ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহন নৌপথ অবহেলায় বাড়ছে জট

প্রকাশের সময় : ৫ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

শফিউল আলম : দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরে কন্টেইনারসহ যাবতীয় কার্গো জটের সমস্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। বন্দরজটের কারণে ব্যবসায় পরিচালনা ও শিল্পের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিনের কোটি কোটি টাকার গচ্ছা প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে গিয়ে পড়ছে দেশের ভোক্তা সাধারণের উপরই।
চট্টগ্রাম বন্দরে ইদানীং ঘন ঘন যে পণ্যজট সৃষ্টি হচ্ছে তার মূলে রয়েছে শুধুই সড়ক পথে পরিবহনের একচেটিয়া নির্ভরতা। বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্র বন্দরের মতোই স্বাভাবিক নিয়মে যদি বন্দর থেকে অ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্যসামগ্রী পরিবহন কার্যক্রম সামাল দেয়া হতো তাহলে বন্দর সারা বছরই শুধু জটমুক্ত থাকত তাই নয়; বরং পরিবহন ব্যয় হ্রাস একই সাথে সময় সাশ্রয়ও নিশ্চিত হতো। তদুপরি দেশের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থার ‘লাইফ লাইন’ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের বিড়ম্বনা পোহাতে হতো না। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙর থেকে প্রায় ১১শ’ লাইটারেজ ও কার্গো জাহাজ, কোস্টার দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নৌবন্দরগুলোতে হরেক ধরনের পণ্যসামগ্রী এবং শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন করে থাকে। লাইটার ও কার্গো জাহাজ মোটামুটি পর্যাপ্ত হলেও গড়ে অর্ধেকের মতো কার্গো জাহাজ, লাইটার বছরের অনেকটা সময় ধরে অঘোষিতভাবে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে করে অভ্যন্তরীণ কার্গো জাহাজ, লাইটার, নৌযানের সংকট বিরাজ করে। গত সপ্তাহের গোড়াতে কন্টেইনার মুভার ট্রেলার শ্রমিক-মালিক পক্ষের আকস্মিক একশ’ ঘণ্টার কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জটের জের চলছে এখনও। গতকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৭৬০ টিইইউএস (২০ ফুট সাইজের একক ইউনিট হিসাবে) কন্টেইনার ছিল জটগ্রস্ত অবস্থায়। যা স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার ইউনিট বেশি। তবে আঙ্কটাড ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিপিং বিধিবিধান অনুসারে যে কোন সমুদ্র বন্দরে স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যে কন্টেইনারবাহী পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পরিচালনার জন্য প্রকৃত সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার বিপরীতে অন্ততপক্ষে ৩০ শতাংশ জায়গা খালি রাখা অপরিহার্য। সেই আলোকে বন্দরে বর্তমানে কন্টেইনার স্তূপিকৃত হয়ে ওঠানামা, খালাস ডেলিভারি পরিবহনে চলছে এক বেসামাল অবস্থা। এহেন প্রকট জট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে এমনটি ধারণা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারীদের। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি না হলেও বন্দর প্রায়ই খোলা সাধারণ পণ্য (ব্রেক বাল্ক কার্গো) অথবা কন্টেইনার জটের কবলে পড়ছে। যার পেছনে রয়েছে পণ্য ডেলিভারি পরিবহনে অতিমাত্রায় সড়ক নির্ভরতা।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্যসামগ্রী পরিবহন ব্যবস্থা বর্তমানে সড়কপথে পুরোদমে একমুখী হয়ে আছে। বিকল্প সুবিধাজনক হলেও বন্দর থেকে আমদানি-রফতানিমুখী মালামাল নৌপথে ও রেলযোগে পরিবহন করা হচ্ছে খুব কম হারে। এতে করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা রুটসমূহে নিত্যদিনের যানজট সমস্যা খুবই তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া বিভিন্নমুখী জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও মাঝপথে পণ্যসামগ্রী চুরি, লোপাট এবং জ্বালানি ও পরিবহন খরচ পড়ছে অনেক বেশিমাত্রায়। অথচ তা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরমুখী ও বহির্মুখী পণ্যসামগ্রী নৌপথে ও রেলপথে সমন্বিত পরিবহনের ব্যাপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রফতানিমুখী নিত্য বা ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ পরিবাহিত পণ্যসামগ্রীর মধ্যে ৮০ শতাংশের গন্তব্যই হচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশ এলাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ এলাকা। এরপর রয়েছে দেশের অন্যান্য জেলা উপজেলা সদর, নৌ-বন্দর ও গঞ্জগুলো। চট্টগ্রাম প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে বছরে ২১ লাখ ৯০ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার এবং প্রায় ৬ কোটি মেট্রিক টন হরেক ধরনের পণ্যসামগ্রী পরিবহন করা হয়। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন সামাল দেয়ার উপযোগী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দেশে নির্মিত হয়নি। বন্দরের আমদানি-রফতানি পণ্য নিয়ে মহাসড়ক পাড়ি দিতে গিয়ে মালামাল বোঝাই পিঁপড়ের মতো সারি সারি ট্রাক কাভার্ডভ্যান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দেশের প্রধান সড়ক-মহাসড়কসমূহকে প্রায় স্থবির করে দিচ্ছে প্রতিদিনই। সুষম পরিবহন নীতি চালু না থাকার কারণেই এমনটি ঘটছে।
অথচ সমুদ্র বন্দর ও নৌ-বন্দরের সুবিধা রয়েছে বিশ্বে এমন প্রায় সব দেশ কম জ্বালানি ব্যয়ে অধিক পরিমাণে মালামাল পরিবহনের জন্য আগের তুলনায়ও এখন নৌপথে পরিবহনের দিকেই বেশিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছে। দেশের নৌ-পরিবহন বিভাগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞের জরিপ অনুসারে সড়ক-রেল-নৌপথে মালামাল পরিবহনের যে আনুপাতিক খরচ হয় তাতে নৌপথই সবচেয়ে বেশি ব্যয় সাশ্রয়ী। বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আকাশপথ, রেলওয়ে কিংবা সড়কপথের তুলনায় আমদানি-রফতানি পণ্যসামগ্রী পরিবহনে নৌপথ অনেক বেশি আর্থিক সাশ্রয়ী ছাড়াও সহজতম ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত। যা সড়কপথের তুলনায় চারগুণ বেশি খরচ সাশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিবে।
রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নৌপথে চাল, গম, চিনি, জ্বালানি ও ভোজ্যতেল, সার, বীজসহ কৃষি উপকরণ, সিমেন্ট ক্লিংকার, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল, রফতানিমুখী গার্মেন্টস প্রভৃতি পণ্যসামগ্রী পরিবহন অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। কিন্তু নৌ-পরিবহনখাত ব্যাপকভাবেই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে নৌপথে পণ্য পরিবহনের বিরাট সুযোগ তেমন কাজে আসছে না। বরং ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়েছে নৌপথ। সুলভ পরিবহনের জন্য দেশের নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সচল করার ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা সত্ত্বেও এ নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে তা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার ২ বছর আগে এ বিষয়ে একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল জনসংখ্যার তুলনায় ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়া সড়ক ও রেলপথে অতিমাত্রায় চাপ ও নির্ভরতা হ্রাস। সাগর মোহনা উপকূল ঘেরা, নদীমাতৃক দেশের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য নৌপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহায়ক। দেশে স্বাভাবিক স্রোতোবাহী নৌপথের দৈর্ঘ্য ১৮ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। এর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সদ্ব্যবহার জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য হলেও তা উপেক্ষিত। আর সরকারের উপরোক্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নও অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে আছে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ বারবার থমকে যাচ্ছে। বন্দর থেকে সরাসরি নতুন উদ্যমে কন্টেইনারজাত পণ্যসামগ্রী পরিবহন চালু হলেও তা অব্যাহত রাখা যাচ্ছে না। বিগত ২৩ সেপ্টেম্বর’ ১৫ইং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের কাছে পানগাঁওয়ে ছোট আকারের কন্টেইনার ফিডার জাহাজযোগে পণ্য পরিবহন শুরু করা হয়। এতে আশা করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কন্টেইনার পরিবহনের জন্য শুধুমাত্র সড়ক ও রেলপথের উপর নির্ভরতা কমে আসবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্মিত নারায়নগঞ্জের পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনালে সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নিরাপদে কন্টেইনার পরিবহনের লক্ষ্যে বন্দরের নিজস্ব উদ্যোগে ৩টি কন্টেইনার জাহাজ ‘এমভি পানগাঁও এক্সপ্রেস’, ‘এমভি পানগাঁও সাকসেস’ ও ‘এমভি পানগাঁও ভিশন’ সংগ্রহ করা হয়। নৌপথে কন্টেইনার পরিবহনে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে উক্ত জাহাজ তিনটি পরে বেসরকারি অপারেটরের কাছে পরিচালনার জন্য হস্তান্তর করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের বিশেষত ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের চাপ কমবে এমনটি প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অদক্ষতা, কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও আইসিটির নৌপথে কন্টেইনার পরিবহন ব্যবস্থা ইতোমধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন