বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৩ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ছোট নির্মাণেও দশক পার

তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প ব্যয় ৩৭৭ থেকে বেড়ে এখন ৬১০ কোটি টাকা

কামাল আতাতুর্ক মিসেল : | প্রকাশের সময় : ১৫ জুলাই, ২০২১, ১২:০১ এএম

চলতি বছরেও শেষ হচ্ছে না শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ। অথচ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাজ প্রথম সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু করোনাসহ নানান জটিলতায় গত বছর সেতুটির কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেনি বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্তির সময় বাড়িয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। তবে চলতি বছর, অর্থাৎ এবারও নির্ধারিত সময়ে এই মেগা প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হবে না বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তাই প্রকল্পের মেয়াদ আবারো বাড়িয়ে কর্তৃপক্ষ সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি ডিপিপি পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রকল্পের নথিপত্র সূত্র জানা গেছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১০ সালে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ার পর নারায়নগঞ্জ শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০১৪ সালের ২৪ জুনের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পাঁচ দফায় সময় বাড়লেও গত ১০ বছরেও চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি সেতুটি। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্পটি পাস করার সময় এর ব্যয় ধরা হয় ৩৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এসএফডি ৩১২ কোটি টাকা ঋণ এবং সরকারের ৬৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা। পরের বছর সংস্থাটির সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করতে না পারায় ৩৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৬১০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। খরচ বেড়েছে ২৩৩ কোটি টাকা, যা শুরুর ব্যয়ের চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি। বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ জোগান দিতে হচ্ছে সরকারের তহবিল থেকে। নতুন ব্যয় কাঠামো অনুযায়ী, সরকার দেবে ২৬৫ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৬৫ কোটি টাকা। আর এসএফডি দেবে ৩৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের সার্বিক কাজ এখনো ২০ শতাংশ বাকি। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়েছে সওজ অধিদফতর।

সওজের কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর তা চূড়ান্ত করতে এক বছরের মতো লেগে যায়। ঠিকাদার নিয়োগে ২০১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হলে তাতে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। কিন্তু এসএফডির সদর দফতর তা নাকচ করে জানায়, চীনের ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে কালোতালিকাভুক্ত। সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, সিসিসিসি যে বিশ্বব্যাপী কালোতালিকাভুক্ত, সেটি তারা জানতেন না। ফলে এসএফডির পরামর্শে পুনরায় দরপত্র ডাকা হয়। এবারে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ২০১৭ সালে সরকারের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর আগে ঠিকাদারকে মূল সেতুর ৪৪৮ কোটি টাকার কাজের ১০ শতাংশ হিসেবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা। এই টাকা ছাড় করতে এসএফডি সময় নেয় এক বছর। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ কোটি টাকা ছাড়ের পর সেতুর মূল কাজ শুরু হয়। তবে অপর একটি সূত্র বলছে, এই প্রকল্পে অর্থায়নকারী সংস্থা সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং বাংলাদেশ সরকারের টানাপোড়েন ও খামখেয়ালির কারণেই দেরি হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।

তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শোয়েব আহমেদ বলেন, ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর কাজ শেষ করতে ১০ বছর সময় নেওয়া সত্যিই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু এই প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগেই অনেক সময় চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলো কাজ শুরুর আগে অগ্রিম টাকা ছাড় করতে সময় নেয় এক মাস। সেখানে এসএফডি নিয়েছে এক বছর। শুধু শীতলক্ষ্যা তৃতীয় সেতু নয়, সরকারের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্পেই সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বাড়ানোর ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে সমীক্ষা ছাড়া। কোনো ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প নেওয়া হয়। বদলাতে হয় নকশা। দেরির মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

সেতুটি না হওয়ায় বর্তমানে প্রতিদিন বন্দর উপজেলার প্রায় এক লাখ মানুষকে নৌকা ও ট্রলারে করে নারাছুগঞ্জ সদরে আসা-যাওয়া করতে হয়। এতে প্রতিনিয়ত যেমন ভোগান্তি থাকে, তেমনি মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে। রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া এলাকায় বাসিন্দা সৈকত কুমার সাহা দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, সেতুটি হলে নদীর পশ্চিম পারে অবস্থিত শুধু রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপন হবে না। সেতুটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। এ ছাড়া নারাছুগঞ্জ সদরের সঙ্গে বন্দর উপজেলারও সংযোগ ঘটবে। ভক্তবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আসাদ খন্দকার বলেন, শুধু নদী পার হওয়ার জটিলতা এড়াতে অসুস্থ রোগী নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান না তারা। ভুলতা ও গাউছিয়া এলাকার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই চিকিৎসা নেন।

সেতুটির দীর্ঘ সময়ের বিষয়ে সাবেক সচিব ও বৃহৎ প্রকল্প বিশেষজ্ঞ ফাওজুল কবির খান বলেন, সরকার তো শুধু বড় বড় প্রকল্পের পেছনেই ছুটছে। দেশে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প আছে, যেদিকে সরকার নজরই দেয় না। অথচ সেসব প্রকল্প থেকে দ্রুত সুফল মেলে। তিনি আরও বলেন, মাত্র সোয়া কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ ১০ বছরেও শেষ হবে না, এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মূল বিষয় হলো, এসব ছোট প্রকল্পের দিকে সরকারের মনোযোগ নেই। তবে সেতুর সহকারী প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা বারবার পিছিয়ে যাওয়ায়, মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিয়তই আমাদের চাপ দেয়া হচ্ছে। এতে যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পের কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন