন্নতে একবার তিলাওয়াত করতেন। জোহরের নামাজের পর বন্ধুদের কাউকে একবার শোনাতেন। আসরের নামাজের আগে দু’ বা একবার পড়তেন। আসরের পর বয়স্ক কাউকে একবার শোনাতেন। মাগরীবের নামাজের পর নফল নামাজে সে শোয়া পারা আরেক বার তিলাওয়াত করতেন। প্রতিদিনের আমল ছিল এভাবে। ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ত্রিশবারে ত্রিশ পারা তিলাওয়াতে জোর দিতেন। (শায়খ যাকারিয়্যা (রহ.) এ আত্মজীবনী হতে সংগৃহীত)
খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) বা’দে মাগরীব নফলে শোয়া পারা তিলাওয়াত করতেন। আর তাহাজ্জুদে করতেন সাধারণত দু’ পারা। তারাবী তো আমৃত্যু তিনি নিজেই পড়াতেন। কুতুবে আলম হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গোহী (রহ.) বাদে মাগরীব আওয়াবীনে দু’ পারা এবং তাহাজ্জুদসহ দৈনিক অর্ধ খতম কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আল্লামা কাসিম নানুতুবী (রহ.) ১২৭৭ হিজরীতে মক্কা-মদীনা সফর কালে রমজান মাসে কোরআন পাক মুখস্ত করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন। একবার তিনি এক রাকাতে সাতাশ পারা তিলাওয়াত করেছিলেন। হাজী এমদাদুল্লাহ মক্কী (রহ.) সারা রাত বিভিন্ন হাফেজদের থেকে পালাক্রমে নামাজে তিলাওয়াত শুনতেন। হযরত শাহ আবদুর রহীম রায়পুরী (রহ.) হাফেজে কোরআন ছিলেন। প্রায় সারা রাত কোরআন তিলাওয়াত করতেন। চব্বিশ ঘণ্টায় তিনি শুধু এক ঘণ্টা ঘুমাতেন। শায়খুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী (রহ.) হাফেজ ডেকে নামাজে সারা রাত কোরআন শরীফ শুনতেন। তারাবীতে কখনও ছয় পারা, কখনও দশ পারা পড়া হতো। শায়খুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) বাদে আসর দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষক হাফেজ-মাওলানা আবদুল জলিল (রহ.)-এর সেঙ্গ শোয়া পারা দাওর করতেন অর্থাৎ পরস্পর শোনাতেন। হযরত মাওলানা ইয়াহইয়া (রহ.) রমজান মাসে দৈনিক চল্লিশ পারা তিলাওয়াত করতেন। শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)-এর দাদিজানও কোরআন কারীমের হাফেজ ছিলেন। সুন্দর মুখস্ত ছিল তার। ঘর-গৃহস্থালীর সমস্ত কাজ-কর্ম করার পরও প্রতিদিন তিনি এক মঞ্জিল তিলাওয়াত করতেন।
তাদের ইফতার-সাহারী
আমরা সাধারণ ইফতারে খেজুর, শরবত, সেমাই, চনা, মুড়ি, বেগুনি, পেয়াজু, জিলাপি, নানারকম ফল-ফলাদি, খেয়ে থাকি এবং এত বেশি পরিমাণে খেয়ে থাকি যা সারা দিনের সম্পূরণ হয়ে যায়। কেউ কেউ তারাবীহ এর আগে ঘুমিয়ে পড়ি। আবার অনেকে তারাবী পড়তে কষ্ট অনুভব করি। কিন্তু আমাদের বড়রা ইফতারিতে খুব বেশি খেতেন না। তাদের অনেকেই খেজুর এবং যমযমের পানি দ্বারা ইফতার করাকে বেশি ভালবাসতেন। হযরত খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) ইফতারিতে খেজুর এবং যমযমের পানিকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। তার ইফতার এবং মাগরিবের নামাজের দশ মিনিট ব্যবধান হত। তিনি মাদরাসায় ইফতার করতেন। তার সাথে খাদেম এবং মেহমানও ইফতার করতো।
হযরত রশীদ আহমদ গঙ্গোহী (রহ.) ইফতার-সাহারী সব মিলে সারা রমজান মাসে পাঁচ সেরের বেশি খেতেন না। শাহ আবদুর রহীম রায়পুরী (রহ.)-এর ইফতার ও সাহরী উভয়ই মিলে খোরাক ছিল দু’কাপ চা এবং একটি বা অর্ধেক চাপাতি রুটি। হযরত শাইখুল হিন্দের সাহরীতে জর্দ্দার ব্যবস্থা করা হতো। সাহারানপুরী হযরতের সাহরীতে দুধ ইত্যাদির বিশেষ কোন গুরুত্ব দেয়া হত না। মাঝে মাঝে পোলাও পাক করা হতো। পায়েশ হাদিয়া আসলে তিনি এক চামচ বা আধা চামচ খেতেন।
হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) ইফতার মাদরাসায় মেহমানদের সাথেই করতেন। আযান সময় মত হতো। ধীরে সুস্থে ইফতার করতেন। শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী (রহ.)-এর দস্তরখানে ইফতারীতে খেজুর, যমযম, নাশপাতি, আনারস, সাগরকলা, পেয়ারা, আম, বছরী খেজুর, ডাব, পেঁপে, জর্দ্দা ও সিদ্ধ ডিম থাকতো। কিন্তু তার ইফতার ছিল সংক্ষিপ্ত। তিনি সামান্য কিছুই গ্রহণ করতেন। তার দস্তরখানে ইফতারের সময় আনন্দের জোয়ার বয়ে যেতো কিন্তু তিনি ভাবনার সাগরে ডুবে থাকতেন। হযরত মাওলানা ইয়াহইয়া (রহ.)-এর সাহরীতে দুধ ইত্যাদির কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন