রোববার, ২২ মে ২০২২, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২০ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ড্রাইভিং সিটে হেলপার

প্রতিযোগিতায় প্রাণ গেল কিশোরের

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০১ এএম

রাজধানীর মগবাজার মোড়ে প্রতিযোগিতামূলক ও বেপরোয়াভাবে বাস চালাচ্ছিল আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুই বাসের চালক। তাদের মধ্যে মো. ইমরান (৩৪) নামে একটি বাসের চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও আরেক বাসের ড্রাইভিং সিটে ছিলেন হেলপার। চালকের অনুপস্থিতিতে তিনি বাসটি চালাচ্ছিলেন। তার নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স।
গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর মগবাজার মোড়ে বিকেলে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুটি বাস প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে চালানোর কারণে রাকিবুল হাসান (১৪) নামে এক কিশোর দুই বাসের মাঝে চাপা পড়ে নিহত হয়। এ ঘটনায় দায়ী দুই বাসের চালককে গ্রেফতারের পর ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, গত ২০ জানুয়ারি মগবাজার মোড়ে বিকেল ৫টার দিকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুইটি বাসের মাঝে চাপা পড়ে আহত হন রাকিবুল হাসান (১৪) নামে এক কিশোর। ঘটনাস্থল হতে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনা পরবর্তীতে দুই ঘাতক ড্রাইভার বাস দুটি রেখে পালিয়ে যায়। ভিকটিম ঘটনাস্থলে মাস্ক বিক্রি করছিল। তার মাস্ক বিক্রির আয়ে পরিবারটি চলে। ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের সদস্যরা সড়ক ও পরিবহন আইনে ২০ জানুয়ারি রমনা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। র‌্যাব জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
র‌্যাব-৩ এর একটি দল গত ২৫ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর পল্টন এলাকা এবং মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর এলাকান থেকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুইটি ঘাতক বাসের চালক মো. মনির হোসেন (২৭) ও মো. ইমরানকে (৩৪) গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুজনই ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মনির হোসেন জানায়, ইতোপূর্বে সে ৫ বছর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ছিল। গত তিন মাস পূর্বে বাংলাদেশে তার নিজ গ্রামের বাড়ি ভোলাতে আসে এবং প্রায় দেড় মাস পূর্বে ঢাকাতে কর্মসংস্থানের জন্য আসে। প্রায় এক মাস পূর্বে থেকে আজমেরী গ্লোরী গাড়ির চালকের সাথে ওই গাড়িতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে হেলপারের কাজ শুরু করেন। তিনি মাঝেমধ্যে বাসটি নিজেও চালাতেন। গত ২০ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় আজমেরী গ্লোরী পরিবহন (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫৭৮৭) সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশে গাড়ির মূল চালক চালিয়ে নিয়ে আসে। পথিমধ্যে চালক সুমন গুলিস্তানে এসে গাড়িটি হেলপার মনির হোসেনের দায়িত্বে দিয়ে যায়। মনির গাড়িটি চালিয়ে মগবাজার মোড়ে নিয়ে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, মগবাজার মোড়ের সিগন্যাল ছেড়ে দিলে দ্রুত গাড়ি দুটি এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী স্টপেজে যে আগে পৌঁছাতে পারবে সে বাসের জন্য অপেক্ষারত বেশি সংখ্যক যাত্রীদের তার বাসে নিতে পারবে। এমতাবস্থায় অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এক গাড়ি অপর গাড়িটিকে ওভারটেক করার সময় দুই গাড়ির মাঝখানে চাপা পড়ে ওই কিশোর। ঘটনার পরপরই দুই চালক মনির হোসেন ও ইমরান হোসেন বাস দুটি রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ইমরান হোসেন জানায়, সে ১০/১২ বছর যাবত আজমেরী গ্লোরী নামক কোম্পানির বাস চালিয়ে আসছে। ঘাতক বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৬০-৫৬) সে আনুমানিক দুই বছর ধরে চালাচ্ছে। যদিও সে এক সময় হেলপার ছিল। বিগত ৩ বছর পূর্বে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। মালিকের নিকট হতে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে বাসটি ভাড়ায় চালানো শুরু করে। গত ২০ জানুয়ারি ৪টার দিকে যথারীতি বাসটি নিয়ে সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মগবাজারে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়।
কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতার ইমরান মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির কারণে ২০২১ সালে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের ঘাতক বাসের একটির মূল চালক সুমন ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মামলার প্রেক্ষিতে দুই ঘাতক বাসের চালকের দায়িত্বে থাকা দুজনকে গ্রেফতার করেছি। আসামিদের থানায় সোপর্দ করা হবে। বিজ্ঞ তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি তদন্তে তাদের ব্যত্যয় বা দায় পান তাহলে অবশ্যই আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মঈন বলেন, সম্প্রতি আন্তঃজেলা গণপরিবহনের চেয়ে ঢাকায় চলাচলকারী বাসেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতোপূর্বে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনার দায়ী চালক হেলপারদের র‌্যাব গ্রেফতার করেছে। তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, চালক-হেলপারদের প্রতিযোগিতামূলক ও বেপরোয়া মানসিকতার কারণে এবং চুক্তিভিত্তিক বাস চালনার কারণে অর্থলোভে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে মালিক, চালক, হেলপারদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও সাবধান ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন