ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮, ২৩ রমজান ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

চাপের মুখে সংশোধনের উদ্যোগ

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের আগেই আইনটি পরিবর্তন দুঃখজনক : ইলিয়াস কাঞ্চন

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৮ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম

পরিবহন সংগঠনগুলোর চাপের মুখে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমান আইনের ১১টি ধারায় বিদ্যমান শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে এবং চারটি ধারার কারাদন্ডের বিধান কমিয়ে আইনটি সংশোধন হতে যাচ্ছে।

বিদ্যমান আইনে অবহেলা বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কাউকে ‘গুরুতর আহত’ বা ‘প্রাণহানি’ ঘটালে বিদ্যমান সড়ক আইনে তা ১৮৬০ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী দন্ডনীয় অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ড। তবে সড়ক আইনের সংশোধনী প্রস্তাবে দুর্ঘটনায় কেবল কারো ‘প্রাণহানি’ ঘটলেই তা পেনাল কোডের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। শাস্তি সর্বোচ্চ কারাদন্ডের বিধান পাঁচ বছর রাখা হলেও সর্বোচ্চ জরিমানা প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ লাখ টাকা। আইনের সুপারিশকৃত খসড়া অনুযায়ী- ওভারলোডিং এবং মোটরযানের আকার পরিবর্তনের অপরাধকে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, যা বর্তমানে অজামিনযোগ্য।

খসড়া অনুযায়ী আইনটি সংশোধিত হলে- নিয়ন্ত্রণহীন এবং চালকের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে চালককে দায়ী করে বিচার করা যাবে না। তবে, কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেলে তখন শুধু এটি প্রয়োগ করা যাবে।
খসড়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই একজন চালক নিবন্ধনকৃত থ্রি-হুইলার বা তিন চাকার গাড়ি চালাতে পারবেন। অন্য পরিবহনগুলো চালানোর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা অপরিবর্তিত থাকবে। তবে, একজন সহকারী বা সুপারভাইজারের ১০ বছরের গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা থাকলে এবং ড্রাইভিং সক্ষমতা বোর্ডে পাশ করলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ কয়েকটি শর্ত মানা প্রয়োজন হবে না বলে খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিদ্যমান আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে কমপক্ষে ২৯টি ধারা সংশোধন করা হবে। ভারি ও মাঝারি মোটরযানের সংজ্ঞাসহ আটটি বিষয়ের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ পাস করে সরকার। আইনটি কার্যকর হয় এর প্রায় ১৪ মাস পর, ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে। শুরু থেকেই আইনটির বিভিন্ন ধারা বাতিল ও সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত খসড়ায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাবিগুলোরই প্রতিফলন ঘটেছে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অন্যতম দাবি ছিল, সংঘটিত সব অপরাধ জামিনযোগ্য করা। বিদ্যমান আইনে মোটরযানের কারিগরি নির্দেশ অমান্য (ধারা ৮৪), ওভারলোডিং ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালানোর ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন (ধারা ৯৮) এবং দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত অপরাধ (ধারা ১০৫) জামিন অযোগ্য। খসড়া সংশোধনী প্রস্তাবে কেবল দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত অপরাধকে জামিন অযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ দূষণকারী, ঝুঁকিপূর্ণ ইত্যাদি মোটরযান চালানোর জন্য বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। সংশোধনী প্রস্তাবে এসব অপরাধের শাস্তি কমিয়ে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড দেয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি জোরে হর্ন বাজালে বিদ্যমান আইনে শাস্তি সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড। এ অপরাধে শাস্তি কমিয়ে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ট্রাফিক সাইন ও সংকেত অমান্যের জন্য বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। এ শাস্তি কমিয়ে কেবল ১ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন না করা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অপরাধে বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান আছে। এ অপরাধে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কোনো চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, প্রত্যাহার বা স্থগিত হওয়ার পরও তিনি গাড়ি চালালে বিদ্যমান আইনে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। এ অপরাধে অর্থদন্ডের পরিমাণ কমিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কেউ ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করলে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইনে। সংশোধনীতে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান আছে বিদ্যমান আইনে। তবে সংশোধনীতে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ১২৬টি ধারার মধ্যে ২৯টি ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সংশোধনীগুলোর খসড়া প্রস্তুত করে সেগুলোর ওপর মতামত দেয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডার এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য খসড়াটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইউসুফ আলী মোল্লা বলেন, তাদের মতামত পেলে প্রয়োজনে আমরা সেগুলো যোগ করব। মন্ত্রিসভায় ও সংসদে এর অনুমোদনের আগে আরও কয়েকটি ধাপ আছে। এ বিষয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিচসা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এটি (প্রস্তাবিত খসড়া) তাদের (পরিবহন নেতাদের) চাহিদার প্রতিফলন। এ আইনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন শুরুর আগেই আইনটি পরিবর্তন করা হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। খসড়া অনুযায়ী আইনটি সংশোধিত হলে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

সরকারদলীয় সাবেক এক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যের নেতৃত্বাধীন পরিবহন সংগঠনকে অত্যন্ত ক্ষমতাবান উল্লেখ করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, পরিবহনখাতে অরাজকতার জন্য মূলত যারা দায়ী, তাদের দাবির ভিত্তিতেই সরকার আইনটি সংশোধন করতে যাচ্ছে। তবে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী তাদের চাপের ফলে সরকারের আইন পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকার তড়িঘড়ি আইনটি পাশ করে। যদি আরও আলোচনা করে আইনটি পাশ করা হতো তাহলে এতো দ্রুত আইনটি সংশোধন করার প্রয়োজন হতো না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন