রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ঐতিহ্য হারাতে বসেছে হাজী বিরিয়ানী

স্বাদ ও মান আগের মতো নেই : বাজার নান্না, ফখরুদ্দিন ও ঢাকা বিরিয়ানীর দখলে

প্রকাশের সময় : ২৭ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বিশেষ সংবাদদাতা : ঐতিহ্য হারাতে বসেছে পুরান ঢাকার হাজী বিরিয়ানী। খাবারের গুণগত মানের সাথে এর ঘ্রাণ, স্বাদ সবই দিন দিন কমে যাচ্ছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, হাজীর প্যাকেটে এখন গোশত খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৪০ টাকা দামের একটি ফুল প্যাকেটে যে পরিমাণ বিরিয়ানী থাকার কথা এখন তার চেয়ে কম দেয়া হয়। অনেকের ধারণা, শুধুমাত্র ঐতিহ্য ও নামের উপর ভর করে বাণিজ্যিকভাবে চালাতে গিয়েই মোঘল আমলের ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানীর এ বেহাল অবস্থা। বেশ কয়েকজন গ্রাহক আফসোস করে বলেছেন, প্রতিষ্ঠাতা হাজী মোহাম্মদ হোসেনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছেন না তাঁর নাতিরা। এই সুযোগে নান্নার বিরিয়ানী, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানী, ঢাকা বিরিয়ানীসহ বিভিন্ন রকমারী বিরিয়ানী হাজীর বাজার দখল করে নিচ্ছে। আবার নকল হাজীর বিরিয়ানীতে ছেয়ে গেছে গোটা রাজধানী। এ বছরের শুরুতে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলাতেও ‘হাজীর বিরিয়ানী’ নামে একাধিক স্টল মেলার দর্শক ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করেছে। এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে হাজীর বিরিয়ানী মতিঝিল শাখার ম্যানেজার আওলাদ হোসেন গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, মাঝে মধ্যে রান্নায় ঊনিশ-বিশ হতেই পারে। সে কারণে হয়তো হাজীর বিরিয়ানীর মান ও স্বাদ আগের মতো নেই তা ঠিক নয়। তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ঢাকার তিনটি স্থানে হাজীর বিরিয়ানী বিক্রি হলেও খাবারের মান একই থাকে। নকল হাজীর বিরিয়ানীর বিষয়ে তিনি বলেন, হাজী শব্দের আশপাশে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে অনেকেই নকল দোকান দিয়েছে। তাতে আমাদের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে এটা সত্য।
মোগল আমল থেকে ঐতিহ্যগতভাবেই পুরান ঢাকার মানুষের খাবার-দাবারে ছিল নবাবী সংস্কৃতির যোগসূত্র। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ হোসেন চালু করেছিলেন হাজীর বিরিয়ানী। পুরান ঢাকার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৩৯ সালে হাজী মোহাম্মদ হোসেন এক হাঁড়ি বিরিয়ানী নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে তার বিরিয়ানীর স্বাদ ও খাবারের মান ভালো হওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে হাজীর বিরিয়ানীর নামডাক। এক সময় ঢাকাবাসীর খাবারের ঐতিহ্য হয়ে যায় হাজীর বিরিয়ানী। কালক্রমে এই বিরিয়ানীর ব্যবসার দায়িত্ব পান হাজী মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে হাজী গোলাম হোসেন। ২০০৬ সালে হাজী গোলাম হোসেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র হাজী মোহাম্মদ শাহেদ হোসেন এই ব্যবসার হাল ধরেন। এখন তার সাথে এই ব্যবসা দেখাশোনা করেন হাজীর আরেক নাতি হাজী মোহাম্মদ বাপী।
হাজীর বিরিয়ানীর দোকানে বিক্রি হয় শুধু কাচ্চি বিরিয়ানী। এর বিশেষত্ব হলো, গরুর গোশতের পরিবর্তে শুধু খাসির গোশত এবং ঘি/বাটার অয়েলের পরিবর্তে সরিষার তেল ব্যবহার করা হতো। এছাড়া সম্পূর্ণ দেশীয় সব মশলা ব্যবহার করা হয় বলে স্বাদে-গন্ধে সবার প্রিয় ছিল এই হাজীর বিরিয়ানী। গ্রাহকদের অভিযোগ, বর্তমানে হাজীর বিরিয়ানীর সেই স্বাদ, গন্ধ আর নেই। সরিষার তেলও ব্যবহার করা হয় না। পুরান ঢাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী হাজী কুদরত আলী বলেন, এক সময় হাজীর বিরিয়ানীতে পোলাওয়ের চেয়ে গোশতই বেশি থাকতো। এখন এমনও হয়েছে যে একটা ফুল প্লেটে এক টুকরা গোশত খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাজীর বিরিয়ানীর নাম ডাকের পেছনে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদেরও অবদান কম নয়। এটা আমাদের গর্বের বিষয় ছিল। এখন যা শুরু হয়েছে তাতে হাজীর নাতীরা তাদের পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্যই শুধু বিনষ্ট করছে না, আমাদেরকেও খাটো করছে। কেনো এরকম হচ্ছে জানতে চাইলে পুরান ঢাকার গাড়ির পুরাতন যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, “হাজীর বিরিয়ানীর ছাদ আর আগের মতো নাইক্যা। ছাদ অনেক কমছে। আমাগো পোলাপান আর হাজীর বিরিয়ানী খাইবার চায় না।” পুরান ঢাকার এই ব্যবসায়ী বলেন, “হুনছি হাজীর সাবের নাতি কারিগর পাল্টাইছে। অরজিনাল কারিগর আর নাইক্যা। কারিগর বি নাই, ছাদও বি আগের মতো নাইক্যা।”
জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী হাজী বিরিয়ানীর রেসিপি ছিল, খাসির মাংস ৮ কেজি, পোলাও এর চাল ৫ কেজি, পেঁয়াজ কুঁচি ২ কেজি, আদা ৪০০ গ্রাম, রসুন ২৫০ গ্রাম, কাঁচা মরিচ ৫০০ গ্রাম, তরল দুধ ১ কেজি, টক দই ১ কেজি, এলাচি ও দারুচিনি ৩০ গ্রাম করে, কাঠবাদাম ৫০০ গ্রাম, কিসমিস ২৫০ গ্রাম, লবণ ২৫০ গ্রাম, সরিষার তেল ৩ কেজি, তেজপাতা কয়েকটা। অনেকের অভিযোগ, আগের এই রেসিপি এখন আর মানা হয় না। হলে ১৪০ টাকা দামের এক প্লেট বিরিয়ানীতে গোশত খুঁজে না পাওয়ার কথা নয়। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা এড. মিজানুর রহমান বলেন, কয়েকদিন আগে মতিঝিল থেকে হাজীর বিরিয়ানী কিনে বাসায় নিয়ে আর খেতে পারিনি। বাসি বিরিয়ানী গরম করে প্যাকেটে ভরে দেয়ায় সেগুলো গন্ধ হয়ে গিয়েছিল, খাওয়ার উপযোগি ছিল না। জানতে চাইলে হাজীর ম্যানেজার আওলাদ হোসেন বলেন, একটা প্লেটে গোশত খুঁজে না পাওয়ার কথা নয়। ব্যস্ততার কারণে প্লেট ভরানোর কারণে হয়তো গোশত কম হলেও হতে পারে। তিনি বলেন, বাসি বিরিয়ানী গ্রাহককে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের ৭০ কাজী আলাউদ্দিন রোডে হাজী বিরিয়ানীর প্রধান বিক্রয় কেন্দ্র। এর দুটি শাখা ৯৯ মতিঝিল এবং ক-১১/৬ এ বসুন্ধরা রোড বারিধারা। অথচ সারা ঢাকা শহরেই এখন হাজীর বিরিয়ানীর ছড়াছড়ি। মতিঝিল স্টক এক্সচেঞ্জের বিপরীতে এবং এক সময়কার ঘরোয়া হোটেলের পাশেই রয়েছে হাজীর বিরিয়ানীর একটি দোকান। যেটাকে নকল বলেছেন মতিঝিল শাখা হাজীর ম্যানেজার আওলাদ। একইভাবে ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, মিরপুর এলাকাতেও হাজীর বিরিয়ানীর দোকান রয়েছে। গ্রাহক এসব দোকান থেকে ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানী কিনে প্রতারিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের মতে, এ প্রতারণা বন্ধ করার দায়িত্ব আসল হাজী কর্তৃপক্ষেরই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps