বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বাংলাদেশের অর্থনীতি : ধনী দরিদ্রের ফারাক যেন আসমান-জমিন

প্রকাশের সময় : ১২ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

১৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা মাত্র ৫৫ লাখ উচ্চবিত্তের দখলে
১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা ১৫ কোটি ৪৫ লাখ লোকের দখলে
মোবায়েদুর রহমান : বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন চলছে, এক কথায় এর জবাব দেয়া কঠিন। এর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। গ্রোথ রেট বা প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক। আবার যদি সেই জিডিপি বা মোট দেশীয় উৎপাদনকে বণ্টনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন তাহলে সেখানে আয় বৈষম্য বা ইনকাম ইন ইকুয়ালিটি প্রবল। সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা মোতাবেক স্থির মূল্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার হলো ৮ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজার মূল্যে ১৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ দুটোই খুব রোবাষ্ট ফিগার। এই দুটো পরিসংখ্যান থেকে আপনি ধারণা করতে পারেন যে, আমাদের অর্থনীতির স্বাস্থ্য খুব ভালো। আবার এর উল্টো চিত্রও আছে।
এবার সেটি দেখুন। দেশে এখন হত দরিদ্রের সংখ্যা পৌনে ২ কোটি। দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে আরো ৪ কোটি মানুষ। তাহলে অন্তত প্রায় ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি। যে দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে, সেই দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্যকে কি ভাল বলা যায়?
চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ১৭ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে যে মোট সম্পদের ৯০ ভাগ রয়েছে ৫৫ লাখ উচ্চবিত্তের দখলে। অর্থাৎ ১৫ লক্ষ ৫৭ হাজার কোটি টাকা মাত্র ৫৫ লাখ লোকের দখলে। অবশিষ্ট ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকা ১৫ কোটি ৪৫ লাখ লোকের আওতায়। আরো সোজা করে বলতে গেলে ঐ ৫৫ লাখ লোকের মাথাপিছু আয় ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে ১৫ কোটি ৪৫ লাখ লোকের মাথাপিছু আয় ১১ হাজার ২০০ টাকা। চিন্তা করুন, মাথাপিছু আয় কোথায় ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা আর কোথায় ১১ হাজার ২০০ টাকা। তফাৎটি কেমন? আসমান আর জমিনের ফারাক নয় কি? এক সময় বলা হতো, কোথায় আইয়ুব খান? আর কোথায় এক খিলি পান? কোথায় স্বর্গ? আর কোথায় নরক?
এর পরেও কি আপনি বলবেন, আমাদের অর্থনীতির স্বাস্থ্য খুব ভালো? অর্থনীতির স্বাস্থ্য কোন বায়বীয় ব্যাপার নয়। জনগণের অর্থনীতির স্বাস্থ্যই দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য।
বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট
১৯১০ সালে এ সম্পর্কে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। ২০১০ সালের পর অদ্যাবধি কোনো জরিপ পরিচালিত হয়নি। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট মোতাবেক ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ শহরাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৮০ লক্ষ। তবে আলোচ্য সময়ে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট মোতাবেক গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে হ্রাস পেয়ে ৪ কোটি ৪৬ লক্ষে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৯০ লক্ষ হ্রাস পেয়েছে।
জীবন যাত্রার মান
শহরাঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষদের জীবন যাত্রার মানের অবনতি ঘটেছে। শহরের গরীব মানুষরা রাস্তার পাশে স্থাপিত বস্তিতে বসবাস করে। এসব বস্তিতে মানুষ জন গাদা-গাদি ও ঠাঁসাঠাঁসি করে থাকে। এসব বস্তি ঘরের কোনো অবকাঠামো নাই এবং একটি পরিবার বসবাস করারও প্লান-প্রোগ্রাম নাই। তাদের কাছে বিশুদ্ধ খাওয়ার ও রান্না করার পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা নাই। এসব বস্তির মানুষদের জন্য পাকা স্যানিটারি ব্যবস্থাও নাই। তাদের জন্য কোনো রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা নাই। পক্ষান্তরে গ্রামাঞ্চলের গরীবদের অবস্থা শহুরে গরীবদের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে ভাল। তারা একটি গ-িবদ্ধ সমাজে বাস করেন। বহু গ্রামে এখন নলকূপ বসানো হয়েছে। ফলে গ্রামবাসীদের অনেকেই এখন বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারেন। বস্তিবাসীদের নিকট শিক্ষার আলো পৌঁছে না। গ্রামবাসীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে পারে এবং তাদের জন্য মক্তব ও মাদ্রাসার দুয়ার খোলা থাকে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এমন মানবেতর জীবন যাপনের পরেও শহরে প্রতিদিন যে লক্ষাধিক নতুন মানুষের আগমন ঘটছে তারা সকলেই গ্রাম থেকে মাইগ্রেট করে শহরে আসছে।

পরিকল্পনাবিদদের একচোখা নীতি
অর্থনীতিবিদ এবং পল্লী অঞ্চল বিশারদরা এতদিন পর্যন্ত শুধু গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের ওপরেই তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন। তার ফলে গ্রামে গরীব মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু শহুরে গরীবদের দিকে নজর দেয়া হয়না। ফলে শহুরে গরীবদের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যেখানেই থাকে রাজনৈতিক সরকার সেখানেই থাকে স্পেশাল প্লানিং। তাই রাজনৈতিক বিবেচনায় শহরের পরিবহন ব্যবস্থা, স্বল্প মূল্যে আবাসন এবং যৎসামান্য হলেও স্বাস্থ্য পরিসেবার ব্যবস্থা করা হয়।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি
বাংলাদেশে কত কোটি মানুষ সক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত, কত কোটি মানুষ সম্পূর্ণ বেকার এবং কত কোটি মানুষ প্রচ্ছন্ন বেকার (উরংমঁরংবফ ঁহবসঢ়ষড়ুবফ) তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। আগামী ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বেকার সংখ্যা ৩৩ লাখে উন্নীত হতে পারে। এমনটি জানিয়েছেন উন্নয়ন অন্বেষণ নামক বাংলাদেশের একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুসারে দেশে ২০১০ সাল পর্যন্ত বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। ২০০০ সালে তা ছিল ১৭ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন সংস্থা প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ হতে ২০১০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক বেকারত্ব বৃদ্ধির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মত অনুযায়ী ২০১০ সালে যদি বাংলাদেশে বেকার মানুষের সংখ্যা হয়ে থাকে ২৭ লক্ষ তাহলে এখন সেই বেকারের সংখ্যা ৩২ লক্ষ বলে ধরা যায়। এই বেকার এবং উদ্বৃত্ত বেকারদেরকে যদি কর্মসংস্থান দিতে হয় তাহলে বাংলাদেশকে অবশ্যই ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব মতে এই হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারলে আগামী ১৫ বছর পর অর্থাৎ ২০৩১ সালে বাংলাদেশে আর কোনো বেকার থাকবে না।
সেটি অনেক দূরের পথ। কারণ বাংলাদেশ এখনও ৭ বা ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন