ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

একটি ক্লু-লেস হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন হলো যেভাবে

কদমতলীতে যুবকের গলাকাটা লাশ

প্রকাশের সময় : ৭ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নূরুল ইসলাম : রাজধানীর কদমতলী থানার ওয়াসা পুকুর পাড় থেকে গত ২৫ অক্টোবর এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওয়াসার নির্জন পুকুর পাড়ের স্লুইসগেটের কাছে পড়ে থাকা যুবকের বয়স আনুমানিক ৩৫-৩৬। কিন্তু দেহের সাথে মাথা না থাকায় আশপাশের কেউই লাশটি শনাক্ত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহ করে লাশটি ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশ জানায়, মর্গের ফ্রিজ নষ্ট এজন্য সেখানেও লাশ রাখতে অনীহা প্রকাশ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লাশটি আনজুমানকে দেয়ার তাগাদা দিতে থাকে তারা। নির্বাচন কমিশন থেকে ফিঙ্গার প্রিন্টের ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে ৫ দিন পর যুবকের পরিচয় মেলে। সেই সূত্র ধরে গত ৩১ অক্টোবর পুলিশ দুজনকে আটক করে। তাদের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, যুবকের নাম সুমন। সে যাত্রাবাড়ীতে এক মাছের আড়তে কাজ করত। কিন্তু লাশ শনাক্ত হলেও খুনের কারণ কেউ বলতে পারেনি। খুনের রহস্য উদঘাটনে কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী ৫টি টিম গঠন করেন। নির্দেশ দেন যে কোনো উপায়ে বের করতে হবে খুনের রহস্য। গ্রেফতার করতে হবে খুনিকে।
ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, এই খুনের নেপথ্যে এক হিজড়া জড়িত। কিন্তু সেই হিজড়া কে? কোথায় থাকে? তা নিয়েই ধূ¤্রজালের মধ্যে পুলিশ। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে আটক করার পরেও খুনির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে না পুলিশ। অবশেষ একটি সূত্রে পুলিশ জানতে পারে, খুনের সাথে জড়িত এক মহিলা মুন্সীগঞ্জে পালিয়ে আছে। পুলিশের একটি দল ছুটে যায় সেই মহিলার খোঁজে। রাতভর তল্লাশি চালিয়ে এক পর্যায়ে সেই মহিলাকে আটক করে থানায় আনা হয়। ওই মহিলার কাছেই পুলিশ প্রকৃত খুনির সন্ধান পায়। খুনি ওহাব ওই মহিলারই স্বামী। সুমনকে খুন করার পর সে তার স্ত্রীকে মুন্সিগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় রেখে বরিশালে পালিয়ে যায়। পুলিশ খুনির স্ত্রী বিলকিস (ছদ্মনাম) কে দিয়ে ফাঁদ পেতে সদরঘাট থেকে খুনি ওহাবকে গ্রেফতার করে। এরপর ওহাব জানায়, সেই খুনের লোমহর্ষক কাহিনী।
কয়েকটি মামলায় দীর্ঘদিন জেলে ছিল ওহাব। খুন হওয়া সুমনও তার স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় ৩ বছর আগে জেলে যায়। সেখানে ওহাবের সাথে তার পরিচয় ও সখ্যতা। ওহাবের সহযোগিতায় জেলখানায় ভালোই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে সুমন। এক পর্যায়ে সে জামিনে মুক্তি লাভ করে। জেলখানা থেকে বের হওয়ার সময় ওহাব সুমনকে তার স্ত্রীর ফোন নম্বর দিয়ে হাজিরার দিন আদালতে আসতে বলে। জামিন পেয়ে সুমন ওহাবের স্ত্রী বিলকিসের সাথে যোগাযোগ করে। জেলখানায় দু’জনের সখ্যতার কথা জানায়। এক পর্যায়ে ওহাবের স্ত্রী বিলকিসের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে সুমন। বিলকিসের অজান্তে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কিছু গোপন ভিডিও করে রাখে সুমন। সেটা দেখিয়ে বিলকিসকে ব্লাকমেইলিং করতে থাকে সুমন। এক পর্যায়ে বিলকিস লেবাননে চলে যায়। তার স্বামী ওহাব তখনও কারাগারে। ওহাব জামিনে মুক্তি পেলে বিলকিস লেবানন থেকে দেশে চলে আসে। স্বামীর সাথে ঘর-সংসার করতে থাকে। বিলকিস দেশে ফেরার পর সুমন আবার তাকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে শেষে সেই গোপন ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে ও মোবাইলে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওহাব এসবের কিছুই জানত না। বিলকিসও বুঝতে পারে না কিছুই।
ওহাব পুলিশকে বলেছে, মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও দেখা তার পুরনো অভ্যাস। কয়েক মাস আগে সে এলাকার এক মোবাইল ফোনের দোকান থেকে এমনি এক ভিডিও সংগ্রহ করে। রাতে সেটি দেখার সময় তার চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। অশ্লীল ভিডিওতে সে তার পাশেই শুয়ে থাকা স্ত্রী বিলকিসকে আবিষ্কার করে ফেলে। সকালে ঘুম থেকে জেগে সেই ভিডিওটি সে বার বার দেখে। এরপর স্ত্রীকে মারধর করে চাপ দিলে বিলকিস তা স্বীকার করে জানায় সুমন গোপনে এসব ভিডিও ধারণ করেছে। ওহাব পুলিশকে বলেছে, স্যার তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই আমার ছোট্ট মেয়েটিকে মেরে ফেলে আমি নিজেও আত্মহত্যা করবো। বিষয়টি এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীকে জানালে সে আমাকে আত্মহত্যা না করে প্রতিশোধ নিতে বলে। কিন্তু কোথায় পাবো ভিডিওর নায়ক সুমনকে? অনেক খোঁজাখুঁজি করে ঘটনার চারদিন আগে (২০ অক্টোবর) যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে সুমনের সন্ধান পায় ওহাব। সুমন যাতে তার উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে, সেজন্য স্ত্রী বিলকিসকে তালাক দিয়েছে বলে সে সুমনকে জানায়। সেই সাথে সুমনের মোবাইল নম্বরও নিয়ে আসে। পরদিন স্ত্রী বিলকিসকে দিয়ে সুমনকে ফোন করায় ওহাব। সুমনকে ফাঁদে ফেলার জন্য গল্প সাজায় ওরা। বিলকিস সুমনকে জানায়, সে তালাকপ্রাপ্তা এবং গার্মেন্টসে চাকরি করে। ওয়াসার পুকুর পাড় এলাকায় একাই বাসা ভাড়া করে থাকে। এক পর্যায়ে সুমন বিলকিসের সাথে দেখা করতে চায়। বিলকিস তাকে রাতে আসতে বলে। গত ২৪ অক্টোবর রাতে বিলকিসের আহ্বানে সাড়া দিতে সুমন চলে আসে কদমতলীর ওয়াসার পুকুর পাড়ের নির্জন এলাকায়। বিলকিসের সাথে তার সাক্ষাতও হয়। এক পর্যায়ে সে বিলকিসকে অনুসরণ করে তার পিছে পিছে হাঁটতে থাকে। সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ওহাব ও তার সঙ্গীরা সুমনকে বিলকিসের পেছন থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ওয়াসার স্লুইচ গেটের নীচে সুমনকে জবাই করে ওহাব ও তার সহযোগীরা। লাশ যাতে কেউ চিনতে না পারে সেজন্য মাথা কেটে আলাদা করে দূরে লুকিয়ে রাখে। ওই রাতেই ওহাব তার স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যায়। বিলকিসকে মুন্সীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় রেখে ওহাব চলে যায় বরিশাল।
কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, ওহাবের স্ত্রীকে আটক করার পর তাকে দিয়েই ফাঁদ পেতে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। বিলকিস সুমনকে ফোন করে ঢাকায় আসতে বলে। ওহাব তাকে বলে, সে কুয়াকাটার লঞ্চে ঢাকায় আসছে। পুলিশের একটি টিম আগে থেকেই সদরঘাটে ওঁৎ পেতে থাকে ওহাবকে ধরার জন্য। ধূর্ত ওহাব যে লঞ্চে আসার কথা সেই লঞ্চে না এসে আসে এআর খান নামক লঞ্চে। পুলিশ ওহাবের স্ত্রীর ভাইকে সঙ্গে রেখেছিল যাতে ওহাবকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। এআর খান লঞ্চ থেকে নামার পর ওহাবকে শনাক্ত করে তার স্ত্রীর বড় ভাই। সাথে সাথে ইন্সপেক্টর তদন্ত আরশেদুল হক ঝাঁপিয়ে পড়ে ওহাবকে জাপটে ধরেন। ওহাব পুলিশকে বলেছে, সুমনকে খুন করার পর নিজেকে রক্ষার জন্য সে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। স্ত্রী সাথে থাকলে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকতে পারেÑ এজন্য স্ত্রীকে সে মুন্সীগঞ্জে ফুপু শাশুড়ির বাসায় রেখে বরিশালে চলে যায়। পুলিশ সেই স্ত্রীকে দিয়ে ফাঁদ পেতেই খুনি ওহাবকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ইতোমধ্যে ওহাব আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সেই জবানবন্দিতে সে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে।
ক্লুলেস এই হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের সময় লেগেছে মাত্র ৭দিন। অনেকের মতে, এ ঘটনাই প্রমাণ করে পুলিশ ইচ্ছা করলে সবই পারে। আলোচিত এই হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনে কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ টিমে ছিলেন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আরশেদুল হক, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) সাইফুল ইসলাম, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বিনয় কুমার, এসআই প্রদীপ কুমার ও এএসআই নাজিম উদ্দিন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন