ঢাকা বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৮ রজব ১৪৪২ হিজরী

ইসলামী জীবন

মহানবী (স.) কাবায় কি ঈসা (আ)-এর ভাস্কর্য রেখেছিলেন

এসএম আনওয়ারুল করীম | প্রকাশের সময় : ৮ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০৭ এএম

নবম হিজরিতে মহানবি (স) মক্কা বিজয় করেন। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হজরত আলী (রা)-কে সঙ্গে নিয়ে সকল প্রতিমা ও ভাস্কর্য ধ্বংস করে দেন। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি সিরাতে ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের বরাতে উল্লেখ করেন যে, সেদিন মহানবি (স) পবিত্র বায়তুল্লাহ শরিফের ভিতর ও আশপাশ থেকে যখন সকল মূর্তি অপসারণ করেন বটে; তবে বায়তুল্লাহর অভ্যন্তরে হজরত ঈসা (আ) এবং হজরত মারইয়াম (আ)-এর প্রতিকৃতি ভাঙতে নিষেধ করেন।
মূলত পবিত্র বায়তুল্লাহর দেয়ালে হজরত ঈসা ও মারইয়াম (আ)-এর অঙ্কিত ছবির বিষয়ে মূর্তিপন্থিদের প্রচারণা সত্যের অপলাপ বৈ কিছুই নয়। কারণ সিরাতে ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশামের বরাতে যে বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে তা আদৌ সঠিক তথ্য নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ঈসা ও মারইয়ামের ছবি বায়তুল্লাহর দেয়ালে রেখে দেওয়ার কল্পিত যে কাহিনীটি তারা বর্ণনা করেছেন, তা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রেস থেকে প্রকাশিত ইংলিশ লেখক আলফ্রেড গিয়োম অনূদিত ‘দি লাইফ অব মোহাম্মদ’ গ্রন্থের বর্ণনা। [প্রকাশকাল ২০০৬, পৃষ্ঠা ৫৫২]
আলফ্রেড গিয়োম সিরাতে ইবনে ইসহাকের সংক্ষেপিত রূপ সিরাতে ইবনে হিশামের অনুবাদ করেছেন বটে; কিন্তু তাতে নিজের থেকে অনেক সংযোজন-বিয়োজন করেছেন। এমন অনেক বর্ণনা তিনি এই গ্রন্থে সংযুক্ত করেছেন যা মূলগ্রন্থ সিরাতে ইবনে ইসহাকে নেই। সিরাতে ইবনে হিশামের কোনো পান্ডুলিপি বা মুদ্রিত সংস্করণেও নেই। ঈসা আ ও মারইয়ামের ছবি রেখে দেওয়ার বর্ণনাটিও আলফ্রেড গিয়োমের নিজস্ব সংযোজন, যা তিনি আযরাকি কৃত ‘আখবারু মক্কা’ থেকে সংগ্রহ করে ইবনে ইসহাকের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাটির সূত্রও যাচাই করে দেখা গেছে যে, সেটি সর্বৈব ভুয়া ও জাল। প্রশ্ন হলো, বিশুদ্ধ বর্ণনার অগণিত হাদিস হাতের নাগালে থাকা সত্তে¡ও আলফ্রেড গিয়োমের এই বর্ণনাটি সামনে আনার কারণ কী? এটি কি অজ্ঞতা, নাকি জ্ঞানের অপক্বতা, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই স্বার্থ হাসিলের ধান্ধা?
মহানবি (স)-এর বিরুদ্ধে কাবায় ঈসা ও মারইয়ামের প্রতিমা বহাল রাখার এ গল্প আজকের নতুন নয়। এর আগে ২০০৮ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদও এই নির্জলা মিথ্যা তথ্যের বরাত দিয়ে মূর্তির বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। তখন বিষয়টি নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন ও প্রচার করেছিলেন বিশ^বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক। (মাসিক আল কাউসার : ডিসেম্বর ২০০৮)। আট বছর পর আবার সেই একই কাসুন্দি ঘেঁটে ২০১৭ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি হাসান মাহমুদ বিভ্রান্তি ছড়ান। (কালের কণ্ঠ)।
প্রিয়নবি (স) প্রতিমা সম্পর্কে বলেছেন, প্রতিমা ও ভাস্কর্য অঙ্কনকারীদেরকে কেয়ামতের দিন কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। [বুখারি : ৫৯৬১] এ প্রসঙ্গে খলিফা হজরত আলী (রা)-এর একটি ঘটনার বিবরণ দেওয়া যাক। সাহাবি হজরত আবুল হাইয়াজ আসাদি (রা) বলেন, হজরত আলী ইবনে আবি তালেব (রা) আমাকে বলেছেন, আমি কি তোমাকে ওই কাজের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে কাজের দায়িত্ব দিয়ে নবিজি (স) আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা এই যে, তুমি সকল প্রাণীর মূর্তি বিলুপ্ত করবে এবং সমাধি সৌধ মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে এবং সকল ছবি মুছে ফেলবে। [মুসলিম : হাদিস ৯৬৯] তবে হ্যাঁ, ইসলাম কোনো কালেই সংখ্যালঘু অমুসলিমদের উপসানালয়সমূহে সংরক্ষিত মূর্তি ভাঙতে বলেনি।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, প্রতিকৃতি তৈরিকারী শ্রেণি হলো ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে কেয়ামত-দিবসে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে।’ [বুখারি : ৫৯৫০]
সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হোরায়রা (রা) নবিজি (স) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ওই লোকের চেয়ে বড় জালেম আর কে যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা করে? তাদের যদি সামর্থ্য থাকে তবে তারা সৃজন করুক একটি কণা এবং একটি শষ্য কিংবা একটি যব! [বুখারি ৫৯৫৩]
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা) ও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। মহানবি (স) বলেছেন, প্রতিকৃতি নির্মাতাদেও কেয়ামত-দিবসে আজাবে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, যা তোমরা ‘সৃষ্টি’ করেছিলে তাতে প্রাণসঞ্চার কর! [বুখারি ৭৫৫৭ ও ৭৫৫৮]
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে কেউ দুনিয়ায় কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করে কেয়ামত-দিবসে তাকে আদেশ করা হবে সে যেন তাতে প্রাণসঞ্চার করে অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না। [বুখারি ৫৯৬৩]
আওন ইবনে আবু জুহাইফা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি (স) সুদ ভক্ষণকারী ও সুদ প্রদানকারী, উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারী এবং প্রতিকৃতি প্রস্তুতকারীদের উপর লানত করেছেন। [বুখারি ৫৯৬২] এই হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, মূর্তি, প্রতিমা ও ভাস্কর্য নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কবিরা গুনাহ। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কুফরিরও পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মূর্তি ও ভাস্কর্যের বেচাকেনাও হাদিস শরিফে সম্পূর্ণ হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, নবি করিম (স) মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় থাকা অবস্থায় এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, আল্লাহ ও তার রাসুল মদ ও মূর্তি এবং শূকর ও মৃতপ্রাণী বিক্রি করা হারাম করেছেন। [বুখারি ২২৩৬]

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন