ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ চৈত্র ১৪২৭, ২৯ শাবান ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

জাতীয় সংসদের মূল নকশা পাচ্ছে সরকার

প্রকাশের সময় : ১১ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

উচ্ছেদ জিয়ার কবরসহ অতিরিক্ত স্থাপনা : সচিবালয় স্থানান্তর প্রক্রিয়াও শুরু হবে
আজিবুল হক পার্থ : অনেক দেন-দরবার শেষে জাতীয় সংসদের স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত মূল নকশা পাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই নকশা হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে চুক্তিকারী প্রতিষ্ঠান। মূল নকশা পাওয়া গেলে লাই আই কানের নকশাতে ছিল না এমন সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে মূল ভবনের সাথে লাগিয়ে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর হবে সচিবালয়। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ সংসদ ভবন এলাকার সব কবর সরিয়ে ফেলা হতে পারে।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ ভবনের চার পাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ নিয়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংসদ ভবনের মূল নকশা আনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর লুই কানের প্রতিষ্ঠান ডেভিড অ্যান্ড উইজডমের সঙ্গে  যোগাযোগ শুরু করে স্থাপত্য অধিদপ্তর।
জানা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের নকশা স্থাপত্য অধিদপ্তর সংশোধন করেছে। কারণ, ইতোমধ্যে পূর্বের জমির পরিমাণ ১০ একর কমে গেছে। ওই জমিতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এখন ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ভাঙতে হবে অথবা জিয়াউর রহমানের মাজার সরাতে হবে। মূল নকশার অপেক্ষায় প্রকল্পটি স্থগিত রাখা হয়।
লুই কানের নকশাগুলো পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচারাল আর্কাইভে থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে  সেখানেও যোগাযোগ করা হয়। ইতোমধ্যে সংসদ ভবনের অঙ্কিত বর্ণনামূলক তালিকা (ড্রয়িং ইনভেনটরি লিস্ট) যুক্তরাষ্ট্র  থেকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এসেছে বলে গত জানুয়ারিতে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন।  
এরপর গত মার্চে এক সংবাদ সম্মেলন করে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে নকশার বিষয়ে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরে গত মাসে জাতীয় সংসদ ভবন ও তার আশপাশ এলাকার ১১৫টি ‘আনবিল্ড’ নকশা ও ৮৫৩টি নকশার কপি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার আর্কিটেকচারাল আর্কাইভ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। সরকারের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরে এই চুক্তি হয়।
এদিকে বর্তমানে সংসদ এলাকায় নকশাবহির্ভূত চন্দ্রিমা উদ্যানে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর ছাড়াও সংসদ ভবনের দক্ষিণ চত্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় প্রায় পাঁচ বিঘার জায়গার ওপর অবস্থিত জাতীয় কবরস্থানে আরো সাতজনের কবর রয়েছে। তারা হলেন- সাবেক  প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খান। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে এই সাতজনকে এখানে কবর দেয়া হয়। এছাড়া গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও সংসদ এলাকায় মূল নকশার বাইরে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের জন্য বাসভবন বানানো হয়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তখন ভবন দু’টি তৈরি হয়। এ সংক্রান্ত একটি মামলা এখনো বিচারাধীন।
জানা গেছে, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সে সময় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমানের কবরকে কেন্দ্র করে চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে জিয়া উদ্যান করে এবং এখানে সুদৃশ্য একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করে। এছাড়াও কবরের কাছে যাওয়ার জন্য স্থাপন করে একটি আকর্ষণীয় বেইলি ব্রিজ। তবে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ জিয়া উদ্যানকে ফিরিয়ে দেয় তার আগের পরিচয় চন্দ্রিমা উদ্যানে। ক্রিসেন্ট লেকের ওপর থেকে বেইলি ব্রিজটিও সরিয়ে  দেয়া হয়। পরে আবার বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেখানে কংক্রিটের ঝুলন্ত সেতু নির্মাণসহ একটি কমপ্লেক্স গড়ে তোলে। কমপ্লেক্সটির চার দিকে থাকা চারটি প্রবেশপথের শুরু বা শেষ প্রান্তে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র ও মসজিদসহ চারটি স্থাপনা।
এদিকে মূল নকশাটি জাতীয় সংসদের পাশেই সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রণীত প্রকল্পটি লুই আই কানের নকশা মোতাবেক তৈরি করা হয়। পরে লুই আই কানের মূল নকশা বাংলাদেশে না থাকায় প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠায়। মূল কপি পাওয়ার পর লুই আই কানের নকশা অপরিবর্তিত রেখে পরিকল্পনা তৈরি করে একনেকে আবার উত্থাপন করতে নির্দেশ দেয়া হয়।
সূত্র জানিয়েছে, নগরীর আব্দুল গনি রোডের বর্তমান সচিবালয় কমপ্লেক্সে সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভুক্ত অনেক দপ্তর কমপ্লেক্সের বাইরে। বর্তমানে বাংলাদেশ সচিবালয় কমপ্লেক্স তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের সময় নির্মিত, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সব টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে মেটানো হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৩২ একর জায়গায় চারটি ব্লকে ভাগ করে জাতীয় সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। দু’টি বড় ব্লকে ৩২টি বড় মন্ত্রণালয় ও দু’টি ছোট ব্লকে ১৬টি ছোট মন্ত্রণালয় স্থানান্তর করা হবে। প্রকল্পের আওতায় অডিটোরিয়াম, সম্মেলন কেন্দ্র, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, মসজিদ, কার পার্কিং ইত্যাদিও থাকবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন