ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

ইসলামী জীবন

রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ : ইবাদত একমাত্র আল্লাহর

মুহাম্মাদ নাজীদ সালমান | প্রকাশের সময় : ২ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০৫ এএম

এবং আমি ইবরাহীমকে পাঠালাম, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, আল্লাহর ইবাদত কর ও তাঁকে ভয় কর। এটাই তোমাদের পক্ষে শ্রেয়। যদি তোমরা সমঝদারির পরিচয় দাও। তোমরা যা কর তা তো কেবল এই যে, মূর্তিপূজা কর ও মিথ্যা রচনা কর। নিশ্চিত জেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত কর তারা তোমাদেরকে রিযিক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং আল্লাহর কাছে রিযিক সন্ধান কর, তাঁর ইবাদত ও তাঁর শোকরগোযারি কর। তাঁরই কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।-সূরা আনকাবুত : ১৬-১৭
আলোচনা : এ সূরাটি শুরু হয়েছে দ্বীন ও ঈমানের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্ত্ততি শিক্ষাদানের মাধ্যমে। সাথে সাথে এই সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, যারা এগুলো সহ্য করে দ্বীনের উপর টিকে থাকবে তারাই প্রকৃত মুমিন। সূরাটিতে তাওহীদ, রিসালত ও আখেরাত সম্পর্কে নবী ও রাসূলগণের দাওয়াত বর্ণনা করা হয়েছে। উপরের আয়াতগুলোতে আছে ইবরাহীম আ.-এর দাওয়াতের বিবরণ। তিনি তার কওমকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। যুগে যুগে নবী ও রাসূলের দাওয়াত ছিল এমনই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, তাওহীদকে গ্রহণ করাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমাদের কিছুমাত্র জ্ঞানবুদ্ধি থাকে।
তাওহীদ ও ইবাদত: কোনো সত্তাকে গায়বীভাবে ভালোমন্দের মালিক এবং সকল হাজত পুরা করার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করে তার সামনে নিজের নিতান্ত হীনতা ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশের জন্য, তাকে রাজি-খুশি করার জন্য এবং তার নৈকট্য অর্জনের জন্য যেসব উপাসনামূলক কাজ করা হয় তাকেই ইবাদত বলে। যেমন-নামায, সদকা, রোযা, হজ্ব, নযর-মান্নত ইত্যাদি। ইবাদত একান্তভাবে আল্লাহ তাআলার অধিকার। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে এই আচরণ করে তবে সে নিঃসন্দেহে মুশরিক।
তাওহীদের মূল কথা হল, আল্লাহ তাআলাকে তাঁর যাত ও সিফাতে (সত্তা ও গুণাবলিতে) এক ও অদ্বিতীয় বলে মেনে নেওয়া এবং তার কোনো শরীক ও সমকক্ষ নেই তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাস রাখা যে, ইবাদত লাভের উপযুক্ত একমাত্র তিনি, সকল পশুপ্রাণীর সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতাও তিনি। এগুলোর কোনোটাতেই তাঁর কোনো শরীক নেই।
তাকওয়া ও খোদাভীতি: এরপর তাকওয়ার উল্লেখ হয়েছে। এ শব্দটি ব্যাপক অর্থ ও মর্ম ধারণ করে। তাকওয়ার মূল বক্তব্য হল, আল্লাহ তাআলার ভয়ে সকল গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। তাকওয়ার প্রথম ধাপ, জঘণ্যতম গুনাহ শিরক থেকে নিজেকে পাকসাফ রাখা। তাকওয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার অপছন্দীয় কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে। তাকওয়ার দ্বারা বান্দা আল্লাহর পছন্দনীয় আমল করতে পারে। তাকওয়াই পারে বান্দাকে নফস ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ রাখতে। পারে তার মানবীয় গুণগুলো জাগিয়ে তুলতে এবং পূর্ণাঙ্গ মানবে পরিণত করতে।
পৌত্তলিকতার অসারতা: এরপর ইবরাহীম আ. দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পৌত্তলিকতার অসারতা তুলে ধরেছেন। নিজ হাতে গড়া এ মূর্তি, যার কল্যাণ-অকল্যাণের কোনো ক্ষমতা নেই, কেন তোমরা নিজেদেরকে তার সামনে অবনত করছ? কেন তোমরা এই মিথ্যা রচনা করছ যে, এই সকল মূর্তি তোমাদের ইবাদত ও উপাসনা পাওয়ার যোগ্য। তোমাদের কর্তব্য এক আল্লাহর ইবাদত করা, সকল শিরক ও শরীককে বর্জন করা। কেননা, তিনিই তোমাদেরকে রিযিক দেন, তিনিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং শুষ্ক জমিনকে ফল-ফসলে ভরে দেন।
কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ শস্য বীজ ও আটি বিদীর্ণকারী। তিনি প্রাণহীন বস্তু থেকে প্রাণবান বস্ত্ত নির্গত করেন এবং তিনিই প্রাণবান বস্ত্ত থেকে নিষ্প্রাণ বস্ত্তর নির্গতকারী। হে মানুষ! তিনিই আল্লাহ। সুতরাং তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তিনিই সেই সত্তা, যার হুকুমে ভোর হয়। তিনিই রাতকে বানিয়েছেন বিশ্রামের সময় এবং সূর্য ও চন্দ্রকে করেছেন এক হিসাবের অনুবর্তী। এই সমস্ত সেই সত্তার পরিকল্পনা, যার ক্ষমতাও পরিপূর্ণ, জ্ঞানও পরিপূর্ণ। তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন, যাতে তার মাধ্যমে তোমরা স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ জানতে পার। একেক করে সমস্ত নির্দেশনা স্পষ্ট করে দিয়েছি সেই সকল লোকের জন্য, যারা জ্ঞানকে কাজে লাগায়। তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সকলকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। অতপর প্রত্যেকের রয়েছে এক অবস্থানস্থল ও এক আমানত রাখার স্থান। আমি একেক করে সমস্ত নিদর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছি সেই সকল লোকের জন্য, যারা বুঝ-সমঝকে কাজে লাগায়। আর আল্লাহ তিনিই, যিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। তারপর তা দ্বারা আমি সর্বপ্রকার উদ্ভিদের চারা উদগত করেছি। তারপর তা দ্বারা সবুজ গাছপালা জন্মিয়েছি, যা থেকে আমি থরে থরে বিন্যস্ত শস্যদানা উৎপন্ন করি এবং খেজুর গাছের চুমরি থেকে (ফল-ভারে) ঝুলন্ত কাঁদি নির্গত করি এবং আমি আঙ্গুর বাগান উদগত করেছি এবং যায়তুন ও আনারও। তার একটি অন্যটির সদৃশ ও বিসদৃশ। যখন সে বৃক্ষ ফল দেয়, তখন তার ফলের প্রতি ও তার পাকার অবস্থার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য কর। এসবের মধ্যে সেই সব লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা ঈমান আনে।-সূরা আনআম : ৯৫-৯৯
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, অতপর মানুষ তার খাদ্যকেই একটু লক্ষ্য করুক। আমি উপর থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। তারপর ভূমিকে বিস্ময়করভাবে বিদীর্ণ করেছি। তারপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সব্জি, যায়তুন, খেজুর, নিবিড় ঘন বাগান, ফলমূল ও ঘাসপাতা। -সূরা আবাসা : ২৪-৩২
এতসব নেয়ামতের পরও যদি মানুষ ভুলে যায় আল্লাহ তাআলাকে তবে এর চেয়ে বড় নাশোকরি আর কী হতে পারে? তবে আল্লাহ তাআলা তো রহীম, চির দয়াময়। তাই তিনি সতর্ক করেছেন এবং তরীকা বাতলে দিয়েছেন। যেমন সূরা আনআমে ইরশাদ হয়েছে, লোকেরা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছে। অথচ আল্লাহই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তারা অজ্ঞতাবশত তার জন্য পুত্র-কন্যা গড়ে নিয়েছে। অথচ তারা আল্লাহ সম্পর্কে যা কিছু বলে তিনি তা থেকে পবিত্র ও বহু উর্ধ্বে। তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা। তার কোনো সন্তান হবে কী করে। যখন তার কোনো স্ত্রী নেই? তিনিই সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সকল বস্তু সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন।-সূরা আনআম : ১০০-১০২
মুশরিক ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও কর্মের অসারতা ঘোষণা করে কোরআন মজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদকে ডাকে যে সম্পর্কে তার কাছে কোনো রকম দলিলপ্রমাণ নেই তার হিসাব তার প্রতিপালকের নিকট আছে। নিশ্চিত জেন, কাফেরগণ সফলকাম হতে পারে না।-সূরা মুমিনুন : ১১৭
আরো বলা হয়েছে, এদের স্বরূপ এর বেশি কিছু নয় যে, এগুলো কতক নামমাত্র, যা তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা রেখেছ। আল্লাহ এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। প্রকৃতপক্ষে তারা (অর্থাৎ মুশরিকরা) কেবল ধারণা এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। অথচ তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের কাছে এসে গেছে পথ-নির্দেশ।-সূরা নাজম : ২৩
কিন্তু তারা রহমানের পথ-নির্দেশ অনুসরণ না করে করে শয়তানের অনুসরণ। অথচ শয়তান মানুষের সর্বনিকৃষ্ট দুশমন। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে সতর্ক করেছেন, মানুষের মধ্যে কতক এমন আছে, যারা আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে, না বুঝে ঝগড়া করে এবং অনুগমন করে সেই অবাধ্য শয়তানের, যার নিয়তিতে লিখে দেওয়া হয়েছে, যে কেউ তাকে বন্ধু বানাবে, তাকে সে বিপথগামী করে ছাড়বে এবং তাকে নিয়ে যাবে প্রজ্জ্বলিত জাহান্নামের শাস্তির দিকে।
হে মানুষ! পুনরায় জীবিত হওয়া সম্পর্কে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে তবে (একটু চিন্তা কর) আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাটি হতে, এরপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর জমাট রক্ত থেকে তারপর এক মাংসপিন্ড থেকে যা (কখনও) পূর্ণাকৃতির হয়, (কখনও) পূর্ণাকৃতির হয় না। তোমাদের কাছে তোমাদের অবস্থা সুষ্পষ্টরূপে ব্যক্ত করার জন্য। আর আমি যা কিছু ইচ্ছা করি মাতৃগর্ভে রাখি এক নির্দিষ্ট কালের জন্য। তারপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি। তারপর (তোমাদের প্রতিপালন করি) যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও। তোমাদের কতককে (আগেই) দুনিয়া থেকে তুলে নেওয়া হয়। এবং তোমাদের কতককে ফিরিয়ে দেওয়া হয় হীনতম বয়সে (অর্থাৎ চরম বার্ধক্যে) এমনকি তখন সে সবকিছু জানার পরও কিছুই জানে না। তুমি ভূমিকে দেখ শুষ্ক, তারপর যখন আমি তাতে বারি বর্ষণ করি তখন তা আন্দেলিত ও বাড়-বাড়ন্ত হয়ে উঠে এবং তা উৎপন্ন করে সর্বপ্রকার নয়ণাভিরাম উদ্ভিদ। এসব এজন্য যে, আল্লাহর অস্তিত্বই সত্য এবং তিনিই প্রাণহীনের ভেতর প্রাণ সঞ্চার করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান। এবং এজন্য যে, কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী। তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং এজন্য যে, যারা কবরে আছে আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুজ্জীবিত করবেন।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন