শনিবার, ২১ মে ২০২২, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

ইসলামী জীবন

গীবত জিনার চেয়েও মারাত্মক গুনাহ

মো. সাইফুল মিয়া | প্রকাশের সময় : ২৯ জানুয়ারি, ২০২২, ১২:০২ এএম

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা মানুষের স্বভাব। আমরা দৈনন্দিন চলাফেরা, উঠাবসা ও কথাবার্তা কিংবা হাসি-ঠাট্টার ছলে অসাবধানতাবশত জঘন্যতম ঘৃণ্য একটি অপরাধ করে থাকি, যা আমরা কখনো বুঝতে পারি না। এ জঘন্যতম ঘৃণ্য অপরাধটির নাম গীবত। গীবত শব্দটির শাব্দিক অর্থ দোষারোপ করা, কুৎসা রটনা, কারো পেছনে সমালোচনা করা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষগুলো অন্যেও সামনে তুলে ধরা ইত্যাদি। আমাদের অনেকেই গীবত সম্পর্কে তেমন ধারণা নাই। অথচ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. হাদিসে গীবত কি, তা সরল ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘গীবত কী তা কি তোমরা জান?’ লোকেরা উত্তরে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘গীবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তবে এটাও কি গীবত হবে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেই সেটা হবে গীবত আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে সেটা হবে বুহতান বা মিথ্যা অপবাদ।’ (মিশকাত- ৪১২)।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র আল-কুরআনে কারো গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা একজন অন্যজনের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কর না এবং একে অপরের অসাক্ষাতে নিন্দা কর না। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? প্রকৃতপক্ষে তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্যই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী পরম দায়ালু।’ (সুরা হুজুরাত-১২)।
তাহলে একবার চিন্তা করে দেখুন, গীবত কতখানি ন্যাক্কারজনক কাজ? গীবতের ভয়াবহতা বুঝানোর জন্যেই বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘গীবত করা জিনার থেকেও মারাত্মক।’ (মেশকাত, বায়হাকি)। অন্য হাদিসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন ‘সূদের (পাপের) ৭২টি দরজা বা স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নতম স্তর হচ্ছে স্বীয় মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তুল্য পাপ এবং ঊর্ধ্বতম স্তর হ’ল কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার এক ভাইয়ের মান-সম্ভ্রমের হানি ঘটান তুল্য পাপ’। (তাবারাণী-১৮৭১)।
গীবতকারী এই দুনিয়াতে অপদস্থ হবে। হযরত আবূ বারযাহ আল-আসলামী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূল সা. বলেছেন, ‘হে সেসব লোক যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছে কিন্তু ঈমান অন্তরে প্রবেশ করেনি। তোমরা মুসলিমদের গীবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন। (সুনানে আবু দাউদ- ৪৮৮০)।
গীবতকারীদের জন্য পরকালেও কঠিন আজারের কথা বলা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘মেরাজের রাতে আমি এমন এক কওমের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম যাদের নখগুলো তামার তৈরী এবং তা দিয়ে তারা অনবরত তাদের মুখমণ্ডলে ও বুকে আচড় মারছে। আমি বললাম, হে জিবরাঈল ! এরা কারা? তিনি বললেন, ‘এরা সেসব লোক যারা মানুষের গোশত খেতো অর্থাৎ, মানুষের গীবত করত এবং মানুষের ইজ্জতের উপর হামলা করত এবং তাদের মানসম্মানে আঘাত হানতো। (সুনানে আবু দাউদ- ৪৮৭৮)।
হযরত আল-মুসতাওরিদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের গীবত করতে করতে এক লোকমা ভক্ষন করবে আল্লাহ তাকে এজন্য জাহান্নাম হতে সমপরিমাণ ভক্ষন করাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের দোষত্রুটি বর্ণনা করতে করতে পোশাক পরবে আল্লাহ তাকে অনুরূপ জাহন্নামের পোশাক পরাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির (কুৎসা) রটিয়ে খ্যাতি ও প্রদর্শনীর স্তরে পৌছবে, মহান আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তাকে ঐ খ্যাতি ও প্রদর্শনীর জায়গাতেই (জাহান্নামে) স্থান দিবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ-৪৮৮১)।
যার গীবত করা হয় তার আমলনামায় গীবতকারীর সওয়াব চলে যায় এবং গীবতকারীর আমলনামায় যার গীবত করা হয় তার গুনাহ চলে আসে। গীবত বলা আর শ্রবণকারী উভয়ই অভিশাপ্ত। এ জন্য আমরা কারো গীবত করব না এবং শুনব না। পাশাপাশি যার গীবত করা হয় তার পক্ষ নিয়ে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। সম্ভব হলে গীবতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তুলব। সর্বোপরি, মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে গীবতের থেকে বেঁচে চলার মতো তৌফিক দান করুক। আমিন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন